আর্কাইভ

আন্দোলন মানে একটি জীবন যাপন করা

by | May 8, 2021 | Uncategorized, আত্মকথা/ জীবনী, মানবাধিকার

(১) জীবন থেকে নেয়া

এক যুগেরও অধিক কাল আগের কথা। তুমুল ছাত্র রাজনীতি করতাম তখন। বছরে এক-দু বার রাজনৈতিক শিক্ষাশিবির হতো। সেখানে মার্ক্সবাদ, ভাবাদর্শ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-দর্শন ইত্যাদি নিয়ে ওয়ার্কশপ হতো। নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক-মতাদর্শিক শিক্ষায় দীক্ষিত করা আর পরিবর্তিত বাস্তবতায় পার্টির আদর্শিক-সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর সাথে আলোচনা ছিলো তার উদ্দেশ্য।

শিক্ষাশিবির বা স্কুলিংয়ে আমরা আমাদের জিজ্ঞাস্য প্রশ্নগুলো তুলে ধরতাম তাত্ত্বিক নেতৃবৃন্দের কাছে। একবার একটা খুব সরল প্রশ্ন তুলে ধরেছিলো আমাদের কেউঃ “আমরা কেন বিপ্লব দীর্ঘজীবি বলি? বিপ্লব বা যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বা কনফ্লিক্ট দীর্ঘকাল চলতে থাকলে তা কি দেশের জন্য বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে না?”

খুব সম্ভব কেন্দ্রীয় নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী সেদিন প্রশ্নের উত্তরটা দিয়েছিলেন। আমাদের সবটাতে মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে, এই বলে শুরুতে মৃদু ভর্ৎসনা করেন তিনি। তারপর বলেন- বিপ্লব মানে একটা যুদ্ধ করলাম বা অভ্যুত্থান হয়ে সব খতম হয়ে গেলো তা নয়। বিপ্লব দীর্ঘজীবি হওয়ার মানে বিপ্লব সংহত করা। প্রতিবিপ্লব আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই কেবল বিপ্লব দীর্ঘজীবি হয়।

বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক কথাটার মানে যা কিছুর জন্য বিপ্লব- একটা মানবিক সমাজ নির্মানের স্বপ্ন- তাকে চিরজাগরুক রাখা। বিপ্লবের মূলমন্ত্র, তার স্পিরিট আর আদর্শ নিয়ে পার্টির বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘজীবি করা; যেন মানুষের মধ্যে বিপ্লবের শিক্ষা, আদর্শ বেঁচে থাকে দীর্ঘকাল আর দেশ পরিচালিত হয় সেই বিপ্লবের মন্ত্রে, সেই উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যে।

রাজনীতি জীবনের অনেক কিছুই এখন আর মানিনা আমি। কিন্তু তার অনেক শিক্ষা আজও খুব অমূল্য মনে হয়। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- চেতনায় জীবন যাপন করা। আজতক এক্টিভিজমকে আমি সেভাবেই দেখি। অনেকে হয়তো সেভাবে দেখেন না।ব্যাপারটা খুলে বলি- উপরের উদাহরণটা দিয়েই বলিঃ

আশি-নব্বইয়ের দশকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন কিন্তু কখনো কোন মিছিলে যাননি এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া বিরল। আমাদের বেশিরভাগই শিক্ষাজীবনের পর আর “রাজনীতিতে যাইটাই” না। আমাদের কাছে শীক্ষার্থী জীবনের সময়টাই হচ্ছে “রাজনীতির সময়” আর রাজনীতির সমার্থক হচ্ছে মিটিং-মিছিল।

আমরা বয়সকালে মিটিং-মিছিল-হামলা-মামলা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিই। বয়স চল্লিশের দিকে একটু হেলে পড়লেই বলি, “না বাবা! অনেক করেছি ওসব, এবার একটু সংসারটা গোছাই ! গিন্নীরা তার আগেই বলে, দেশ-জাত উদ্ধার না করে, বাজারটা করে দিয়ে আমায় উদ্ধার করো ! সেই গিন্নীও একদিন মিছিলে ছিলো হয়তো!

এখানে যে ব্যাপারটা আমরা দেখিনা, তা হচ্ছে- সেই সময়ের মিছিল-মিটিংয়ের স্পিরিট বা চেতনার ব্যাপারটা। অনেকে আসলে জনজোয়ারে ভেসে মিছিলে যায়। একদিন জোয়ার এসে থেমে যায় মধ্যবিত্ত সংসারের কূলে।

সংসারের সবাই বলে- ওসব অনেক করেছ, এবার ক্ষান্তি দ্যাও! কিন্তু ওসব যে আদর্শিক বিশ্বাস, স্বপ্ন নিয়ে করেছিলেন- তা কি পূর্ণ হয়েছে দাদা? নাকি সেসব তরুণ সংবেদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া? সেসব কি ছাত্রকালে দু চারটা মিছিল করে ভুলে যাওয়ার মত ব্যাপার? সেই মিছিলের চেতনা কি ভুলে যাওয়া যায়?

এমন প্রশ্ন আসলে সবাই আবার বলেন -“নাহ! তা হয়তো হয়নি, কিন্তু দাদা তুমি কি আর একা জাত-সংসার উদ্ধার করবে? সুতরাং… ক্ষান্তি দাও” ... এইবার চলে আসলো আপসের ভাবনা… এখানটাতে পৌঁছে কেউ সক্রিয় হন, কেউ নিস্ক্রীয়, কেউ এক্টিভ, কেউ প্যাসিভ।

এক্টিভিজমকে আমি এই মার্জিনে বিবেচনা করতে চাই। তার বিপরীতটা দিয়ে তুলনা করতে চাই। জীবনের অনেক প্রশ্নে আমরা passive ভূমিকা পালন করি। কোন কোনটাই আমরা active হই। যেটাতে আমরা এক্টিভ বা সক্রিয় ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করি- সেটাতে আমরা এক্টিভিজম করি। যারা এতে প্যাসিভ ভূমিকা পালন করেন তাঁদের আমরা এক্টিভিস্ট বলি না। যেমন আমি প্রাণি অধিকার এক্টিভিস্ট নই।

কারোর ভূমিকা রাজনৈতিক সংগ্রামে, কারোর ভূমিকা জলবায়ু রক্ষায়, কারোর বা প্রানীর প্রতি নৃশংসতার বিরুদ্ধে যাকে Animal rights activism বলে। নারীরা অনেকে সমাজে নারীর সমানাধিকারের লড়াইয়ে আছেন- তাঁরা ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী এক্টিভিস্ট, অনেকে বুদ্ধিবৃত্তির লড়াইকেই প্রধান বলে বিশ্বাস করেন- তাঁরা ইন্টেলেকচ্যুয়াল এক্টিভিস্ট। অনেকের লড়াইয়ের মাধ্যম হচ্ছে শিল্প চর্চা-তাঁদের একটা নাম আছে- Artivist (Art+activist)

পশ্চিমা দুনিয়ায় হরেক রকমের এক্টিভিজম দেখা যায়। এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন বলে একটা ক্লাইমেট এক্টিভিস্ট গ্রুপ আছে- যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাণের বিলুপ্তি নিয়ে কাজ করেন।

আমি অস্ট্রেলিয়ার এমনেস্টি গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকায় তাঁদের Human rights activism বিষয়ে জানি। এখানকার এক্টিভিজমের সাথে বাংলাদেশে যাঁরা আক্ষরিকভাবে “এক্টিভিজম” করেন, তাঁদেরটা আবার ঠিক মেলে না।

(২) Activism for profession’s sake নাকি professions for activism’s sake

এমন অনেককে দেখেছি যাঁরা এক্টিভিজমকে পেশা হিসাবে নিয়েছেন। আমার মনে আছে পাহাড়ের স্বনামধন্যা এক এনজিও নারীবাদী একবার সামাজিক মাধ্যমে বান্দরবানের বিলাসবহুল হোটেলের সুইমিং পুলে স্নান করার পোস্ট দিয়েছিলেন। তিনি সুইমিংপুলে স্নান করছেন তাতেও হ্যাশট্যাগ ফেমিনিজম (#feminism)- দিয়েছিলেন।

উনার মত অনেকের কাছে একটিভিজম একটা পেশা। এক্টিভিজমকে পেশা হিসাবে নিলে সেটা আর দশটা পেশার মতই হয়ে যায়- উকিল, একাউন্ট্যান্ট, ডাক্তার, কনসালট্যান্ট ইত্যাদি পেশার মত।

মতাদর্শ জানা আর স্কিল বা দক্ষতা অর্জন এক নয় নিশ্চয়। যদিও পেশাদার এক্টিভিস্টদের কাছে কোন বিশেষ তত্ত্ব জানাও একটা স্কিল যা দিয়ে রোজগার করা যায়। অনেকটা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং জানা বা একাউন্টিং জানার মত ব্যাপার। আর দশটা চাকুরির মত “নয়টা-পাঁচটা” এক্টিভিজমের চাকুরি উনাদের।

কোন ধারনা বা বিশ্বাস, বা মতাদর্শ- ভাবাদর্শ চর্চা করা, তাকে বিশ্বাস করাও একটা পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি পার্বত্য জনপদের বৌদ্ধ মন্দিরে এমন দুয়েকজন ভান্তেকে (বৌদ্ধ সন্ন্যাসি) দেখেছি, যাঁদের কাছে বৌদ্ধ ধর্ম একটা জীবিকার উপায় ছাড়া আর কিছু নয়। ভান্তেদের যাবতীয় আচার পালন তার অনুষঙ্গ মাত্র।

পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে গত শূন্য দশকের প্রেক্ষাপট অনেকে জানেন। পাড়াগাঁয়ের অনেক অকর্মন্য লোকজন আন্ডারগ্রাউন্ড দল করতো, কেননা তাদের জীবিকার আর কোন উপায় ছিলো না। দলের আদর্শ বা সংগ্রাম তাঁদের কাছে মূখ্য ছিলো না কখনো, মূখ্য ছিলো দলের ছত্রছায়ায় জীবিকা নির্বাহ করা।

ক্যারিয়ারের জন্য একটিভিজম আমার কাছে তাই অস্বস্তিকর ঠেকে। বোধ করি দীর্ঘকাল মার্ক্সবাদী সংগ্রামের ফলে এই এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আমার মাথায় ঠেসে গেছে। মার্ক্সবাদী তত্ত্ব জেনে শ্রমিকের লড়াই করা আর তাকে বেচে খাওয়া এক নয়। কিছু বাম দল বামের ব্যানার লাগিয়ে আত্মবিক্রয় করে আসছে। আওয়ামীলিগের ধামাধরা লেজুর দলগুলোকে দেখুন।

তেমনি নারীবাদে বিশ্বাস রেখে বিনা স্বার্থে নারীমুক্তির লড়াই করা আর নারীবাদের তত্ত্ব জেনে এনজিও করা বা ক্যারিয়ার গড়া এক নয়। আমি যখন এনাদের ক্যারিয়ারিস্টিক এক্টিভিজম দেখি তখন আমার পা ফাটা, রোদে পোড়া আইডিয়ালিস্ট নেতাদের কথা মনে পড়ে।

কত ওয়ার্কশপ-স্কুলিংএ আমাদের তাঁরা মানবজাতির ইতিহাস, রাজনীতি-ভাবাদর্শ শিখিয়েছিলেন; তার মধ্যে নারীবাদও ছিলো। কিন্তু তাতে পয়সা কোথায়? উলটো সরকারী লেঠেলের মার, মামলা হামলা… কিছুদিন আগেই আমার সেই দল বাসদের নেতা, আমার প্রিয় নেতা জনার্দন দত্ত নান্টুদাকে পুলিশ ধরেছিলো।

জগত-আর জীবনকে মার্ক্সবাদের দৃষ্টিতে বিচারের দুরূহ জ্ঞানকান্ড তাঁদের কাছে স্কিল ছিলো না, ছিলো জীবনের অপরিহার্য পাঠ । তাঁদের লড়াই কখনো জীবিকার এক্টিভিজম ছিলো না, ছিলো না পার্ট টাইমের প্যাশন। আজও তাঁদের কাছে এক্টিভিজম এক বৈপ্লবিক কর্তব্য। একটা জীবনব্যাপী ব্রত পালন। একটা দায়-সামাজিক দায়, মানুষের জন্য দায়, মানবতা আর সভ্যতার জন্য দায়।

আমাদের মত মধ্যবিত্তের হয়তো তেমন সর্বব্যাপক বিপ্লব চর্চা বা জীবনব্যাপী এক্টিভিজমের চর্চা সম্ভব নয়। ক্ষুন্নিবৃত্তি আছে, সংসার আছে, আছে ছোট-খাটো খায়েস। কিন্তু এক্টিভিজমকে কিভাবে দেখবো, তার পরিস্কার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি। তাকে বুকে ধারণ করবো নাকি পাকস্থলীতে, তাকে দায় হিসাবে দেখবো নাকি পেশা- এইসব বিষয়ে ভাবা জরুরি।

এক্টিভিজমকে অনেকে ethical, moral responsibility হিসাবে বিশ্বাস করেন এবং সেই নৈতিক দায়বদ্ধতা পালনের চেষ্টা করেন। আমরা গরিব গুর্বো দেশের লোক- আমরা কেউ কেউ মতাদর্শ বুকে না নিয়ে পেটে মানে পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে দিই, তাই একে প্রফেশন হিসাবে দেখি।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের মোড়গুলোয় অনেক তরুন-তরুনিকে বিভিন্ন দাতা সংস্থার জন্য চাঁদা চাইতে দেখি। সেসব চাঁদার পয়সা বাংলাদেশের মত দেশে যায়। তার মধ্যে রেড ক্রস আছে, ফ্রেড হলোজ, প্লান ইন্টারন্যাশনাল, এমনেস্টিও আছে। হাজার হাজার মানুষ বিনা পয়সায় এসব সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের কনটেক্সট আর এদেশের কনটেক্সট আলাদা। এদেশ থেকে ফান্ড বাংলাদেশে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে কেউ চাইলে কিছুটা আপস করুক আপত্তি নাই – রুটিরুজি তো যোগাতে হবে! কিন্তু activism for profession’s sake আর professions for activism’s sake নিশ্চয় এক নয়।

যাকে নৈতিক, মানবিক দায়িত্ব হিসাবে দেখা দরকার, তাকে পেশা হিসাবে নিলে তা activism for profession’s sake হয়ে যায়। ব্যক্তিগত জীবনে সংসারের যোগান দিতে আমি নানান কাজ করি। দোকানী কাজ করি, অফিসেও কাজ করি। বাকি সময়টা আমার দায়বদ্ধতা পালনের সময়। আমার জন্য রুটি-রুজির কাজ হচ্ছে professions for activism’s sake

পারলে ফুলটাইম এক্টিভিজমই করতাম; ছাপোষা বলে পারিনা। এটা একান্ত আমার অবস্থান থেকে বলছি। আর কারোর সাথে এমনটা মিলবে না। সবার জীবনের সংকট, বাস্তবতা আলাদা।

বাস্তবতা মেনেই সামাজিক-নৈতিক দায়িত্ব পালন করা যায়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকায় থেকেও এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। কিন্তু নিজের সাথে বোঝাপড়া জরুরি- আপনার এক্টিভিজম activism for profession’s sake হবে নাকি professions for activism’s sake হবে।

(৩) আন্দোলন মানে

একটি জীবন যাপন করা

একবার আমাকে একজন বলেছিলেন, একা আপনি বুঝি খুব সচেতন, আমরা কি অ্যাঁ? বড় বড় কথা বলাই কি সচেতনতা? আসলে আমি ব্যাপারটাকে ঠিক এভাবে দেখি না। যেমন করে আমি এক্টিভিজমকেও দেখি না। পশ্চিমা দেশে এক্টিভিজম অনেক সময় একটা সৌখিনতা। আমাদের দেশে যেমন মধ্যবিত্ত বিপ্লব বিলাস দেখা যায়- তেমন।

চেতনার সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক আছে। সচেতন মানুষ কোন না কোন ক্রিয়া করে, বা প্রতিক্রিয়া দেখায়। যেমন আগুনে হাত পড়লে যেমন আমরা চট করে হাত সরাই- তেমন। যে অচেতন সে লড়ে না, সে কিছু করে না, হয় সে নিস্ক্রীয় অথবা সে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করতে চায় না। সে হয় Inactive, অথবা passive. রোজা লুক্সেমবার্গ বলেছিলেন-

Those who don’t move don’t notice their chains

 

যার পায়ে শেকল বাঁধা অথচ অচেতন, সে যদি না নড়ে তবে টের পাবে কি করে তার পায়ে শেকল বাঁধা আছে? নড়াচড়ার মানে এখানে সক্রিয়তা আর সক্রীয়তার মানে এক্টিভিজম। যে লড়ে সে তত সচেতন হয়, যে যত সচেতন সে ততই সক্রীয়।

আমাদের সমাজে বেশিরভাগই হয় Inactive অথবা passive। কেউ পরোক্ষ অবস্থান নেন, কেউ বা প্রত্যক্ষভাবে ক্রিয়া করেন। এই যে অবস্থা অনুযায়ী অবস্থান নেয়া- অনেকের জন্য এটা চয়েস, অনেকের জন্য এটা উপায়হীনতা।

অনেকের জন্য নিতান্তই একটা চয়েস- অর্থাৎ, তিনি চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন- তেমন সময়, সুযোগ, রিসোর্স আছে- কিন্তু তবু তিনি কিছুই করবেন না। কেননা এটা তাঁর চয়েস। A choice not to act.

এই to act or not to act এর অবস্থায় অনেকেই এখন নেই। যেমন ধরুন- বাংলাদেশে থেকে আপনি সরকার-প্রশাসন-মিলিটারির সমালোচনা করতে পারবেন না। যত অন্যায়, জুলুমই হোক কিছু বলতে গেলেই হয়রানির শিকার হতে হবে।

কিন্তু যদি আপনি এ অবস্থায় এক্ট করতে পারেন- সে হোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ- তবু কি আপনি করবেন না? তখন কি এটা স্রেফ চয়েস? কবীর সুমনের ভাষায়- “অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগ“, যারা কোনদিন কিছু তেমন ভালো দেখতে পায় না। এখানটাই আমাদের জাজমেন্টাল না হয়ে উপায় থাকে না।

সমাজ-জাতির ক্রান্তিকালে যখন আমাদের কোন না কোন ভূমিকা নিতে হয়- হোক সে সক্রিয় ভূমিকা বা নিস্ক্রীয়- কাউকে যদি তখন “অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগ” পেয়ে বসে- ভাবীকাল কি আমাদের জাজমেন্ট না করে ছেড়ে দেবে?

কারোর যদি প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেবার অবস্থা না থাকে, তবে সে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করুক। তবু কিছু তো করুক! আর যাই করুক- অন্তত সেই cause টাকে প্রফেশন বানিয়ে বেচে না খাক!

এক্টিভিজম শব্দবন্ধটি পশ্চিমা প্রভাবে সক্রীয়তা পরিভাষা হিসাবে বাংলায় প্রচলন হচ্ছে ।সত্তর দশকে এই শব্দের উৎপত্তি। 

কালের বিবর্তনে তার ব্যাপ্তি আর ধারণার বহুমাত্রিকতা যোগ হয়েছে। যে যেভাবেই এক্টিভিজমকে দেখুক- Profession, passion, ideological struggle, class struggle ইত্যাদি- তাকে নিয়ে ভাবা দরকার।

আমি সঠিক এক্টিভিজম, বেঠিক এক্টিভিজম- এমন সীমারেখা টানতে বা জাজমেন্ট দিতে এই লেখা লিখছিনা। আমি এক্টিভিজম পদটাকে আমাদের কনটেক্সটে দেখতে চাই বলে আলাপটি তুলেছি। এই লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু লেখা লিখবো ভাবছি, তার শুরুটা করেছি এটা দিয়ে।

আমার কাছে সবসময় এক্টিভিজম মানে দীর্ঘজীবি বিপ্লবের মত এক জীবনব্যাপী ব্রত পালন। কেননা আমি বিশ্বাস করি আন্দোলন মানে একটি জীবন যাপন করা।

অস্ট্রেলিয়ায় হরেক রকমের এক্টিভিজম দেখা যায়। প্রানীর সমানাধিকারের জন্য লড়া বা ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার স্লোগানে মিছিল করা , অথবা সোশ্যাল জাস্টিসের জন্য আন্দোলন করলে এদেশে পুলিশ ধরে না, মারে না। এসবের জন্য কারোর ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে হয়। দু দেশের বাসস্তবতা আলাদা।

জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়স্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব“- আর তাই সেই সমাজে বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলনটাও একটা বৈপ্লবিক দায়িত্ব। আমাদের বাস্তব সংকটকে উপলদ্ধি করে সে অনুযায়ী ক্রিয়া করা দরকার।

In an age of universal deceit, telling the truth is a revolutionary act.

এ কথা সত্য- সবাই মিছিলে যাবে, সবাই রাইফেল ধরবে, সবাই কলম ধরবে- এমনটা অবাস্তব। যার যাতে দক্ষতা সে তাতে ক্রিয়া করুক। কিন্তু সংকটের উপলদ্ধি সবার থাকার দরকার- এই উপলদ্ধিকেই আমি সচেতনতা বলতে চাই।

এক দশক আগে আমরা কয়েকজন মিলে পাহাড়ের প্রথম ব্লগিং ও অনলাইন এক্টিভিজমের সূচনা করেছিলাম। সেদিন থেকে আমি আজও বিরামহীন ইন্টারনেটে লিখে যাচ্ছি। আমার কাছে মূলধারার মিডিয়ার বিপরীতে ইন্টারনেট একটা বিকল্প মাধ্যম।

বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়ায় আমাদের পাহাড়িদের কথা দশকের পর দশক ধরে চাপা পড়ে আছে মিলিটারি সেনসরশিপ আর মিডিয়া ব্লাকআউটের কালো চাদরে। এই চাদর ফুঁড়ে সত্য প্রকাশ করাই আমার কাছে একটা এক্টিভিজম।

মিডিয়ার মামদোবাজির সাথে যোগ হয়েছে Disinformation আর Misinformation. চারদিকে মিথ্যার বেসাতি আর জ্ঞানতাত্বিক দুর্বৃত্তপনা। এই বাস্তবতায় সত্য প্রকাশ করাও একটা এক্টিভিজম।

আজকের মোবাইল ইন্টারনেট আর সিটিজেন জার্নালিজমের স্বর্ণযুগে প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তিই একেকজন ব্রডকাস্টার, একেকজন জার্নালিস্ট হতে পারেন। সিটিজেন জার্নালিজম আর অনলাইন এক্টিভিজম নিয়ে আরেকটা লেখায় বলার চেষ্টা করবো অন্য কোথাও। আজ এটুকুই…

মূল লেখার শিরোনামঃ ঞা চাগাহ-২

প্রকাশকালঃ নভেম্বর, ২০২০

ব্লগার, এক্টিভিস্ট পাইচিংমং মারমার ব্যক্তিগত ব্লগে প্রকাশিত।

লেখক পাইচিংমং মারমার অনুমতিক্রমে প্রকাশিত।

 

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

শহর অঞ্চলের সমাজঃ পাহাড়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্তিতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি সংস্কৃতিক আগ্রাসন। পাহাড়ের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে...

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

পানির নিচে সেই ঝগড়াবিল আদাম: আমার নাম করুণাময় চাকমা। বর্তমান নিবাস রূপকারী, মারিশ্যাতে হলেও রাঙামাটির যে পর্যটন মােটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ...

সাজেকে বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে এবং পাহাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানববন্ধন

সাজেকে বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে এবং পাহাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানববন্ধন

সাজেকে বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে এবং সেনাক্যাম্প স্থাপন, পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ ও তথাকথিত উন্নয়নের নামে পাহাড়ি  উচ্ছেদের প্রতিবাদে...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *