আর্কাইভ

আন্তর্জাতিক নারী দিবসঃ জুম্ম জাতির করণীয়

by | Mar 9, 2021 | সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে

ছবি : ইন্টারনেট

লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা

সুপ্রিয় বন্ধুগণ, আজ ঐতিহাসিক ৮ মার্চ ২০২১। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। তাই এই বিশেষ দিনে আপনাদের সবাইকে আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সেইসাথে আমার কিছু বক্তব্যও উপস্থাপন করছি, যা নিম্নরূপঃ

[১] আমাদের দেশের, সমাজের কোনো কোনো নেতা-নেত্রীকে বলতে শুনি, আগে জাতির মৌলিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভৃতি অধিকার অর্জিত হোক, তারপর সমাজে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে। এক সময় আমরা যখন উপমহাদেশের খ্যাতিমান জেন্ডার বিশেষজ্ঞ কমলাদি’র [কমলা ভাসিন] কাছে জেন্ডার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম, সেদিনও অংশগ্রহণকারী কিছু বাঙালি বামপন্থী/ডানপন্থী বন্ধু, সহকর্মীকে এই ইস্যুতে তাঁর সাথে বিতর্কে প্রবৃত্ত হতে দেখেছি। আসলে এই বিতর্কটি বেশ পুরনো। আলোচ্য দৃষ্টিভঙ্গিটিও যে পুরুষতান্ত্রিক পক্ষপাত তথা অবিচারদুষ্ট, সেটি ১৭৯২ সালে একটি বই লিখে ও ছাপিয়ে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেইকালে মাত্র তেত্রিশ বছরের এক তরুণী এবং আধুনিক নারীবাদের জননী মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট। তাঁর সেই কালজয়ী বইটির নাম ছিলো ‘A Vindication of the Rights of Woman: with Strictures on Political and Moral Subjects’. পরবর্তীকালে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জন স্টুয়ার্ট মিল, হেনরিক ইবসেন, ক্লারা জেটকিন, বেগম রোকেয়া, হুদা শারাবী, ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোন দ্য বোভোয়া, কেট মিলেট প্রমুখ নারীবাদী-দার্শনিক-সাহিত্যিক-সমাজ সংস্কারকগণ জগতের নারী-পুরুষের এই সমানাধিকার তথা নারীমুক্তির বিতর্ককে সমাধানের প্রয়াস করেছেন। কিন্তু তাঁদের সর্ববিধ আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিতর্কটি আজো যথারীতি চলমান রয়েছে, মূলত বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত হাজার-লক্ষ বছরের পুরুষতান্ত্রিক জাঙার মানুষের মস্তিষ্ক থেকে দূরীভূত হচ্ছেনা বলে।
[২] অথচ বিষয়টি বোঝা খুবই সহজ। আমি পুরুষ একজন মানুষ হিসেবে জগতে যে অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করছি, একজন নারীও মানুষ হিসেবে ঠিক সেই পরিমাণ অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবেন। এর কমও নয়, বেশিও নয়। আর যদি বেশি ভোগ করতে পারেন, তাহলে সেটি তো অবশ্যই হবে মানব সভ্যতার অগ্রগতিরই অমূল্য স্মারক। অর্থাৎ নারীকে আমি অধিকার ও মর্যাদার সকল ক্ষেত্রে সমান মানুষ হিসেবেই গণ্য করবো। ফলে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার বা প্রাথমিক পণ্য প্রয়োজন [প্রফেসর অমর্ত্য সেনের বিবেচনায়] থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-প্রযুক্তিগত তথা আমাদের জীবন-জগতের সকল ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের এই সমানাধিকার ও সমমর্যাদার স্বাভাবিক চর্চা নিশ্চিত হতে হবে। আর বিপন্ন/অধিকারহারা/সংগ্রামরত কোনো সমাজ বা জাতি তার কাঙ্খিত রাজনৈতিক অধিকার, স্বশাসন এখনো অর্জন করতে পারেনি বলে তো সেই সমাজস্থ সভ্যদের আহার-বিহার, সন্তান উৎপাদনসহ নৈমিত্তিক কোনো ক্রিয়াকর্ম থেমে নেই। সুতরাং নারীর সমানাধিকারের বিষয়টিও আসলে হতে হবে এইসব নৈমিত্তিক ক্রিয়াকর্মের মতোই একটি জরুরি কর্তব্য, যা আমাদের পুরুষ-নারী সবাইকেই মগজে গেঁথে নিতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট অধিকার প্রাপ্তি কিংবা সময়সীমার শর্তে বেঁধে দিয়ে এই নৈমিত্তিক কর্তব্যকে অসম্পাদিত রাখা যাবেনা। কেননা আমাদের মহান নেতা, জুম্ম জাতির জনক শ্রী এম এন লারমাও বলে গেছেন – ‘পুরুষ যে অধিকার ভোগ করে সে অধিকার নারীকেও দিতে হবে। কারণ তারাও সমাজের অর্ধেক অংশ।’
[৩] তাই অধিকারহারা জাতি বা সমাজেও বর্তমানে লভ্য সকল অধিকার ও মর্যাদা নারী-পুরুষ উভয়েই সমানভাবে ভোগ করবেন, এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আর বাকি যেসব অধিকার এখনো অর্জিত হয়নি তার জন্য সমাজের নারী-পুরুষ সকলে মিলে একসাথে-একযোগে জোরদার আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
[৪] অনেকটা জুম্ম জাতির উপরোক্ত অগ্রহণযোগ্য জেন্ডার-চেতনার অনুকারে কালজয়ী সমাজ-দার্শনিক কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকালের এবং পরবর্তীতে চর্চিত তাঁর বিপ্লব-দর্শনের মধ্যেও আলোচ্য জেন্ডার বিষয়ক চেতন-ঘাটতিটিকে নিখুঁতভাবে ঠাহর করেছিলেন ভারতের একজন স্বনামধন্য-নারীবাদী-সংবেদনশীল কবি অধ্যাপক মল্লিকা সেনগুপ্ত। তাই তিনি একসময় কার্ল মার্কসকে উদ্দেশ্য করে নিচের অনবদ্য কবিতাটি রচনা করেছিলেন। দেখা যাচ্ছে, জেন্ডার বৈষম্যের চেতনা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতি শুধুমাত্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের মানসিক সমস্যা নয়, প্রগতি চেতনার ধারক-বাহকদের মননে-দর্শনেও এই ঘাটতি নানাভাবে, নানাসময়ে চিহ্নিত হয়েছে। জগতের বামপন্থী অধিকাংশের অনড়-অনমনীয় বিপ্লব চেতনায় বিরাজিত এই ঘাটতির বিরুদ্ধে নিজের লেখনি ও জনসম্পৃক্ত প্রতিবাদের মাধ্যমে আজীবন প্রবলভাবে লড়ে গেছেন যুগপৎ অস্তিত্ববাদী ও নারীবাদী দার্শনিক-সাহিত্যিক সিমোন দ্য বোভোয়াও। পৃথিবীর নানা প্রান্তে, নানা সময়ে, নানা সমাজে মানবিক সাম্য-সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংঘটিত এইসব ভিন্নতর বৈপ্লবিক দর্শন ও বিষয়গুলোকে আন্তরিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের জুম্ম জাতিতেও বিরাজমান সমুদয় বিভাজন-বৈষম্য দূরীভূত করে নারী-পুরুষের সমানাধিকার-সমমর্যাদা নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে মনে করি। এক্ষেত্রে আমাদের সবার চেতনাগত স্বচ্ছতা অর্জনে পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের নিম্নোক্ত কবিতাটি বেশ সহায়ক হবে বলে বিশ্বাস করি। তাই আগ্রহী বন্ধু যাঁরা, প্লিজ কবিতাটি পড়ে দেখুন।
[৫]
আপনি বলুন, মার্কস
ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গম বোনা শুরু করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে?
আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক, কে শ্রমিক নয়
নতুনযন্ত্রের যারা মাসমাইনের কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে!
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিকগৃহিণী
প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে, খাবার বানায়
হাড়ভাঙা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয়!
আপনি বলুন, মার্কস, শ্রম কাকে বলে?
গৃহশ্রমে মজুরী হয়না বলে মেয়েগুলি শুধু
ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে
আর কমরেড শুধু যার হাতে কাস্তে হাতুড়ি!
আপনাকে মানায় না এই অবিচার
কখনো বিপ্লব হলে
পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাষ্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে?
[ কবিতাসূত্রঃ ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, পৃষ্ঠা-৫৯। ছবির উৎসঃ ইন্টারনেট ]।
আজকের এই বিশেষ দিনে জগতের সকল নারীর প্রতি এবং নারী-পুরুষের সামগ্রিক সমানাধিকার ও সমমর্যাদায় বিশ্বাসী সকল মানুষের প্রতি রইলো আমার আন্তরিক অভিনন্দন, শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। জগতের সবার মঙ্গল হোক ।

পপুলার পোস্ট

Related Post

স্মৃতির অন্তরালে ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

স্মৃতির অন্তরালে ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সম্প্রদায় হতে নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনে যারা অগ্রগামী ছিলেন ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান তাঁদের মধ্যে...

আদিবাসী ও প্রাণ-প্রকৃতির বিপন্নতাঃ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

আদিবাসী ও প্রাণ-প্রকৃতির বিপন্নতাঃ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

``জনমানবহীন অরণ্যপ্রান্তর ও প্রকৃতিই হলো বিশ্বব্রহ্মান্ডের গহীনে প্রবেশের পরিচ্ছন্নতম পথ | `` -- জন মুয়ের, স্কটিশ-আমেরিকান প্রকৃতিবিদ ও লেখক, পরিবেশ...

রাঙামাটির ভূষণছড়া হত্যাকান্ড নিয়ে দেশের মূলধারার মিডিয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের প্রতিবাদে  জুম্ম ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম এর প্রতিবাদ ও  বিবৃতি

রাঙামাটির ভূষণছড়া হত্যাকান্ড নিয়ে দেশের মূলধারার মিডিয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের প্রতিবাদে  জুম্ম ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম এর প্রতিবাদ ও  বিবৃতি

গত ৩১ মে ২০২১, দেশের মূল ধারার মিডিয়া যমুনা টিভি, ইনডিপেনডেন্ট টিভি, এসএ টিভি, ডিবিসি নিউজ টিভি, সমকাল, দৈনিক ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ভূষণছড়া...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *