আর্কাইভ

“চার কামাল পার্বত্য চট্টগ্রামকে করে বেসামাল।”- সেটেলার নেতা মুজিবর রহমান

by | Nov 19, 2020 | বিশেষ প্রতিবেদন, সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম

গত ১৭ নভেম্বর সেটেলার বাঙ্গালীদের প্রধান সংগঠন পার্বত্য নাগরিক পরিষদের বান্দরবান জেলা সভাপতি কাজী মহাম্মদ মুজিবর রহমান বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে আক্রোশমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ এক বক্তব্য দেন। সেনাবাহিনী ও সেটলারদের দ্বারা আয়োজিত এই সভায় হুমকি, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে বান্দরবানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মারমা, ম্রো সহ কিছু আদিবাসীদের জড়ো করা হয়েছিল।

চিম্বুক পাহাড়ের ম্রোদের ভিটে রক্ষার চলমান আন্দোলন নিয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করতে, সেনাবাহিনীর ইমেজ রক্ষা করতে এবং কায়েমী মহলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতেই এই সভা আয়োজিত হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সচেতন নাগরিকবৃন্দ। 

সেটেলার নেতার প্রদত্ত ভাষণ এখানে পাবেন।

বক্তব্যে তিনি ম্রোদের ভূমি দখলের ঘটনা মিথ্যা উল্লেখ করে বলেন-

“ম্রো সম্প্রদায়ের জন্য আজকে যে বিতর্ক হচ্ছে, আজকে বুদ্ধিজীবী যারা বিভিন্ন জায়গায় বিবৃতি দিচ্ছে, আজকে যারা ম্রো সম্প্রদায়কে ভূল তত্ত্ব দিয়ে বিভ্রান্ত করছে এবং তাদেরকে বিপদ্গামী করছে , ভূল পথে পরিচালিত করছে, মানব-বন্ধন করছে, ইলেক্ট্রিক প্রেস মিডিয়াতে তারা ব্রিফিং দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ভূল খবর প্রচার করা হচ্ছে এগুলা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

ম্রোরা “জেএসএস তথা সন্তু লারমার দ্বারা ভুল পথে পরিচালিত” হচ্ছে বলে তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন,

“সে (সন্তু লারমার) বিদেশের মাটিতে গিয়ে ষড়যন্ত্র করে এই স্বাধীন দেশে জুম্ম-ল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখছে। ভিয়েতনামে গিয়ে সে জুম্মল্যান্ড নামের আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম ঘোষণা করছে। এই সন্তু লারমা আবার এ পাহাড়ি অঞ্চলে এসে কিছু পাহাড়ি মানুষকে ভূল পথে পরিচালিত করে তাদেরকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে চায়”

ম্রোদের ভূমি রক্ষার আন্দোলনকে ঘিরে সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াকে তিনি অপপ্রচার উল্লেখ করে বলেন,

” সেনাবাহিনীকে বিতর্ক করতে চায় কারা?? কারা সেনা বাহিনীকে বিতর্ক করতে চায়?? সেনাবাহিনী কোন দলের নয়, সেনাবাহিনী কোন নির্দিষ্ট সরকারের নয়, সেনাবাহিনী এই জাতির আস্থা এবং বিশ্বাসের, সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সম্পদ, পুরো দেশ এবং জাতির বিশ্বাসের প্রতিক হচ্ছে সেনাবাহিনী।

ম্রোদের চিম্বুক পাহাড়ে প্রকল্পিত হোটেল ম্যারিয়ট নির্মান হলে স্থানীয় কর্মসংস্থান হবে বলে তিনি আরও যোগ করেন, “আজকে যদি ফাইভ স্টার হোটেল হয়, সেখানে অন্তত দুই হাজার পাঁচশ এই ম্রো সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ছেলেদের কর্ম সংস্থান হবে। একটা পরিবারেরও সেখানে ঘর বাড়ী নাই, এখানে ফাইভ স্টার হোটেল হলে এখানে একটা পরিবারও উচ্ছেদ হবে না।”

ম্রোদের ভূমি রক্ষার সাথে একাত্ম বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিক, বুদ্ধিজীবি ও মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,

“আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যারা, আমরা তাদেরকে হাড়ে হাড়ে চিনি। তারা জাতির শত্রু, তারা দেশের শত্রু, ইউএন কমিশন থেকে তারা মোটা অংকের টাকা পায়, চিএইচটি কমিশন থেকে তারা মোটা অংকের টাকা পায়, ইউএনডিপি থেকে তারা মোটা অংকের টাকা পায়, আর সন্তু লারমার সশস্ত্র বাহিনী প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রতি বছরে চারশ কোটি টাকা চাঁদা বাজি করে পায়, সেই টাকার ভাগ এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরাও পায়।”

মাঝমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তারা করে বেসামাল, তারা চার কামাল- ডক্টর কামাল, সারা কামাল, সুলতানা কামাল, মেজবাহ কামাল,  এই চার কামাল সবসময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে করে বেসামাল।”

সভায় তিনি বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী সহ আদিবাসীদের পক্ষে সোচ্চার সকলের উদ্দেশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, ,

“টাকার বিনিময়ে তারা একটা গোষ্ঠীর পক্ষে ,সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষে তারা বিবৃতি দিচ্ছে , আমরা অনেক আগেই বলে দিয়েছি সেই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে কখনো ঢুকতে পারবে না। আজকে থেকে তাদেরকে আমরা নিষিদ্ধ করলাম। এই সব কামালরা, ইদুররা, রাজাকার দোসর রা এই পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটিতে কখনো অনুপ্রবেশ বা ঢুকতে পারবেনা।”

প্রসংগত উল্লেখ্য যে সেটেলার সংগঠনের নেতারা ইতোপূর্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বান্দরবানে কমিশনের গাড়িতে হামলা করেছিলো। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের প্রতিনিধি সহ বিদেশী সাংবাদিক ও গবেষকদের গতিবিধিতে বাধা দিয়ে আসছে।

সেটলারদের বিভিন্ন সংগঠন, যেমন পার্বত্য বাঙ্গালী সম অধিকার আন্দোলন সরাসরি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বলে অভিযোগ আছে। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীর রাজপথের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে। চলতি বছরে সেটলারদের বিভিন্ন সংগঠন মিলে পার্বত্য নাগরিক পরিষদ গঠিত হয়। কাজী মহাম্মদ মুজিবর রহমান সেই সংগঠনের অন্যতম প্রধান নেতা; তিনি কেন্দ্রিয় কমিটির সহ-সভাপতি। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা সহ মাদক ব্যবসা, দুর্নীতি, ঘুষ, ভূমি বেদখল, অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে কাজী মুজিবুর রহমানকে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

Ananya Azad March 4, 2014 তাদের গঠনতন্ত্র গুলোতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা বলা নেই। বলা আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরাপত্তা...

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

সংযুক্ত পেইন্টিংঃ শিল্পী তুফান রুচ সাজেক একটি ইউনিয়নের নাম যা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন; যেটি দেশের বৃহত্তম জেলা রাঙামাটি এবং বাঘাইছড়ি উপজেলার...

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

সংযুক্ত পেইন্টিইং এর শিল্পী- চানুমং মারমা লেখক- লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা    এদেশের নারীবাদী দর্শন বা নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতাকে থিওরাইজ বা তত্ত্বায়ন...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *