আর্কাইভ

আদিবাসী ও প্রাণ-প্রকৃতির বিপন্নতাঃ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

by | Jun 25, 2021 | আদিবাসী বিষয়ক, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে

“জনমানবহীন অরণ্যপ্রান্তর ও প্রকৃতিই হলো বিশ্বব্রহ্মান্ডের গহীনে প্রবেশের পরিচ্ছন্নতম পথ | “ — জন মুয়ের, স্কটিশ-আমেরিকান প্রকৃতিবিদ ও লেখক, পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। 
প্রাক বয়ান:
মানব সমাজের সাথে প্রকৃতি, পরিবেশ ও নৈতিকতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই সম্পর্ক ইতিবাচক অর্থেই। কেননা প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির এই তিন আধার থেকে বিচ্যুত হলে মানব সমাজ নিশ্চিতভাবে অধঃপতিত ও বিপন্ন হবে। এক সময় পৃথিবী থেকেও মানব প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে। সেই অবস্থা তখনই তৈরি হবে যখন প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর মানুষ নিজের নানা অনৈতিক অভিপ্রায় ও জুলুম চাপিয়ে দেবে এবং তার জীবনাচরণে নৈতিকতাকে পরিহার করবে। সমাজের মানুষের ভোগবিলাসদুষ্ট আগ্রাসন ও শোষণ চাপিয়ে দেওয়া হলে কালক্রমে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপর্যস্ত হতে বাধ্য। ফলে মানবজাতির নানান দুর্দশা ও অস্তিত্বের সঙ্কটও অবশ্যম্ভাবী। তবে এই সঙ্কট বা পতনের প্রক্রিয়া যে ইতোমধ্যে শুরু হয়নি এবং বর্তমানেও চলমান নেই, তা বলা যাবে না।
নিজেদের নানান চাহিদা ও উচ্চাভিলাষ পূরণ করতে গিয়ে তথাকথিত সভ্য/আধুনিক মানুষ এখন প্রতিনিয়ত প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিপন্ন করে চলেছে। এর অনুষঙ্গ হিসেবে মানুষের মানবিক আদর্শ ও নৈতিকতাও প্রায় সবখানে বিসর্জিত হচ্ছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিলনা। কারণ মানুষ তো বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, প্রাগৈতিহাসিকতা ও আদিমতার ধূলি ধূসরিত সব কালপর্ব পেরিয়ে এসে এখন সে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে আসীন। আর সভ্যতা তো হলো এক অর্থে মানব জাতির সেই সুন্দরতম সর্বোৎকৃষ্ট অবস্থা, যেখানে মানুষ তার চারপাশের নির্মল প্রকৃতি এবং উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তির সহাবস্থানে একটি সমতাপূর্ণ, স্বচ্ছল ও সৃষ্টিশীল সমাজে এবং নিরাপদ ও দূষণমুক্ত পরিবেশে অনাবিল সুখ, শান্তি ও মানবিক সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করবে। অথচ বাস্তবে আমরা আজ কী দেখছি! দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে যুদ্ধ, সংঘাত, অশান্তি লেগেই আছে। মানুষের নির্মম লুন্ঠনে, শোষণে আমাদের চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতি প্রতিনিয়ত বিপন্ন হচ্ছে। বন-জঙ্গল উজার হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ পৃথিবীর নানা স্থানে পাহাড়ধ্বস, ভূমিধ্বস, তুষারধ্বস হচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন পশু-পক্ষী ও উদ্ভিদের নানান প্রজাতি তথা প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর উষ্ণতা ও মরুকরণ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে খুব দ্রুত জলবায়ুরও পরিবর্তন ঘটছে। মেরু অঞ্চলের জমাট বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। এতে করে বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়াসহ সমুদ্র উপকুলবর্তী মানববসতি, ভূমি ও বনাঞ্চল সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পরিণতিতে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে একদিকে যেমন ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির উচ্চতা বাড়ছে, অন্যদিকে আবার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কোনো কোনো শহর ও জনবসতি পরিত্যক্ত হওয়ারও উপক্রম হয়েছে ।
এছাড়া ঘুর্ণিঝড়, টর্ণেডো, জলোচ্ছ্বাস, অকাল-বন্যা, খরা, মহামারিসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ তো প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছেই। এক কথায়, আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ এখন সত্যিই বিপদগ্রস্ত ও শঙ্কটাপন্ন। এজন্য মূলত দায়ী মানুষের অপরিমিত ও ক্রমবর্ধমান জাগতিক চাহিদা তথা ভোগস্পৃহা, লাগামহীন লোভ-লালসা এবং প্রকৃতির উপর অবাধ শোষণ। আর এহেন ভোগবিলাস ও শোষণ আবশ্যিকভাবে নৈতিকতা বিবর্জিত। মানুষের ক্রমবর্ধিত ভোগ-লালসা ও জবরদখল প্রবণতা তার নৈতিক অবক্ষয় ও অধঃপতনকেও ত্বরান্বিত করছে। ফলে পৃথিবীর আয়ুষ্কালও ক্রমশঃ সংকুচিত হয়ে আসছে।
আমাদের পৃথিবী এখন একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানের অভাবনীয় জয়যাত্রা, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির ঈর্ষণীয় উৎকর্ষতার কারণে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ এখন অন্য প্রান্তের সব খবর সহজে পেয়ে যাচ্ছে। দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ দুনিয়াজুড়ে জনমানুষের মবিলিটিও বেড়েছে, যাকে আমরা একবাক্যে বিশ্বায়নের সুফল বলছি। তবে এই বিশ্বায়ন ও তার সহযোগী ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ মানুষকে এখন ভোগবাদিতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণের জন্যেও ইন্ধন যোগাচ্ছে। আর এই ভোগবাদ ও কনজিউমারিজমের হাত ধরে অর্থনৈতিক বিকাশ ও সমৃদ্ধির চিন্তা পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রনায়ক ও বুদ্ধিজীবী এখনও যার অনুসারী সমাজের মানুষের নৈতিক অধঃপতনকেও ত্বরান্বিত করছে। নিজের ক্রমবর্ধিত বৈষয়িক ও জাগতিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মানুষ এখন সমাজের চিরায়ত নৈতিক মূল্যবোধগুলোকেও বিসর্জন দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মানুষের এই নৈতিক অধঃপতন ও ভোগবাদিতা ডেকে নিয়ে আসছে পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যা আমরা ইতোপূর্বেও উল্লেখ করেছি ।
“যে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে সে অপরাধী। আর নীতিবিদ্যা বলে, অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের বিন্দুমাত্র চিন্তা করলেও সে অপরাধী।“ — ইমানুয়েল কান্ট, জার্মান দার্শনিক | 
বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন যে পথে, যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে এই পৃথিবী ও মানব জাতির অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো গত্যন্তর নেই। পৃথিবীর ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যাও পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ব্যাপকভাবে দায়ী। কারণ মানুষ তো প্রকৃতিগতভাবেই লোভী, আগ্রাসী ও ভোগবাদী। তাই পৃথিবীতে জনসংখ্যা যতো বাড়বে, ততোই পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হবে। এই পতন-প্রক্রিয়ার লাগাম টেনে ধরা যে অসম্ভব, তা কিন্তু নয়। সেজন্য পৃথিবীর মানুষকে নিরন্তর আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে নিজেদের ভোগবাদিতা ও বিশ্বায়িত কনজিউমারিজমকে একটি পারমিসিভ অবস্থায় নামিয়ে এনে সমাজের চিরায়ত নৈতিক মূল্যবোধগুলোকে সমুন্নত রাখতে হবে। সেটি যে করা সম্ভব তার দৃষ্টান্ত তো আমাদের প্রাচ্যের জীবনদর্শন তথা অভিবক্ত প্রাচীন ভারতের মনীষীদের প্রচারিত ধর্ম ও জীবনবোধেই বিধৃত আছে। তাঁদের অধিকাংশের আচরিত ও প্রচারিত ‘simple living, high thinking’ – এই জীবনদর্শনই আমাদের বিপন্ন পৃথিবী ও মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষা তথা প্রাণীজগতের মুক্তির পাথেয় হতে পারে।
বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণ ও বিশ্বের বাস্তবতা:
লিগাটাম ইনস্টিটিউট নামের যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০১৬ অনুযায়ী, বিশ্বের জরিপকৃত ১৪৯টি দেশের মধ্যে পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮তম। অর্থাৎ বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বিশ্বের মাত্র এগারটি দেশ থেকে এগিয়ে আছে।  আর অতি সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের ডাভোস-এ অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যর্থদের তালিকায় বিশ্বের জরিপকৃত ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম। অর্থাৎ সবচেয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। শীর্ষতম ব্যর্থ রাষ্ট্র বুরুন্ডির ঠিক আগেই তার অবস্থান। প্রতিবেদনটি এহেন ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছে সুশাসনের অনুপস্থিতি, বাতাসের গুণগত মান ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতার অভাবসহ গ্রীণহাউজ গ্যাস নির্গমণ রোধে সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের ঘাটতিকে ( সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ২৫ জানুয়ারি ২০১৮) |
অন্যদিকে ক্রেডিট সুইস নামের আরেকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার ‘গ্লোবাল ওয়েলথ্ রিপোর্ট ২০১৬’ তে জানাচ্ছে, বিশ্বের গরিব জনসংখ্যা অধ্যুষিত শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান চতুর্থ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বে যত গরিব মানুষ আছে তাদের ৩ দশমিক ৪ শতাংশের বসবাস বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে শোচনীয় তিনটি দেশ হলো নাইজেরিয়া, চীন ও ভারত। এই তিন দেশে বিশ্বের মোট দরিদ্র জনসংখ্যার ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ বসবাস করে। আর বাংলাদেশের পরে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, যেখানে বিশ্বের ৩ দশমিক ১ শতাংশ গরিব মানুষের বসবাস। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ষোল কোটি। তার উপর দেশটির জনসংখ্যা দৈনিক ৯ হাজার ৩১৫ জন করে বাড়ছে (সূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)।  আর ২০৫১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২১ কোটি ৮৪ লক্ষে। বাড়তি এই জনসংখ্যা নিশ্চিতভাবে ভূমি, কৃষি, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে ২০১৭ সালে বিশ্বে বায়ুদূষণে রাজধানী ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয় (সূত্র: গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ২০১৭) । বায়ুদূষণে ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল শুধুমাত্র দিল্লী মহানগরী। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) তার ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, ২০১৮ সালে ঢাকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত মহানগরী (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, ৩০ জানুয়ারি ২০১৮)।
‘দ্য ইকোনমিষ্ট’ এর জরিপ অনুযায়ী ২০১৭ সালে বসবাসের অযোগ্য নগরী হিসেবে বিশ্বে ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ। কারও কারও মতে, চতুর্থ নয় বরং এক্ষেত্রে ঢাকার অবস্থান একেবারে শীর্ষেই। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নদী দূষণের শহরও। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ, রাজধানীর চারপাশে গড়ে ওঠা অজস্র ইটভাটা ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ধুলোবালি, ঘনবসতি এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যা রাজধানী ঢাকাকে দূষণের চরমে নিয়ে গেছে। ঢাকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে জনঘন শহরও, যার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি। আভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কারণে ঢাকায় নতুন আরও ১ হাজার ৭০০ মানুষ প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে ।
আমাদের দেশ ও শহরগুলো সম্পর্কে আরও অনেক উদ্বেগজনক তথ্য রয়েছে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এখনও ৭ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৪৪%) নিরাপদ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। আর দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের সুরক্ষিত পয়োব্যবস্থাপনার সুযোগ নেই। আর্সেনিক ও নানাবিধ জীবাণুর কারণে বাংলাদেশের পানি দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে। সেই সাথে বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং অবৈধ দখলের ফলে দেশের কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয় শুকিয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। অথচ নিরাপদ সুপেয় পানি ও সুরক্ষিত পয়োব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’র দু’টি অন্যতম সূচক, যা বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে অবশ্যই অর্জন করতে হবে|
দেশের বনভূমির অবস্থা ও সম্ভাব্য বিপর্যয়ঃ
আমাদের দেশের আরও কিছু বিপর্যয়কর পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করার পর বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে অন্যরা কে কি ভাবছেন তা নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। অব্যাহত বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের ঘনঘটাও বাংলাদেশে কম নেই। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তার ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ বর্তমানে প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। এদেশে এখন মোট বনভূমির পরিমাণ দেশের আয়তনের ১১ দশমিক ২ শতাংশ মাত্র, যা পর্যায়ক্রমে কমতেই থাকবে|
কোনো প্রাকৃতিক কারণে নয়, বাংলাদেশের মানুষই প্রতিদিন এই বনভূমিকে ধ্বংস করছে। এদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় বনরক্ষার বিষয়টি কখনও সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদৃষ্টির অভাব, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা, সীমাহীন লোভ ও দুর্নীতি এবং বাছবিচারহীন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণই সাধারণভাবে বাংলাদেশের বনাঞ্চল উজার হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। বিগত ৩০-৪০ বছরে বাংলাদেশের তিন বনপ্রধান অঞ্চল যেমন – পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন ও সিলেটের বনভূমিকে নির্বিচারে উজার করা হয়েছে।
কখনও সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাস দমন কার্যক্রম সম্প্রসারণের নামে (বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামে), কখনওবা পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও বনজ সম্পদ আহরণের নামে। ফলশ্রুতিতে সমগ্র এশিয়ায় প্রায় বনশুন্য দেশসমূহের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন নীচের দিক থেকে তৃতীয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে শুধুমাত্র দু’টি দেশ – পাকিস্তান ও মঙ্গোলিয়া। তালিকায় সর্বশেষ অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের বনাঞ্চলের পরিমাণ দেশটির মোট আয়তনের মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ|
ভেবে দেখুন, আমরা ধর্মীয় মৌলবাদ ও গোষ্ঠীদ্বন্ধে জর্জড়িত এই দেশটিকে পরিবেশগত ক্ষেত্রেও অনুসরণ করবো কিনা! বন ধ্বংসের প্রবণতা ও পরিসংখ্যান তো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমরা আদতে পাকিস্তানকেই অনুসরণ করছি। মঙ্গোলিয়ার জলবায়ু ও প্রকৃতি যথেষ্ট রূক্ষ এবং সে কারণে বন উৎপাদনের অনুপযোগী। কিন্তু বাংলাদেশের জলবায়ু, প্রকৃতি, ঋতুবৈচিত্র্য এবং এর উর্বর মাটি তো বন সৃজন ও সংরক্ষণের জন্য যথোপযুক্ত। তাহলে আমাদের এই প্রাণপ্রিয় দেশটি কেন স্বেচ্ছায় বিশ্বের একটি বনহীন, বৃক্ষহীন রূক্ষ প্রকৃতির দেশের তকমা গ্রহণ করবে? এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণসহ সাধারণ জনগণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে এডিবি-র তালিকায় লাওসের মতো শান্তিপূর্ণ ছোট্ট একটি দেশ তার মোট আয়তনের ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ বনাঞ্চল নিয়ে এশিয়ায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এরপরেই আছে আমাদের আরেক শান্তিপ্রিয় প্রতিবেশী দেশ ভুটান, যার বনভূমির পরিমাণ দেশের মোট আয়তনের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্বে উন্নয়নের বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত দক্ষিণ কোরিয়ায় বনভূমির পরিমাণ দেশটির মোট আয়তনের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর নিকটতম প্রতিবেশি দেশ ভারতের রয়েছে ২৪ দশমিক ১ শতাংশ বনাঞ্চল।  তাই জনগণের স্বার্থে উন্নয়ন করা হলে বনভূমি সুরক্ষিত রেখেও যে উন্নয়ন করা সম্ভব তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, লাওস ছাড়াও পৃথিবীর বহু উন্নত দেশ। সিঙ্গাপুরে ভূমির অপ্রতুলতা থাকলেও ছোট্ট এই দেশটি এখনও তার ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ বনভূমি ধরে রেখেছে এবং ক্রমান্বয়ে বাড়িয়েই চলেছে। আর আমরা তো জানি যে, প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে বৈশ্বিক মানদন্ডে আদর্শস্থানীয় হতে হলে একটি দেশকে অবশ্যই তার মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি সংরক্ষণ করতে হবে |
জাতিসংঘের ‘এসডিজি’তে প্রত্যেক দেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে তার অন্ততঃ ২০ শতাংশ এলাকা বনভূমি হিসেবে গড়ে তোলা বা সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, ক্রমক্ষয়িষ্ণু নগণ্য বনভূমি এবং দেশের মানুষের ক্রমবর্ধিত বনবিনাশ প্রবণতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘের এই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা আদৌ অর্জন করতে পারবে কি? তাই বনভূমি ও পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা করে জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধন এখন দেশটির জন্য সত্যিই এক বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রকৃতি-পরিবেশ-জলবায়ুর পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি বিষয় নিয়ে বেশ একটা তুলকালাম কান্ডও কিন্তু ঘটে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রনায়ক বলছেন, এখন পৃথিবীর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ দু’টি – বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সহিংস সন্ত্রাসবাদ [নতুন সংযুক্তি করোনা মহামারি]। তাঁদের মতে এ দু’টি চ্যালেঞ্জকেই প্রথমে মোকাবিলা করতে হবে। আর স্টিফেন হকিংসহ পৃথিবীর প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরা গভীর উদ্বেগের সাথে আমাদেরকে তথা মানব জাতিকে বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, পৃথিবী নামক আমাদের প্রাণপ্রিয় গ্রহটি আজ সত্যিই বিপন্ন ও হুমকিগ্রস্থ।
আমরা সচেতন না হলে এই গ্রহটি যে কোনো সময় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীকুল, প্রাণ-প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্যও সমূলে ধ্বংস হতে পারে। তাই স্টিফেন হকিং মানব জাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য আগামী পাঁচশত থেকে এক হাজার বছরের মধ্যে পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার, রোবোটদের তৎপরতাসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ও বিস্তৃতির কারণে একদিন মানুষ এই গ্রহ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
আদিবাসীদের প্রথাগত জ্ঞানই এখনো প্রধান ভরসাঃ
আরেকদল বিজ্ঞানী রয়েছেন, যাঁরা প্রকৃতি ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণে এখন আমাদের গ্রহটি যে সত্যিই বিপন্ন তা প্রমাণ করতে এবং গ্রহটিকে বাঁচাতে নিরলস পরিশ্রম ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মতে, আমাদের জীবদ্দশাতেই পৃথিবীতে প্রাণ ধারণের উপযোগী প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। ফলে পৃথিবীর প্রকৃতি ও পরিবেশ তখন আর প্রাণধারণ ও প্রাণরক্ষার উপযোগী থাকবেনা। তাই তাঁরা এখন পুরোটা না হলেও পৃথিবীর অন্তত ৫০ শতাংশ ভূমি, বন ও সমুদ্র রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।
এই গ্রহের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য তাঁরা আদিবাসীদের লোকজ জ্ঞানের ব্যবহার এবং যথাযথ মানব উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপের কথা বলছেন। এই বিজ্ঞানীদের মতে, ডাইনোসাররা যে গতিতে ও যে সময়ের মধ্যে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে ঠিক সেই গতিতেই এখন পৃথিবীর প্রাণপ্রবাহ ও প্রাণবৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে। আর এ ধারা চলতে থাকলে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ বন্যপ্রাণীই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন সম্ভাব্য ‘ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি’ [6th mass extinction]। আমরা জানি যে, এর আগে হাজার-কোটি বছর সময়কালের মধ্যে পৃথিবীর প্রাণীজগৎ ও প্রাণপ্রবাহ এই ধরনের পাঁচটি গণবিলুপ্তির শিকার হয়েছিল, যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত এই গ্রহের অতিকায় ডাইনোসারদের গণবিলুপ্তি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নির্বিচারে বন ও গাছাপালা ধ্বংস করার ফলেই তথাকথিত সভ্য মানুষ ও আধুনিক পৃথিবীর এই সঙ্কটাপন্ন অবস্থা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০০৫ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমানে পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ৩০ শতাংশ মাত্র বনভূমি, যা পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীকুলের সবল জীবনধারণের জন্য খুবই অপ্রতুল। আর উদ্বেগের বিষয়টি হলো, পর্যটন ও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণসহ মানুষের নানা ভোগবাদী নেতিবাচক কর্মকান্ডের ফলে পৃথিবী তার এই ৩০ শতাংশ বনভূমি থেকেও প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬২ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিক এলাকা হারিয়ে ফেলছে।
শুধু বৃক্ষনিধনের কারণেই পৃথিবী থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে, যা পৃথিবীবাসীর জন্য সত্যিই গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের বিষয়। তবে এই বিজ্ঞানীরা একটি আশার বাণীও আমাদের শোনাচ্ছেন। সেটি হলো, যদি মানুষ নিজেদের জ্ঞান ও শুভবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর চলমান নানারূপ শোষণ-উৎপীড়ন বন্ধ করার পাশাপাশি তাদের চিরায়ত ভূমি-বন জবরদখল হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষার জন্য যুৎসই কর্মপন্থা বের করতে পারে, নির্বিচার বন উজার ও দূষণযুক্ত শিল্প কারখানা বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানী, শিল্প ও কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে পারে; তাহলে পৃথিবীর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ উদ্ভিদ ও প্রাণপ্রজাতি এখনও রক্ষা করা সম্ভব।
উত্তরণ কোন পথে?
বাংলাদেশের গণমানুষের কথিত ভঙ্গুর নৈতিকতা দেশের ততোধিক ভঙ্গুর প্রকৃতি ও পরিবেশকে কিভাবে রক্ষা করবে তা এক বিরাট প্রশ্ন বৈকি! ইতোপূর্বে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স’ প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি যে, রাষ্ট্রের সুশাসন, বাতাসের গুণগত মান ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতার অভাবসহ গ্রীণহাউজ গ্যাস নির্গমণ রোধে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের ঘাটতিই পরিবেশ সংরক্ষণজনিত ব্যর্থতার মূল কারণ।
এই মানদন্ডের নিরিখে অনেকগুলো অপ্রিয় বিষয় সামনে চলে আসে, যা বাংলাদেশের সুশাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা নিশ্চয় প্রশ্ন করতে পারি, এদেশে কার্যকর গণতন্ত্র ও সুশাসনের উপস্থিতি আদৌ রয়েছে কিনা? দেশের স্বাধীনতা লাভের পর অনেক রাষ্ট্রীয়/জাতীয় নীতিমালা প্রণীত হয়েছে, সেগুলো কার্যকরভাবে অনুসৃত হচ্ছে কিনা? দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে কিনা? নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ দেশের অন্যান্য সাংবিধানিক/সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে পারছে কিনা?
দেশের সরকারি-বেসরকারি তথা সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রকোপ ও প্রবণতা কতটুকু এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে কিনা? আঞ্চলিকতাবাদ, স্বজনপ্রীতি, পরিবারতন্ত্র, আমলাতোষণ প্রভৃতি অপগুণ সরকারেরর নীতিনির্ধারণী মহলে কতটুকু গুরুত্ব বা প্রাধান্য পাচ্ছে? রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রাধান্য বিস্তার করছে কিনা? দেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগণ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, নিপীড়ন ও শোষণের শিকার হচ্ছেন কিনা? দেশে কি সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকর আছে? দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্র যথাযথ পদক্ষেপ ও নীতি গ্রহণ করছে কিনা? বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মত প্রকাশ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক কিনা? এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক প্রশ্ন নিশ্চয়ই উত্থাপন করা যায়।
তবে উপরোক্ত অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর যদি নেতিবাচক হয় তাহলে আমাদের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ এক্ষেত্রে নেতিবাচক উত্তরের সাথে নীতিহীনতা তথা নৈতিক অধঃপতনের বিষয়টিও জড়িত। আর অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হলে প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। কিন্তু আমাদের তাবৎ আলোচনার পরিসংখ্যান বলছে, এক্ষেত্রে নিঃশর্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ একেবারেই নেই। কারণ পরিবেশ, নদী ও বায়ু দূষণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ভূমিক্ষয়, বনবিনাশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তুদের অভিবাসন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো বেশ বিপর্যস্ত, সঙ্গীন অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে এখানে মোটা দাগে কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা যেতে পারে। যেমন –
[১] দেশে কার্যকর গণতন্ত্র, সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

[২] পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কিত যুগোপযোগী নীতিমালা এবং আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

[৩] জাতিসংঘ, আইএলও, ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায় ও সংস্থা কর্তৃক প্রণীত এতদসংক্রান্ত ঘোষণা, নীতিমালা, আইন ও সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
[৪] পরিবেশ সুরক্ষায় আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণসহ তাদের প্রথাগত লোকজ জ্ঞান যথাযথ গুরুত্বের সাথে ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে হবে।
[৫] নৈতিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।
[৬] জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে প্রকৃতি, পরিবেশ, নৈতিকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সহিংস সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে সচেতনতামূলক লেখা ও পাঠোপকরণ অন্তর্ভুক্ত ও প্রচার করতে হবে।
[৭] জিরো টলারেন্স নীতির ভিত্তিতে দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে।
[৮] বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, পরিবেশ আদালত, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রভৃতি সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এসব সংস্থা দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় যথাসময়ে যথোপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারে।
[৯] দেশের বন বিভাগ ও তার আধিকারিকদের কথিত দুর্নীতির উপর কঠোরভাবে লাগাম টেনে ধরতে হবে।
[১০] সুপরিকল্পিত নীতিমালা ও কর্মসূচির ভিত্তিতে দেশের সর্বত্র বনায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশজ ও প্রকৃতিবান্ধব বনায়নের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। বিদেশী প্রজাতির বৃক্ষরোপণ ও বনায়নকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
[১১] স্থানীয় জনগণের সম্মতি ছাড়া পর্যটন, সামরিক স্থাপনা ও সরকারি দপ্তরের সম্প্রসারণ, সংরক্ষিত বনের পরিধি বৃদ্ধি, সীমান্ত চৌকি স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি অজুহাতে নির্বিচারে পাহাড় ও বনাঞ্চল অধিগ্রহণ করা যাবেনা।
[১২] উক্ত উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রথাগত আবাসভূমি, বাসগৃহ, বসতভিটা থেকে স্থানীয় বাসিন্দা/আদিবাসী/পাহাড়িদেরকে উচ্ছেদ করা যাবেনা।
[১৩] আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করাসহ তাদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা বিধান এবং নিজস্ব ভাষা-জাতীয়তা-কৃষ্টি-সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের সুযোগ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।
[১৪] বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রভৃতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে নিয়মিত কূটনৈতিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং বৈশ্বিক পরিসরে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সচেষ্ট থাকবে।
[১৫] বাংলাদেশ সরকার দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সেই সাথে দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে তাদের নিজদেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেবে। কারণ বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয়দানের ফলে ইতোমধ্যে সেখানকার ৫-৬ হাজার একর বনভূমি ও স্থানীয় গাছপালা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
[১৬] বাংলাদেশ সরকার ঢাকাসহ দেশের প্রধান নগরীগুলোর চারপাশে গড়ে ওঠা ইটভাটার দূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধ করবে। পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা স্থাপনে উৎসাহ-প্রণোদনা প্রদান ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সরকার ক্রমান্বয়ে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমণের পথ রুদ্ধ করবে।
[১৭] যানযট নিরসনসহ মাটি, নদী ও বায়ুদূষণ রোধে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
[১৮] নির্মল প্রকৃতি, পরিবেশ এবং নৈতিকতাসমৃদ্ধ জীবনাচার ও জীবনযাপন পদ্ধতি মানবজাতির স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু অর্জনের চাবিকাঠি – এই মর্মে সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরসমূহ ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করবে।
[১৯] সরকার ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত আইনসমূহের যথাযথ সংস্কার সাধন করে আদিবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষাসহ যুগোপযোগী আধুনিক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এবং বিশ্বপরিসরে সরব ও সক্রিয় প্রকৃতিবিদ ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শ ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
[২০] বাংলাদেশ সরকার দেশের আদিবাসী এবং অন্যান্য জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার নিশ্চিত করবে। সেই সাথে তাদের উপর বাঙালি বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর জাতি-ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতিগত একাধিপত্য, ভাবাধিপত্য তথা আগ্রাসন যাতে কায়েম না নয়; সে ব্যাপারে যথাযথ সংরক্ষণমূলক (positive discrimination) ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উপরে আলোচিত বিষয়, মতামত ও সুপারিশসমূহ যথাযথভাবে অনুসৃত ও বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ চলমান বিপর্যয়ের হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে। ফলে বৈশ্বিক মানদন্ডে জাতির নৈতিকতার মানও অধিকতর উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।
লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা

পপুলার পোস্ট

Related Post

স্মৃতির অন্তরালে ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

স্মৃতির অন্তরালে ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সম্প্রদায় হতে নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনে যারা অগ্রগামী ছিলেন ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান তাঁদের মধ্যে...

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

শহর অঞ্চলের সমাজঃ পাহাড়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্তিতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি সংস্কৃতিক আগ্রাসন। পাহাড়ের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে...

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

পানির নিচে সেই ঝগড়াবিল আদাম: আমার নাম করুণাময় চাকমা। বর্তমান নিবাস রূপকারী, মারিশ্যাতে হলেও রাঙামাটির যে পর্যটন মােটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *