আর্কাইভ

অং মারমার ধারাবাহিক গল্প-৩

by | Nov 5, 2020 | আদিবাসী বিষয়ক, বিবিধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস

পাহাড়িয়ার গল্প ~ ৩

মাটি কাটতে কাটতে একটা সময় এসে সন্ধ্যাটা নামতে থাকলো। সূর্য তখন খুব ক্লান্ত। সকাল থেকে বকাবকি, রাগারাগি করে এবার ঘামতে ঘামতে দুর্বল। চোখ তার নিভিয়ে আসতেছে এমনই। দীর্ঘক্ষণ সহবাস করার পর নতুন বর যেমন হাত পা মেলে, চোখটা বুজে শুয়ে বিছানায় একপাশে পড়ে থাকে, ঠিক তেমন করে সূর্যটাও পড়ে আছে আকাশের এককোণে।

বাতাসে এইবার সে শীতল হয়ে যেতে থাকলো। রাগ তার ঝরে যেতে থাকলো পাহাড় থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণার ওই শীতল পানির মতো করে। চোখ দুটোই তার এইবার জড়িয়ে আসে তন্দ্রায়। সে ভেসে চলেছে বাতাসে চোখটাকে বন্ধ রেখে।

আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মধ্যে দিয়ে সে অস্তমিত হবে। আকাশটা তখন রাঙা আলোয়ে ছেয়ে গেছে। যেন আকাশ জুড়ে একটু পরেই দেখা যাবে নাম জানা অজানা ফুলের বিশাল এক বাগান। বাগানে উড়াউড়ি করবে কিছু মেঘ আর কিছু নামহীন তারাগুলি। আকাশের এককোণে দেখা যাবে সাদা একটা চাঁদ। সেই রাঙা আলোয় মানুষ কেও রাঙা দেখায়। তার সাথে মাটিকেও। আহ্‌ তাই বুঝি এর নাম রাঙামাটি? কতই না সুন্দর! দুনিয়ার এক টুকরো স্বর্গ।

পাহাড়ের কোলে মানুষের সবুজ জীবন, রঙ্গিন জীবন। যেন পাহাড়ের জরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এই মানুষগুলো। অথবা পাহাড় প্রসব করেছে এই নাক বোঁচা সরল মানুষদের কে। আর সেই মানুষগুলো পাহাড়ে টিকে আছে পাহাড়কে সেবা যত্নাদি করতে। পাহাড়কে ভালোবেসে বেসে বেসে মরে যেতে। সন্ধ্যা আসার আগেই সকলেই একে একে কাঁধে তুলে নেয় তার মাটি কাটার অস্ত্র কোদাল কে। আর মংচিং কাঁধে তুলে নেয় কিছু কাঠ আর হাতে নেয় দাঁ টাকে।

মহিলাদের পিঠে পিঠে ঝুলতে থাকে একেকটা বাঁশ দিয়ে বানানো খারাং। খারাং এর ভেতরে পড়ে আছে কোদাল, পানির বদং, দাঁ, ও পলিথিনে মুড়ানো পান-তামাক, পাইন্দু ও বনের টাটকা সবুজ শাক ও সাংফোয়াঃ ( এক প্রকার বনজী আলু) সবজিসহ ইত্যাদি।

যার যার ঘরে চলে গেলে মংচিং মেপ্রুকে বলে, “তুমি এই কাঠগুলিরে বাড়ি নিয়া যাও। হ্লামং গরুগুলিরে একা সামলাতে পারবেনা। গিয়ে নিয়ে আসি। আর লম্বা একটা বাঁশ খুঁইজ্জা নিয়া রাইখো। কাল বাজার বার, পেঁপে বিক্রি করা লাগবো।

(“নাঙ দে থাং রোগো য়ুহ্‌ রো ইংদো লাহ্‌ লীঃ। হ্লামং ইয়ে ল্‌হ নোওয়া গো ক্রে ফো নুইং মো হোওক্‌।ঙাঃ লে লাহ্‌ বং য়ু খ্যিঃ মে। অরো এরেহ্‌ ক্রে বং ওয়াহ্‌ রাহ্‌ বং থাঃ লি। নাহ্‌ ফ্রাইঙ জীঃ। পাদাগাঃ সি রং রা ফো।”) এই বলে কাঠ ও খারাং এর বিনিময় ঘটে।

মেপ্রু চলে যায় কাঠগুলিরে নিয়া বাড়িতে। আর খারাং টারে নিয়া মংচিং আঁকাবাঁকা পথে ছুটে যায় হ্লামং এর কাছে। গরু নিয়ে তারা ফিরবে ঘরে। মেপ্রু ঘরে এসে পানি পান করতে করতে মাথার ঘাম মুছতে মুছতে দেখলো, ডেকে ডেকে তার শাশুড়ি কে মুরগীদের খাওয়াতে। মুরগী গুলিও একে একে খাবার খেয়ে লাইনে বেলাইনে ঢুকে পড়া শুরু করেছে নিজেদের ঘরে।

মেপ্রু উঠে চিকন লম্বা বাঁশ খুঁজে রাখে। মংচিং ঘরে ফিরে এলো হ্লামং ও তার ১৪ টা গরু নিয়ে। হ্লামং বালতি নিয়া ঘোড়ার মতন দৌড়ে দৌড়ে চলে যায় নদীর কাছে, গোসলে।

গরু টরু বেঁধে পানি খায় মংচিং। খেয়ে মংচিং লম্বা করে চিকন বাঁশটা নিয়ে উঠোনে যায়। বাঁশ দিয়ে পাড়তে থাকে পেঁপে। আর খারাং নিয়ে এদিক ওদিক গিয়ে মেপ্রু পেঁপে কুড়াই টোকানির মতন করে। হ্লামং আসতে আসতে এইদকি পেঁপে পাড়া শেষ হয়ে যায়। শেষ হয় পেঁপে কুড়ানো টাও।

এইদিকে হ্লামং এর মনটা ছটফট করা শুরু করছে। গলা কেটে ফেলে দিলে যেভাবে মুরগী ছটফট করে? ঠিক সেভাবেই। নানীর মুখে গল্প শুনবে বলে তার এতই ছটফটানি, চঞ্চলতা।

হ্লামং চেয়েছিল বুদ্ধের কাছে তাড়াহুড়ো করে প্রদীপটা জ্বালাবে আর ঘরের হারিকেনের গুলিতে তেল তুল দিয়ে সে তার নানীর কাছে গিয়ে শুনতে বসবে ভূত, দৈত্য ও রাজ রানীর গল্প। কিন্তু হায়! মংচিং হ্লামং কে ডাক দিয়ে বলে, ” প্রদীপ তদীপ জ্বালানো শেষ হইলে পেঁপে গুলারে গুনে একটু খারাং এ সাজিঁয়ে রাখিস।” (” ছিঃ মীং ঞেহ্‌ ব্রিঃ গে পাদাগাঃ সি রো গো রুইবং খারাং মাঃ চিহ্‌ বং তালই ওয়েহ্‌।”) এই বলে মংচিং ও মেপ্রু দুজ়নেই চলে যায় গোসলে। নদীর কাছে।

হ্লামং এর মন মেজাজ তখন গরমে দাউ দাউ করে জ্বলা শুরু করছিল। কিন্তু সে আগুন দেখাতে পারবে না তার আব্বারে, ভয়ে। যত আগুন, রাগ সব ঝারে হারিকেনে তেল দিতে দিতে তার নানীর সামনে। বুদ্ধের কাছে প্রদীপ জ্বালাতে৷

গিয়া প্রার্থনা করে বসে, “ওহ ভগবান, আমায় রক্ষা করো তুমি। দয়া করো আমায়। আমার বাপের মনে আমারে কাজ দেয়ার বাসনা ইচ্ছা যেন কোনোদিনও আর না জন্মায়। ও ভগবান, আর যেন বাবা এই গরুগুলারে বেচে দেয়।”

( “ওহ ফারাহ্‌ ঙাঃ গো কেঃছেঃ বাঃ। ঙাঃ গো ক্রেঃ বাঃ। ঙাঃ আঃবাহ্‌ চইঃ মা ঙাঃ গো অলোক্‌ খ্যাবো চইঃ মালাবাগেঃ। ওহ ফারাহ্‌ অরঃ তু খুহ্‌ চাঃ গাঃ, আঃবাহ্‌ মা নোওয়া রো গো রা রংবং বোলোই পাঃ ফিঃ।”)

হ্লামং এর প্রার্থনা নানীর কানে গেলে নানীর মুখে হা হা করে একটা হাসি খেলে গেল। সেই হাসি হ্লামং কানে শুনতে পেলেও হাসিটাতে সে লজ্জিত বোধ অনুভব করলো না, তাই হ্লামং এর কাছে হাসিটা পাত্তা না পেয়ে নিমিষেই মরে গেল।

হ্লামং ঘরের বাইরে গিয়া পেঁপে গুনে আর মনে মনে তার আব্বাকে গালাইতে গিয়েও গালি গুলারে ছ্যাপের মতন কইরা গিলে ফেলল। এইদিকে মংচিং আর মেপ্রু ফিরল গোসলটা শেষ করে। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। চাঁদের আলোয়ে কাপড় চোপড় বদল করে মেপ্রু গেল রান্না করতে।

“কয়টা হলো রে হ্লামং?” (“মনহ্‌ লূং ফ্রইঃ লে হ্লামং? “) লুঙ্গি পড়তে পড়তে উঠোনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে হ্লামং কে। ৩৭ টা হয়েছে। বাকি দুটা পেঁকে গেছে। এইগুলা আমি খাবো বলে চলে গেল সে তার নানীর কাছে। গিয়ে বায়না ধরে গল্পের। তখন নানী গল্প শুনাচ্ছে তার নাতি কে।

মেপ্রু রান্না করছে রান্না ঘরে। আর বাঁশ দিয়ে মাছ ধরার হাতিয়ার দুঃ লা বানাচ্ছে মংচিং। এইদিকে গল্প বলা, গল্প শোনা ও দুঃ লা বানানো শেষ না হওয়ার আগেই ডাক পড়ে গেল রাত্রের ভাত টা খেতে। ভাত খেতে বসল সকলে মাটিতে। ঠিক মাটিতে নয়। নিজেদের হাতে বানানো কাঠের এক টুকরো বেঞ্চিতে বসে খেতে শুরু করলো ভাত। মেপ্রু খেতে খেতে বলে, ” তামাক শেষ হয়ে গেছে। কেরোসিন তেল ও নাই। আর অল্প যদি পারো নাপ্পি আনিও। 

(” ছিহ্‌ঃ কুং লাহ্‌ খাঃ ব্যায়া য়ে। তাহ্‌ ছিঃ লে ক্যুং বং। নুইং গেঃ নেপি থেপে ইয়ু খাঃ। ”)

 লবণটবণ আছে কি না দেখ? আর কি কি নাই ভালো করে দেখ! সামনে সপ্তাহে কচু গুলি রোপণ করে ফেলতে হবে। তাই সামনে সপ্তাহে কাজের চাপে বাজারে যেতে না পারার সম্ভাবনা বেশিই থাকবে।” (” ছাহ্‌ হিং রে লঃ ক্রেঃ, অরহ্‌ যা যা মেহিংলেঃ আহ্লাপাঃ ক্রেঃ! লাহ্‌ মে হাক্তাক্‌ মাঃ প্রিং চইক্‌ রা ফো ব্যায়া। লাহ্‌ চা হাক্তাক্‌ মা অলোহ্‌ কেজু জিঃ দো লাফো রামো হোঃ দে।”) এই বলে মংচিং খাওয়া শেষ করে প্লেট ধুয়ে তুয়ে বের হয়ে বসে থাকে ঘরের উঠোনে। এইভাবে একে একে খেয়ে দেয়ে চলে যায় নানী ও নাতি।

মেপ্রু সবকিছু পরিষ্কার করে পাইন্দু নিয়ে চলে যায় মংচিং এর কাছে। আকাশে উঠেছে রাঙা চাঁদ। ঝোপ ঝাড় থেকে গেয়ে যাচ্ছে পোকামাকড়েরা দারুণ সুরে দারুণ দারুণ গান। চেনা সেইসব সুর ও চেনা সেই সুরের ভাষা তারা বুঝে কিন্তু এই ভাষা ভাবানুবাদ ও করা যায় না আবার অনুবাদেও হয় না। এই সব পোকা মাকড়ের গান কথা গুলি শুধু বুঝতে শিখতে হয়।

এদের ভাষা নিয়ে গবেষণা না করেই আপাতত পাইন্দু টানায় হবে এই সময়টাকে উপভোগ করার একমাত্র উত্তম কাজ। এই ভেবে কিছুই না বলে মংচিং তার স্ত্রীর মুখ থেকে পাইংন্দুটি তুলে নিজের মুখে রেখে দিল। সে পাইন্দু টানছে কিসব ভেবে ভেবে, দক্ষিণা বাতাস এসে ধুয়ে দিচ্ছে শরীরের অবসাদ ও ক্লান্তি। আর মনের ভেতর উঠতে লেগেছে ভালোবাসার ঝড়। এই ঝড়ে আজ তারা দু’ জনেই ভিজতে চায়।

কিন্তু ঘরের মানুষগুলি না ঘুমালে এই ঝড়ে ভেজাটা হবে অনিরাপদ। জ্‌বর অসুখের ভয় নেই এই ঝড়ে। ভয়, যদি ঘরে কেউ জেনে যায় তাদের সংগমের কথা শুনে ফেলে যদি সেই ঝড়ের রাতের হাওয়াদের সুখের চীতকার ও বৃষ্টির টুপটাপ ফোটার শব্দ। তখন লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হবে তাদের দু’ জনেরই। কিন্তু তারা মরে যেতে পারবে না। এই ঝুঁকি থেকে উদ্ধার পেতে মেপ্রু উঠে একবার খেয়াল করলো বাকিরা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না। গিয়ে দেখে গোটা রুম অন্ধকার। কেউ গল্প বলছে না, গল্প শুনছেও না।

ঘুমের সাগরে ভেসে ভেসে চলে গেছে দুন’ জনেই। মেপ্রু নিজেদের রুমে গিয়ে বিছানা ঠিক করে। জানলা খুলে দেয়। যাতে করে তাকে আজ কষ্ট করে হাত পাখা চালাতে না হয়। সেই জানলা দিয়ে সুর সুর করে ঢুকে পড়ল বেখেয়ালি মাতাল বাতাস আর রাঙ্গা রাঙ্গা চাঁদের আলো। আর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লো মংচিং। কিছুই না বলে সে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার স্ত্রীকে। পিঠ থেকে শুরু করে মুখে যখন যেটা পাই সেটা চুমু খেয়ে খেয়ে বেড়াতে থাকে আর হাত দিয়ে টিপতে থাকে স্ত্রীর বুকের নরম নরম স্তন দু’ টোকে। একসময় দু’ জনেই কামে মাতাল হয়ে ঢলে পড়ে বিছানায়। লুঙ্গি উল্টিয়ে বের করে আনে শক্তিধর সেই সাপটাকে। আর ওদিকে থামি উল্টিয়ে হা করে বসে থাকে সোনালী ব্যঙটি। এক সময় সাপটি একবার ব্যাঙের মুখে ঢুকে আর একবার বের হয়। মংচিং তার স্ত্রীর বুকের মধু খেতে খেতে একসময় ক্লান্ত হয়ে বুকেতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

পপুলার পোস্ট

Related Post

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বিপম চাকমা উপন্যাস “গ্রহণ লাগা ভোর”

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বিপম চাকমা উপন্যাস “গ্রহণ লাগা ভোর”

প্রয়াত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছিলেন--- ‘‘আমার কেবলই মনে হচ্ছে চাকমা শিল্পীর লেখা চাকমা ভাষার উপন্যাস চাই; সেই উপন্যাসের বেশির ভাগ লোক...

কেন আমি সাজেক বা এই ধরণের ট্যুরিস্ট স্পটে যাই না

কেন আমি সাজেক বা এই ধরণের ট্যুরিস্ট স্পটে যাই না

এই দেশে আদিবাসীরা সবচে উপেক্ষিত সেইটা নতুন কইরা বলার কিছু নাই। ১৯৫০ থাইকাই আদিবাসীদেরকে নিজ ভূমি থাইকা উচ্ছেদ করা হইতাছে বারংবার কখনো বিদ্যুৎ...

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আদিবাসী ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ মুকুর কান্তি খীসার সংক্ষিপ্ত জীবনী

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আদিবাসী ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ মুকুর কান্তি খীসার সংক্ষিপ্ত জীবনী

লেখকঃ ধীমান খীসা শ্রী মুকুর কান্তি খীসা (Mukur Kanti Khisha) ১৯৩৫ সালের ২৭শে নভেম্বর বর্তমান খাগড়াছড়ি উপজেলাধীন খবংপুজ্যা (খবংপড়িয়া) গ্রামের এক...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *