আর্কাইভ

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বিপম চাকমা উপন্যাস “গ্রহণ লাগা ভোর”

by | Jan 21, 2021 | সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে

প্রয়াত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছিলেন—
‘‘আমার কেবলই মনে হচ্ছে চাকমা শিল্পীর লেখা চাকমা ভাষার উপন্যাস চাই; সেই উপন্যাসের বেশির ভাগ লোক চাকমা, তাদের বাড়ি রাঙামাটি কী খাগড়াছড়ি কী বান্দরবানের কোনো পাহাড়ি জনপদে, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে তাদের বঞ্চনা, অপমান ও প্রতিরোধ এমন মিলেমিশে থাকবে যে একটি থেকে আরেকটি আলাদা করা যাবে না।”
চাকমা নৃগোষ্ঠীর রচিত বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস বিপম চাকমার গ্রহণ লাগা ভোর । প্রকাশনী বেহুলা বাংলা। প্রকাশ কাল ২০১৮। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনই গ্রহণ লাগা ভোর উপন্যাস। তবে তা চাকমা ভাষায় না হয়ে বাংলা ভাষায়।
অবশ্য ইতোপূর্বে চাকমা ভাষায় দু্টো উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।
২০০৪ সালে, প্রকাশিত হয়ে গেছে চাকমা ভাষা ও হরফে দেবপ্রিয় চাকমার লেখা ‘ফেবো’ নামের একটি উপন্যাস। ২০১৩ সালে কে ভি দেবাশীষ চাকমা নামের আরেক জন লেখকেরও চাকমা ভাষায় একটি উপন্যাস ‘মুই মত্যেই’ (‘আমি আমার’)। প্রকাশিত খবর অনুসারে দেবাশীষ চাকমার ‘ফেবো’ ছাপানো হয়েছিল চাকমা হরফে হাতে লেখা টেক্সটের ছবির ভিত্তিতে। অন্যদিকে কে ভি দেবাশীষ চাকমার ‘মুই মত্যেই’ ছাপানো হয়েছে বাংলা হরফে।
কাজেই এদিক থেকে গ্রহণ লাগা ভোর চাকমা জঙ্গোষ্ঠীর লেখক রচিত অধিক পাঠ্য উপন্যাস। বিপম চাকমা তাঁর উপন্যাসের পটভূমি বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মহৎ বিষয়, বৃহৎ পরিসর মুক্তিযুদ্ধকে এবং কাহিনীর বিন্যাস করেছেন এ মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ( বাঙালীসহ) ভুমিকা, ধারণা, চিন্তা, চেতনা ও ভোগান্তিকে কেন্দ্র করে।
এটি একটি ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস। পার্বত্য চট্টগ্রামে মিজো বাহিনী ও তিব্বতি বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেক তথ্য ঐ এলাকার ইতিহাসে অলিখিতই রয়ে গেছে যার ইঙ্গিত এ উপন্যাসে রয়েছে। চাকমা রাজার মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান মানে সবাই রাজার মতাদর্শ অনুসরণ করছে, এমন সরলীকরণ ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা। যে ভুল ব্যাখ্যার শিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর নিরীহ জনগণ। এ ভুল ব্যাখ্যার প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে জগদীশ কটাক্ষের শিকার। অবশ্য যে কটাক্ষ করেছে তার আপন চাচা এলাকার স্বীকৃত কুখ্যাত রাজাকার। ইতিহাসের এ প্রহসন স্বাধীনতা উত্তরকালেও অব্যাহত রয়েছে।
বিপম চাকমার গ্রহণ লাগা ভোর উপন্যাসে চরিত্রদের জীবন যাপনে লোক জ্ঞানের চর্চা একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন—“মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সেইসব বীরযোদ্ধা, যাদের হাতে অস্ত্র ছিল না, যাদের কথা ইতিহাসে লেখা নেই এবং যাদেরকে কেউ কোনোদিন স্মরণও করবে না। কিন্তু তারা বীর ছিল।
লেখকের যে বলয়ে বসবাস সেখানকার মানুষের ত্যাগের স্পর্শে স্পন্দিত, দেহের ও হৃদয়ের রক্তঝরার অভিজ্ঞাতা প্রসূত ব্যথা এ উৎসর্গে।ইতিহাসে অনুল্লেখিত এবং মুক্তিযদ্ধার জন্য স্বীকৃত বৈশিষ্ট্যের বৃত্তের বাইরে কিছু ত্যাগী, কিন্তু রাষ্ট্র কর্তৃক অস্বীকৃত মানুষের কথা এ উৎসর্গে, যাদের পরিচয় এ বইয়ে পাওয়া যায়।
কোরান শরীফ ও ঠাকুর পূজার উপকরণের ( “কারো ঝোলায় ঠাকুরের মূর্তি, শঙ্খ,সিঁদুর, চন্দন, কারো ঝোলায় কোরান শরিফ, ব্যাটারি, টর্চলাইট, হাবিজাবি ইত্যাদি” পৃঃ ৫১) উল্লেখ লেখকের বৃহত্তর পরিসরকে একটা ক্যানভাসে নিয়ে আসার প্রয়াস।
উপন্যাসের প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার এ বর্ণনা পার্বত্য চট্টগ্রামের জগদীশদের তথা প্রান্তিক নৃগোষ্ঠী সমূহের অবস্থা, অবস্থান ও ইতিহাসের বয়ান। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বিভিন্ন প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর প্রতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বৈরী মনোভাব, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার অনুমোদন না দেয়া। স্বাধীন দেশে আবার পরাধীন হয়।
নিজদেশে পরবাসীর মতো ভয়াবহ আচরণ পায়। বিজয়ের প্রাক্কালেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর উপর নেমে আসে সহিংসতা। ভোরের আলোতেই গ্রহণ লাগে। এ গ্রহণের উদাহরণের মধ্যেই এ উপন্যাসের সমাপ্তি।
উল্লেখ্য যে এ পাঠ প্রতিক্রিয়া আমার একটি গবেষণার অংশ।
লেখিকাঃ গীতা দাস
ফেইসবুক প্রোফাইলঃ Gita Das

মূল লেখা এখানে

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

শহর অঞ্চলের সমাজঃ পাহাড়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্তিতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি সংস্কৃতিক আগ্রাসন। পাহাড়ের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে...

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

পানির নিচে সেই ঝগড়াবিল আদাম: আমার নাম করুণাময় চাকমা। বর্তমান নিবাস রূপকারী, মারিশ্যাতে হলেও রাঙামাটির যে পর্যটন মােটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ...

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

অদ্যাবধি পৃথক তঞ্চঙ্গ্যার ইতিহাস রচনা করা হয়নি। তঞ্চঙ্গ্যাদের উৎপত্তি, বিকাশ এবং বর্তমান সম্পর্কে কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কেবলমাত্র চাকমা জাতির...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *