আর্কাইভ

আদিবাসীত্বের কথা কি অসাংবিধানিক?

by | Nov 15, 2020 | আদিবাসী বিষয়ক, মানবাধিকার, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে

লেখকঃ ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ মাহমুদ

আমাদের সংবিধানে আদিবাসী কথাটা নাই। ২০১১ সনে সংবিধান সংশোধনের সময় ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ যে কয়টা আগে ছিল সেগুলির সাথে একটা নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে অনুচ্ছেদ ২৩(ক) হিসাবে। সেখানে বলা আছে “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”
ইংরেজিতে আছে “The State shall take steps to protect and develop the unique local culture and tradition of the tribes, minor races, ethnic sects and communities.” এর আগে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এইসব কথাও সংবিধানে ছিল না।
এইটা দেখিয়ে পাহাড়ে কিছু লোকজন- এমনকি কিছু সরকারি কর্মকর্তাও- কেউ আদিবাসী শব্দটা ব্যাবহার করলে রেগে যায়।
একটা ফেসবুক পোস্টে দেখলাম, সম্প্রতি পাহাড়ি ছেলেমেয়েদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত পরামর্শ ইত্যাদি দেওয়ার জন্যে একটা কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল একদল ছেলেমেয়ে, ওদের ব্যানারে ‘আদিবাসী ছাত্রছাত্রী’ কথাটা লেখা ছিল বলে ওদেরকে নানারকম হেনস্থা করা হয়েছে, কর্মসূচীটা আর হয়নি। ফেসবুকে আপনি মাঝে মাঝেই দেখবেন সেটেলাররা এসে ধমকের সুরে মন্তব্য করছে, আদিবাসী বলা যাবেনা কাউকে, এটা সংবিধান বিরোধী কথা, এইরকম কথা বলা অপরাধ ইত্যাদি।
এইরকম কথা যারা বলেন ওরা স্পষ্টতই ভ্রান্ত। সংবিধানে একটা কথা আছে কি নাই তার জন্যে সেই শব্দটা নিষিদ্ধ হয়ে যায়না। সংবিধানে একটি জনগোষ্ঠীকে উপজাতি বলা হয়েছে বলে বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়েছে বলা তাকে আদিবাসী বা জাতি বলা যাবে না এরকম কোন আইন নেই।
আপনার ইচ্ছা হলে আপনি সেই গোষ্ঠীকে উপজাতি বলতে পারেন আপনার ইচ্ছা, কেউ চাইলে তাকে আদিবাসী বলতে পারেন সেটা তাঁর ইচ্ছা। এইসব শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ আছে, যিনি শব্দটা ব্যাবহার করেন তিনি সাধারণত একটা বিশেষ অর্থেই এইসব শব্দ ব্যাবহার করেন।
(২)
আমাদের সরকার আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘের ঘোষণাটিতে স্বাক্ষর করেনি, করতে চায়ও না। এই কারণে সরকার আদিবাসী শব্দটি এড়াতে চায়। এজন্যেই দেখবেন, আমাদের জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিই ২০০৭ সনের আগে আনুষ্ঠানিক বার্তা বা বাণী বা আলোচনায় পাহাড়ের এইসব জনগোষ্ঠীগুলিকে বুঝাতে আদিবাসী কথাটা ব্যবহার করতেন, কিন্তু জাতিসংঘের সেই ঘোষণাটা পাশ হওয়ার পর ওরা আর আদিবাসী কথাটা ব্যবহার করেন না। এইটা হচ্ছে আমাদের সরকারের নীতি।
সরকারের যা নীতি সেই অনুযায়ী সরকারের লোকজন কথা বলবেন। কিন্তু আমাকেও সেইটাই মেনে নিতে হবে এরকম কোন আইনগত বাধ্যবাধকতা নাই। আমার কথা বা আপনার কথা সরকারের সাথে না মিললেই সেটা অপরাধ হয়ে যায় না।
দেখেন, আমাদের দেশের আইনে এমন কি সংবিধানের বিরোধিতা করা বা সংবিধানের কোন বিশেষ বিধানের বিরোধিতা করা কোন অপরাধ নয়। যেমন ধরেন সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বলা আছে। অনেক লোক আছেন যারা মনে করেন এই বিধানটা থাকা উচিৎ নয়। সেরকম কেউ যদি এই কথাটা বলেন, যে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম তুলে দেওয়া উচিৎ, তিনি কি কোন অপরাধ করলেন? জি না, এটা কোন অপরাধ নয়।
অনেককেই দেখবেন যে সংবিধানের সত্তুর নং অনুচ্ছেদের বিপক্ষে খুব সোচ্চার- সেটা কি অপরাধ? না, সেটাও কোন অপরাধ নয়। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর পর থেকে বছরের পর বছর আওয়ামী লীগসহ অনে রাজনৈতিক দল সংবিধানের কিছু কিছু বিধানের বিপক্ষে আন্দোলন করে এসেছে। সেগুলি কি অপরাধ ছিল? জি না জনাব, ছিল না।
এমনকি দেশে এমন রাজনৈতিক দলও আছে যারা এই সংবিধান পুরোটাই বদলে দিতে চান। ইসলামী শাসনতন্ত্র নামে একটা দল আছে, নাম থেকেই বুঝতে পারছেন ওরা দেশের এই সংবিধান পাল্টে দেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র চালু করতে চায়। এই দলটি কি বেআইনি কিছু করছে? আপনি কি ওদেরকে মারবেন? জেলে পুরে রাখবেন? না, আমি ওদের দাবী পছন্দ করছি না, আপনিও হতো করছেন না। কিন্তু ওদের তো অধিকার আছে ওদের কথাটা বলার। বলুক ওরা। এটা তো অপরাধ নয়।
(৩)
বরং যদি কোন সরকারি কর্মকর্তা নিতান্ত ‘আদিবাসী’ শব্দটা বলার জন্যে কাউকে হেনস্তা করেন সেইটা হবে অসাংবিধানিক ও অন্যায় কাজ। হেনস্তার ধরনটা কোন কোন সময় আইনত অপরাধও হতে পারে। কেন এটা অসাংবিধানিক বা অন্যায় কাজ? কারণ সংবিধান আমাকে সেই অধিকার দিয়েছে যে আমি চাইলে সংবিধানের বিরোধ করতে পারি, এর সংশোধন চাইতে পারি, এর সমালোচনাও করতে পারি- সংবিধানে নাই এমন শব্দ তো ব্যাবহার করতেই পারি। এটা আমার মৌলিক অধিকারের অংশ। এমনকি আমাদের মহান সংসদও আমার এইরকম অধিকারের বিপরীতে কোন আইন পাশ করতে পারে না- তার আগে সংবিধান সংশোধন করে নিতে হবে।
এইসব করবেন না, আপনি ক্ষুদ্র জাতিসত্বা বা নৃ-গোষ্ঠী বলতে চান, বলুন। কিন্তু আমি যদি আদিবাসী বলি সেটাও অন্যায় নয়, অসাংবিধানিক নয় বা অপরাধ নয়। আর সংবিধানের প্রতি আপনার যদি খুব বেশী মুহব্বত থাকে বা এইটাকে যদি আপনি আপনি আসলেই একটা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিল ও জাতির দিগদর্শন মনে করেন- তাইলে মেহেরবানী করে সংবিধানে যেসব রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি রয়েছে, সরকারকে বলেন সেইগুলি মেনে চলতে- সরকারকে বলুন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। দাবী তুলুন, ওদের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বিনষ্ট হয়ে এমন কাজ না করতে।
সংবিধানে বিধৃত রাষ্ট্র পরিচালনা মৌলিক নীতি বাস্তবায়ন চাইবেন না, আর সেখানে সন্বিবেশিত শব্দমালা নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করবেন এটা কিরকম কথা হলো? একটু সততা তো থাকা দরকার আরকি। নাকি?

পপুলার পোস্ট

Related Post

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আদিবাসী ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ মুকুর কান্তি খীসার সংক্ষিপ্ত জীবনী

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আদিবাসী ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ মুকুর কান্তি খীসার সংক্ষিপ্ত জীবনী

লেখকঃ ধীমান খীসা শ্রী মুকুর কান্তি খীসা (Mukur Kanti Khisha) ১৯৩৫ সালের ২৭শে নভেম্বর বর্তমান খাগড়াছড়ি উপজেলাধীন খবংপুজ্যা (খবংপড়িয়া) গ্রামের এক...

প্রিয় বিপ্লবী ভ্রাতা মিঠুন চাকমাকে স্মরণ করছি

প্রিয় বিপ্লবী ভ্রাতা মিঠুন চাকমাকে স্মরণ করছি

লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা সদ্য স্বাগত ইংরেজি নববর্ষ ২০২১ এর ৩ জানুয়ারি তারিখটি জুমপাহাড়ের এক মেধাবী তরুণ বিপ্লবী শ্রী মিঠুন চাকমার ৩য় প্রয়াণ বার্ষিকী। এই...

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

সংযুক্ত পেইন্টিইং এর শিল্পী- চানুমং মারমা লেখক- লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা    এদেশের নারীবাদী দর্শন বা নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতাকে থিওরাইজ বা তত্ত্বায়ন...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *