আর্কাইভ

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

by | May 11, 2021 | Uncategorized, সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে

শহর অঞ্চলের সমাজঃ

পাহাড়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্তিতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি সংস্কৃতিক আগ্রাসন। পাহাড়ের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ পাহাড়ের মানুষ সব কিছুতেই বাঙালির উপর নির্ভরশীল। শিক্ষা থেকে অর্থনৈতিক সব কিছুতেই। অন্যদিকে নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যারফলে পাহাড়ের প্রজন্ম দ্বৈত সংস্কৃতি ধারণ করতে বাধ্য। প্রজন্ম হয়ে যাচ্ছে Duality of Modernism, নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারছে না আবার মর্ডানিজমের বৌদ্ধিক চিন্তা-চর্চায় আস্থাহীনতায় ভুগছে। আর কুসংস্কার-পুরুষতান্ত্রিকতাও লালন করছে। সেই জন্য এম. এন. লারমা স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। জুম্ম জাতীয়তাবাদ নয়। আদিকাল থেকেই মানব সমাজে গোত্রে মধ্যে গোত্রে সংঘাত ছিল। জাতীয়তাবাদ টানলে ক্লাশ অফ সিভিলাইজেশন এসে যায়। পৃথিবীব্যাপী যত যুদ্ধ হয়েছে প্রায় সব যুদ্ধই জাতীয়তাবাদের কারণে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখলে মনে হয় শহর বা নগরায়নের ফলে পাহাড়ের সমাজ এখন অনেক স্বাধীন, প্রাগৈতিহাসিক কুসংস্কার এখন আর সেভাবে নেই। স্বাধীনভাবে নারী-পুরুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে অনেকক্ষেত্রেই। বাস্তবতা কী বলে?।
রাষ্ট্রীয় ঔপনিবেশিক গ্লোবালাইজেশন দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়, পাহাড়ের সমাজ বিবর্তনের ধারায় মানবিক সম্পর্কগুলো মানবিক থাকেনি। সভ্যতার বিকাশের বাঁকে সমাজে নির্মমভাবে ঢুকে পড়েছে ধর্মীয় কুসংস্কার। যেটি অনুশাসনের নামে প্রচণ্ডভাবে জেঁকে বসেছে। পুরুষতান্ত্রিকটা ভয়াবহ হচ্ছে।
অনেকাংশেই বিষয়গত ভাবে অর্থনৈতিক মুক্তিই দিচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি যদি প্রতিকুল হয় তাহলে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যে বিষয়ীগত সামাজিক মুক্তি মিলছে না। Gender Inequality প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। নারী পুরুষের সমতায় মনোজাগতিক মানের নৈকট্য খুবই জরুরী। নেহাত জৈবিক মোহ নারী পুরুষের সাময়িক বন্ধুত্বের সৃষ্টি করলেও আবার সেই একঘেয়ে জীবনের আমৃত্যু পুনরাবৃত্তির ছকে আটকে পড়বে সম্পর্ক যদি তাঁদের মনোজাগতিক এবং বুদ্ধিভিত্তিক নৈকট্য সৃষ্টি না হয়। এই নৈকট্য সৃষ্টি করবে সাংস্কৃতিক শিক্ষা বা নিজস্ব কালচারাল অর্গানাইজেশন। কালচারাল অর্গানাইজেশন গড়ে তুলতে না পারলে দ্য বোভেয়ারের কথা তাই সত্যি হয়ে যাবে। “নারী ক্রমে হয়ে উঠে জরায়ু, ডিম্বকোষ কিংবা স্ত্রীলোকে কিংবা সন্তান সৃষ্টির যন্ত্রে।”
পাহাড়ে নারী সমাজ পুরুষের সমকাতারে সমঅধিকার নিয়ে দাঁড়াবার সামর্থ্য। সত্যি। নারী পুরুষের সমতা আনতে গেলে মনোজাগতিক মানের নৈকট্য খুবই জরুরী। অনেকখানি। কিন্তু আমি আলোচনা করছি ঠিক সমতা নিয়ে নয়, মুক্তি নিয়ে। সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি যদি প্রতিকুল হয় তাহলে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যে বিষয়গত আপাত মুক্তি নারীকে দিচ্ছে সেটি বিষয়ীগত মুক্তিতে পৌছুবেনা। দ্য বোভেয়ারের মতে ধনারী ক্রমে হয়ে উঠে জরায়ু, ডিম্বকোষ কিংবা স্ত্রীলোকে কিংবা সন্তান সৃষ্টির যন্ত্রে।
চাপিয়ে দেওয়া গ্লোবালাইজেশন সাথে নিজেদের সংস্কৃতির কোন যোগসূত্র না থাকায় প্রচলিত ব্যবস্থায় শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি নারীও গার্হস্থ্য কাজে আটকে পড়ছে লম্বা সময় ধরে। সন্তান জন্মদান ও লালন পালন করাকে কেন্দ্র করে সে পিছিয়ে পড়ছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমাজঃ

পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমাজ বিকাশের সেই স্তরে এখনো ঠিকে আছে। শিশু বড় হয় সামাজিক ভাবে, গোত্র পরিচয়ে, মাতৃপরিচয়ে। প্রতিটি শিশু এখনো সমাজের শিশু। মানুষ যখন উৎপাদন করতে শিখলো এবং পুনরুৎপাদনের গুরুত্ব অনুধাবন করলো তখনই ক্রমে শ্রম সমতা ছিল নর এবং নারীতে। নর নারী উৎপাদনে পুনরুৎপাদনে একতা ছিল। এই নর – নারীর সমতা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে দেখতে পাবেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো সামাজিকভাবে একে অন্যের দায়িত্ববোধ কাজ করে। একজন মা এখনো তার শিশুকে গ্রামে রেখে গিয়ে নিশ্চিতে কাজে যেতে পারে। সেই শিশুকে দেখভাল করার দায়িত্ববোধ কাজ করে সমাজের প্রতিটা মানুষের। কেউ যদি মারা যায় সমাজের প্রতিটা পরিবার থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা হয়। দাহক্রিয়া সম্পন্ন করার সামর্থ্য থাকলেও ঐ দায়ভার কিন্তু সমাজ ই নেয়। বন্য অবস্থা, বর্বর অবস্থা এবং সভ্যতা এই তিন স্তরের ক্রম বিকাশ কিংবা বিবর্তনের ফাঁকে কিভাবে Gender equality আটকে পড়ে বা আটকে যাচ্ছে কিংবা আটকে ফেলা হচ্ছে তা বুঝতে না পারলে যেকারোই মনে হতে পারে Gender Inequality সামাজিক নিপীড়নে কিংবা প্রাকৃতিকভাবেই ঘটেছে। যেটির উপর ভিত্তি করে অনবদ্য এবং দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলস তাঁর পরিবার, ব্যাক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থে। এবং সুদীর্ঘ গবেষণা করেছেন লুইস হেনরি মর্গান সমাজ বিবর্তনের ধারা নিয়ে।
শহর অঞ্চলের সমাজ ব্যবস্থা ই আবার মিশ্র সংস্কৃতি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমাজকে চাপিয়ে দিচ্ছে। শহর অঞ্চলের আধিপত্যর কারণেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভয়াবহ ভিলেজ পলিটিক্সের জন্ম হয়। এভাবেই Gender Inequality সম্পর্কগুলোও ছকে আসা শুরু হয় ক্রমে। উত্তরাধিকারের প্রশ্ন সামনে আসে ভবিষৎ মালিকানা প্রশ্নে। সমাজ মাতৃতান্ত্রিক অবস্থা থেকে ধীরে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঢুকতে থাকে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ’রাই সংস্কৃতি বহন করে। এই মানুষ’রাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সুপ্রকাশ রায়ের “ভারতের কৃষকের-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম” বইটি পড়লে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কিছুটা জানতে পারবেন। লেনিনের মতে ছিল ‘তরুণদের শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনশীল শ্রমের মিলন ব্যতীত ভবিষ্যৎ সমাজের কল্পনা অসম্ভব। সমাজ ব্যবস্থা ঠিকিয়ে রাখতে হলে সংস্কৃতিকভাবেই নতুন যুগের ছেলে মেয়েদের এগিয়ে আসতে হবে। সততা, শ্রমশীলতা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃভূমি রক্ষার্থে আত্মোৎসর্গের মনোভাব- এই গুণাবলি নিয়ে কেউ জন্মায় না। তা অর্জিত হতে পারে সুশিক্ষার মাধ্যমে।

এনজিও করণ বা ডেভেলপমেন্টঃ

পেটি-বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যবর্তীদের বলা হয় স্ট্যাবিলাইজিং সামাজিক স্তর। এরাই শাসকগোষ্ঠীর খুঁটি বা পিলার। পাহাড়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতির চেতনা ও ধারাকে এই দুই শ্রেণী উল্টে ফেলে দিচ্ছে।
পাহাড়ে একদল শিক্ষিত এলিট শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে যারা এনজিওর প্রতিষ্ঠা করে ডেভেলপমেন্ট এক্সেরসাইয করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ওয়ার্কশপ-ভলান্টিয়ারিং করে বেড়ায়। যা পাহাড়ের সংস্কৃতিকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। যে কাজটা রাজনৈতিক লিডার ও
সুশীল সমাজ করে যাচ্ছে। এনজিও করণ কিংবা ডেভেলপমেন্ট পাহাড়ের নিজস্ব কালচারাল অর্গানাইজেশনগুলোকেও ভেঙ্গে দিচ্ছে। প্রজন্মের পিছনে মিশ্র সংস্কৃতির বাঁশ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। মিশ্র সংস্কৃতি চাষ করে মানবাধিকার-নারীর ক্ষমতায়ন-উন্নয়নের নামে ব্যবসা করছেই। খোঁজ নিলে দেখা যাবে ঐ এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। এবং ঐ এনজিও প্রতিষ্ঠানের কর্মী দ্বারা ঘটছে। নারী অধিকারের নামে লিঙ্গীয় অসমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরাই কিন্তু সমতলের সংস্কৃতিকে পাহাড়ে প্রমোট করে। ফলস্বরূপ পাহাড়িদের মধ্যেও ধর্ষক বেড়ে যাচ্ছে। নিজের সংস্কৃতি ত্যাগ করে বাঙালি বিয়ে করার প্রসঙ্গগুলো বেড়ে যায়। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারী কোন বিশেষ অভিজ্ঞতা থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে “হিল উইমেন্স ফেডারেশন” গঠন করে সংগ্রাম চালিয়েছিল এই প্রসঙ্গগুলো গবেষণা করা জরুরী।
এই ডেভেলপমেন্ট সেক্টর প্রতিষ্ঠা করে মূলত সামন্তবাদীরা’ই। তাদের আধিপত্য জারি রাখার জন্য। সুশীল কিংবা সামন্তবাদীরা শাসকগোষ্ঠীর সাথে তাল মিলিয়ে সব সময়ই শ্রেণীর মধ্যে খণ্ডিতকরণ বা বিভাজন সৃষ্টি করে দেয়। এ নীতি উপনিবেশগুলোতে বেশি প্রয়োগ করা হয়। তারপর উপনিবেশগুলোতে বিরাট এক সামাজিক স্তর সৃষ্টি হয়, যারা বেতনভোগী ও নানাবিধ সুবিধাভোগী। এই ভোগের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে, আরও ভোগের আশায়। এই এনজিও বাদীরা নিজেদের ভোগবাদকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন ঢুকিয়ে দিচ্ছে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য, শাসন ক্ষমতা বলবত রাখার জন্য, মানুষের মগজ ধোলাই করে দিচ্ছে। জন্য যারফলে নিপীড়িত প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বাধ্য হয়ে শহরমুখী হয়।

বিষয়ীগত পরিবর্তনের জন্য সন্তানকে সমাজের শিশু হিসেবে সামাজিক ভাবে গড়ে তোলার সংস্কৃতি দাঁড় করাতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্যর বাইরে শিশুদের গড়ে তুলতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, শিক্ষা এই বিষয়গুলোর সামাজিক নিশ্চয়তা বিধান করা গেলে সন্তানের প্রতি মায়ের আলাদা উদ্বেগের বিষয় থাকবেনা। ফলে আলাদা করে মায়ের দ্বায়িত্ব কমে যাবে। সেও সমভাবে অংশ নিতে পারবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। ভাবনাটা স্রোতের বিপরীতে হলেও ভাবতে হবে। ভাবতে হবে মুক্ত মনে। বিষয়গত এবং বিষয়ীগতভাবে Gender equality তখনই সম্ভব যখন সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে। ব্যক্তিমালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। সমাজকে গড়ে তোলা কিংবা মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব এই প্রজন্মকেই নিতে হবে।

লেখকঃ ডেনিম চাকমা, এক্টিভিস্ট, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

পপুলার পোস্ট

Related Post

আন্দোলন মানে একটি জীবন যাপন করা

আন্দোলন মানে একটি জীবন যাপন করা

(১) জীবন থেকে নেয়া এক যুগেরও অধিক কাল আগের কথা। তুমুল ছাত্র রাজনীতি করতাম তখন। বছরে এক-দু বার রাজনৈতিক শিক্ষাশিবির হতো। সেখানে মার্ক্সবাদ, ভাবাদর্শ,...

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

পানির নিচে সেই ঝগড়াবিল আদাম: আমার নাম করুণাময় চাকমা। বর্তমান নিবাস রূপকারী, মারিশ্যাতে হলেও রাঙামাটির যে পর্যটন মােটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ...

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

অদ্যাবধি পৃথক তঞ্চঙ্গ্যার ইতিহাস রচনা করা হয়নি। তঞ্চঙ্গ্যাদের উৎপত্তি, বিকাশ এবং বর্তমান সম্পর্কে কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কেবলমাত্র চাকমা জাতির...

0 Comments