আর্কাইভ

জুম পাহাড়ের নারীবাদঃ কিছু পর্যবেক্ষণ

by | Oct 7, 2020 | আদিবাসী বিষয়ক, বিবিধ, রাজনীতি- অর্থনীতি

অনুজপ্রতিম বন্ধু শ্রী দীপায়ন খীসার একটি পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় নিচের মন্তব্যটি লিখেছিলাম। কিন্তু আকারে কিছুটা বড়ো হওয়ায় জুকার মামা দীপায়নের টাইমলাইনে আমার মন্তব্যটিকে গ্রহণ করেননি। তাই নিজের ওয়ালে লেখাটিকে জুড়ে দিলাম [এতো কষ্ট করে লিখেছি যখন]। আগ্রহী বন্ধুগণ, দয়াপরবশ হয়ে আমার এই লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন কিংবা এড়িয়ে যেতে পারেন।

মূল রচনা

প্রিয় দীপায়ন, আমি আলোচিত, উত্থাপিত দৃষ্টিভঙ্গিটির নাম দিয়েছি – একরোখা, একচোখা নারীবাদ। সেই একচোখা, একরোখা দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চর্চিত কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদও বহুকাল ধরে কর্তৃত্বপরায়ণ শ্বেতাঙ্গ নারীবাদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে।

তাই পাহাড়ে আমদানিকৃত নারীবাদী আন্দোলনে বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের স্বভূমিজাত, জুম্ম সমাজের ইগ্যালিটাারিয়ান বৈশিষ্ট্য ও মূল্যবোধসমূহকে সঠিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে একটি সাম্যবাদী বিশেষায়িত নারীমুক্তি আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি, যা আমাদের জাতিগত নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের বিরোধী শক্তি না হয়ে বরং সহায়ক শক্তি হয়ে উঠবে। ।

কারণ, বিশ্বের দেশে দেশে চর্চিত নারীবাদেরও নানা অভিমুখ আছে, রকমফের আছে। আমাদের বিশেষ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারীবাদী/নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃতগণ কাউকে হুবহু অনুকরণ-অনুসরণ না করে জুম্ম জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি উদারনৈতিক নারীমুক্তি আন্দোলনের সূচনা করবেন, আন্দোলনকে এগিয়ে নেবেন এবং পুরুষরাও বিরোধিতার বদলে নারীমুক্তিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাবেন, সেই শুভকামনা করি।

যেমন, আমি ব্যক্তিগতভাবে সব ধরনের সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের পক্ষে। চাকমা ভাষায় ‘মিল্যা মানুচ, তুই হি বুঝিবে’ – এমন কাপুরুষোচিত বক্তব্য ও চিন্তাকে সর্বান্তকরণে ঘৃণা করি। মদ হেনেই মোক মারানা, ঐতিহ্যের নামে নারীদেরকে [তার অমতে] নানাবিধ সংস্কারের জালে আবদ্ধ করে রাখার চিন্তারও ঘোর বিরোধী আমি।

তার পরেও বলবো, আমাদের জুম্মবীরা সৌদি নারীদের চেয়ে, এমনকি স্বদেশের বাঙালি নারীদের চেয়েও বহুগুণে স্বাধীন। তাই সৌদি কিংবা বাঙালি নারীর মুক্তি আন্দোলনের সাথে জুম্মবীর নারীমুক্তি আন্দোলন হুবহু মিলবে না।

আমি আপাতত পৈতৃক/পারিবারিক সম্পত্তিতে জুম্ম নারীর সমানাধিকার নিশ্চিতকরণের দাবিটি নিয়ে আমাদের নারীমুক্তি আন্দোলন জোরদারকরণের পক্ষে। জুম্মদের সমাজপতি হিসেবে পাহাড়ের শ্রদ্ধেয় তিন রাজাবাবু একসাথে মিলে সম্পত্তিতে জুম্ম নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন [অনতিবিলম্বে]।

অবশ্য একটি যুক্তি দেওয়া হয় যে, জুম্ম নারী অন্য জাতির কাউকে বিয়ে করলে তার সম্পত্তি তখন সেই পরজাতিতে হস্তান্তরিত হয়ে যাবে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসি, গারো জাতিসহ পৃথিবীর মাতৃতান্ত্রিক অনেক জাতি নাকি এখন সেই কঠিন সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু আমার যুক্তি হলো, সেই সম্ভাব্য অঘটনটির আশঙ্কায় আমরা তো অনির্দিষ্টকালের জন্য আমাদের নারীদের অধিকারের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না।

আর সূক্ষ্মভাবে দেখলে বুঝবেন, একই যুক্তিতে কিন্তু বাংলাদেশ সরকারও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না, জাতিসংঘের পাঁচ মোড়লও ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ দিতে চাইছে না। অধিকারভীতির সেই একই সমস্যা। নিজের ভাগটা কমে যাবে কিনা, সেই আশঙ্কা!

তাই আমরা চাইলে সহজেই এই অমূলক সন্দেহ, বদ আশঙ্কাকে ভাঙতে পারি সমাজের-জাতির সর্বক্ষেত্রে স্বজাতির মা-বোনদের সমানাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আমি তো মনে করি, সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের এই সমানাধিকার নিশ্চিত করা গেলে আমাদের জুম্ম নারীদের স্বাজাত্যচেতনা ও দায়িত্ববোধ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, জুম্ম জাতির প্রতি জুম্মবির একটি বিশেষ ‘sense of belonging’, ‘we-feeling’ তৈরি হবে এবং ক্রমান্বয়ে সেই অনুভূতি তীব্রতর হতেই থাকবে। যেমনটি আমাদের কালিন্দী রাণীমার ক্ষেত্রে ঘটেছিলো।

তেমনিভাবে বাংলাদেশ সরকার যদি পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতো, তাহলে পাহাড়িদের তরফে তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতি বাস্তব কিংবা কল্পিত কোনো অনুভূতির বদলে বরং রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের সেই চিরাচরিত ‘sense of belonging’ ই গড়ে উঠতো। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, রাষ্ট্র সে কাজটি আজ অবধি করতে পারে নি। কবে পারবে, তাও অনিশ্চিত।

তবে এটাও ঠিক যে, আমাদের মা-বোনেরা জাগলে জগতের এমন কোনো শক্তি নেই যে জুম্ম জাতির বিজয়োত্থানকে দাবিয়ে রাখতে পারে! আপাতত জুম পাহাড়ের তিন রাজাবাবু, নারীবাদী নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং প্রথাগত অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মিলে অনতিবিলম্বে সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিতের বিষয়টির ন্যায্য সুরাহা করে বিশ্ববাসীর সামনে একটি মানবিক দৃষ্টান্ত, মানবাধিকার রক্ষার দৃষ্টান্ত, সাম্যবাদ [কমিউনিজম] প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, সেই প্রত্যাশা ও শুভকামনা জারি রাখছি।

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

Ananya Azad March 4, 2014 তাদের গঠনতন্ত্র গুলোতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা বলা নেই। বলা আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরাপত্তা...

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

সংযুক্ত পেইন্টিংঃ শিল্পী তুফান রুচ সাজেক একটি ইউনিয়নের নাম যা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন; যেটি দেশের বৃহত্তম জেলা রাঙামাটি এবং বাঘাইছড়ি উপজেলার...

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

সংযুক্ত পেইন্টিইং এর শিল্পী- চানুমং মারমা লেখক- লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা    এদেশের নারীবাদী দর্শন বা নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতাকে থিওরাইজ বা তত্ত্বায়ন...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *