আর্কাইভ

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। প্রথম পর্ব

by | Dec 3, 2020 | বাংলাদেশ, বিশেষ প্রতিবেদন, সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম

Ananya Azad
February 28, 2014

বাঙলাদেশ সেনাবাহিনী নিঃসন্দেহে একটি পেশাদার সেনাবাহিনী। তার সাথে আছে যেমন গৌরবোজ্জল ইতিহাস তেমনি অনেক কালো অধ্যায় । যাদের রক্ষার জন্য এই সেনাবাহিনী তারা কতটুকুই বা জানে এই বাহিনী সম্পর্কে। তাদের সুখ দুঃখ বা ইচ্ছার কথা। জনগনের সাথে সেনাবাহিনীর দূরত্বের কারণে বাঙলাদেশ সেনাবাহিনী । বাঙলাদেশের গনতন্ত্র জন্ম থেকেই বিঘ্নিত হয়েছে । তাদের হাত ধরে যেমন জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের তেমনি তাদের হাতে মৃত্যু হয়েছে গনতন্ত্রের , শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের ।

নিজেদের পেশাদারিত্বের দোয়াই দিয়ে জনগন থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে চিরকাল এই বাহিনী ।অফিসারদের মুখে ব্লাডি সিভিলিয়ান , ফাকিং পলিটিসিয়ান বলে দেয় তাদের চোখে বাকিরা কেমন? তেমনি সাধারন জনগনের চোখে এই বাহিনীর এক একটা যেমন হারামজাদা; বসে বসে শুধু অন্ন ধ্বংসছাড়া আর কী জানে! সুযোগ পেলে পুকুর চুরি নয় সাগর চুরি করে ।একই অনুভূতি যখন সকলেই বুকে নিয়ে বাংলাদেশ চিরজীবি হোক বলে তবে কেনো এমন হবে বাঙলাদেশ হবে! বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন রেফারেন্সে বলা হয়ে থাকে, ডিজিএফআই নাকি আইএসআইয়ের আদলে তৈরী হয়েছে । কোন কোন ক্ষেত্রে নাকি তারা এতটাই পারদর্শী এটা নাকি তাদের ফাদার এজেন্সিকেও ছাড়িয়ে গেছে । ডিজিএফআই নাকি ব্যাবহার করে পুরোবাহিনীকে তাদের স্বার্থে।

দেশের প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারীকে নিজেদের অনুকূলে রাখতে প্রয়োজনীয় অবস্থা সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে যত প্রকারের কাজ করা লাগে তার জন্য ডিজিএফআই এই তিন দশকেই বেশ সুনাম কামিয়েছে । প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রয়োগ রয়েছে একমাত্র তাদের কলমে; তারা যা লিখে তাই সত্য; মাঝে মাঝে যা সত্য তারা লেখে না তাদের স্বার্থে । সেনাবাহিনীর সব অফিসারই খারাপ না তারাও মানুষ আর ভালো খারাপ সব জায়গায় থাকবে সেটাই স্বাভাবিক ।

ফায়ারিং রেঞ্জে লক্ষ্যকে কেউ দেশের শত্রুভাবে আর কেউ নিজের শত্রু ভাববে আর কেউ আদেশ হল লক্ষ্যভেদ করা এটাই উদ্দেশ্য ।তাদের স্বার্থে যেমন ১ জন বা ২জন কোন ব্যাপার না তেমন ৫৭ জন ব্যাপারই বা কীসে! ১ জন যদি দেশের মাথাও হয় তাও যদি মূল্য না থাকে ৫৭ জন নিজের গুটি অসুবিধে নেই আবার নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ১০ লক্ষ মোটেও ব্যাপার না ।

ভারত বিভক্তি থেকে শুরু করে পাকিস্তান বিভক্তি পর্যন্ত অনেক ঘাঘু মাল যেমন এই বাহিনীতে রয়েছে তেমনি সহজ সরল মালও আছে এটা প্রয়োজন সমতার জন্য । তিরিশ লক্ষ শহীদ ও আড়াই লক্ষ সম্ভ্রম এর বিনিময়ে এই দেশকে আজ এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম যুদ্ধের ময়দান বলা হয় , ভারত ও পাকিস্তানের , সাথে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করা জন্য তো আছে অনেক রাঘব বোয়াল ।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে জর্ম্ম বেশ্যা জাতি পাকিস্তানের তাদের সবচেয়ে বড় অহংকার এই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। যারা জর্ম্ম দিয়েছে কুখ্যাত আল বদর, আল সামস ও আল কায়েদা। সমস্যা হল অপ্রিয় সত্য ও দুঃখের বিষয় এই বাহিনী থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মূল ভিত্তি এসেছে ।

যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন করতে তাদের ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই কিন্তু তাদের শিরায় নিভৃতে বহমান সাম্প্রদায়িক বিষ থেকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে পারলেও তারা নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করতে পারেনি । তার উদাহরন পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪২ বছরের বাঙালী ও সামরিক আগ্রাসন । মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অসাম্প্রদায়িক বাঙলাদেশের ভিত্তি কি এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না ??? শেখ মুজিব নিজেও বলেছিলেন ” অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে বাঙলাদেশের পরাজয় ঘটবে “।

বাঙলাদেশ বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্ভুদ্ধ হলেও বাঙলাদেশ একটি বহুজাতিক দেশ তাই বাঙালি না বলে সবাইকে বাংলাদেশী বলাটা জরুরী নয় বরঞ্চ অত্যাবশ্যক । বাঙালি যদি নিজের পরিচয় ও ভাষা ছেড়ে দিতে রাজি না থাকে তাহলে তারা কেমন করে আশা করে অন্য জাতিরা অনেক ছোট হলেও তারা নিজেদের পরিচয় ছেড়ে দেবে!

এই আধুনিক বিশ্বে এককজাতি হিসেবে কোন দেশ এগিয়ে যেতে পারে নি বহুজাতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায়ই এখন উন্নয়নের মূল উপাদানের একটি । বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই নিশ্চিত হবে, যে দিন অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ স্থিতি লাভ করবে । কিন্তু বাঙলাদেশের স্বাধীনতার পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পটভূমিতে অসাম্প্রদায়িকতার নজির নেই বললেই চলে ।

বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতার এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম ।পার্বত্য চটগ্রামে রাষ্ট্রের ক্ষমতার মদতে ও পৃষ্ঠপোষকতায় সরকার অবৈধ আগ্রাসী সেটেলারদের তুলে দিয়েছে অন্য জাতি সমূহকে নিশ্চিন্ন করার জন্য।

এক রাষ্ট্র নায়ক বলেছেন “তোরা সব বাঙালি হয়ে যা” পরবর্তী দুই রাষ্ট্র প্রধান তাদের বাঙালি করার সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন ।ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, রাষ্ট্রনায়কদের বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নিয়ে দুইমুখী আচরনই দায়ী আজকের এই অসাম্প্রদায়িক বাঙলাদেশের স্ব্প্নকে সাম্প্রদায়িক দুঃস্বপ্নে রূপান্তরের জন্য । পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ সেটেলার বাঙালি পাকিস্তানিপন্থী জামাতের আদর্শে অনুপ্রানীত ।যাদের অন্যের ধর্মের প্রতি কোন শ্রদ্ধা নেই । নেই নিজের ধর্মের প্রতিও ।

কেউ ইসলাম গ্রহন করলে সুবাহান-আল্লাহ আর অন্য কিছু গ্রহন করলে আস্তাকফিরুল্লাহ , এই হল তাদের সহনশীলতা । ধর্মীয় আগ্রাসন এই জাতিগত আগ্রাসনের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছে আর তাদের সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর পাকিপন্থী অফিসারদের ভূমিকা অতুলনীয় । যত প্রকারের সরকারী ডিপার্টমেন্ট বাঙলাদেশ সরকারের আছে সব’কটার শাস্তিমূলক বদলি হয় ওই পাহাড়ে । সব খারাপ যদি পাহাড়ে গিয়ে ভীড়ে তাহলে কী আর বলার অপেক্ষা রাখে ভালো কিছু আশা করার! যা ভালো ছিলো তাও খারাপ হতে বেশি দেরী নেই ।

পাহাড়িদের মাঝে ধর্ষণ নামের কোন শব্দ আমি খুজে পাই নি । খোঁজ নিয়েছি অনেকের কাছে তারাও বলেছে তাদের অভিধানে নির্যাতন ও ধর্ষণ নামের কোন কিছুই নেই । হুম, সেজন্যই আমাদের রাজনৈতিক নায়ক ও সেনাবাহিনী বিশেষ দায়িত্ব নিয়েছে স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় আগ্রাসন চালানো , সাথে দুটো বিশেষ শব্দে তাদের সভ্য করানো নির্যাতন ও ধর্ষণ ।

প্রতি বছর চলে তাদের এই প্রক্রিয়া । অনেক সামরিক বাহিনীর অফিসার খোলা ময়দানে বলেছে , “জুম্ম মেয়েদের বাঙালি বীর্যে ভরিয়ে যাওয়া হোক” । আর অনেকেই বলেছে “এক সময় জুম্মদের যাদুঘরে গিয়ে দেখতে হবে” ।এই কথাগুলো যথেষ্ট প্রমাণ করার জন্য পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভূত এই মাটিতে মরেও যাদের মাথায় চড়ে বসে আছে তারা কারা!

পাহাড়ের অগ্নি কন্যা কল্পনা চাকমাকে অপহরনের মাধ্যমে নারীদের নির্দিষ্ট ও সহজ লক্ষ্য বস্তু এর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে বাঙলাদেশ সেনাবাহিনী ।এই অপারেশনের নেতৃত্বে ছিল লেঃ ফেরদৌস ,এখন নাকি মেজর , ধরা পড়ে যাওয়ায় আর প্রমোশন হয় নি, খুব সম্ভবত ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টে এই পশুটাকে রাখা হয়েছে ।

আদিবাসী নারীদের উপর এই সহিংসতার পথপ্রদর্শক হল এই সেনাবাহিনী । তারা গুচ্ছ্গ্রামে পালে হাজারো জাতিগত আগ্রাসী প্রানী তাদের বেঁধে রাখে আর রাতের আঁধারে ছেড়ে দেয় ।এই হিংস্র আভিবাসীদের পাহাড়ী বিদ্বেষী মগজ ধোলাই দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ওই পাহাড়ে । বাঙালী হলেও এরা বাঙালী সরকারের হাভাতে সাম্প্রদায়িক বাহিনী ।

দুঃখের বিষয় সরকার এখনো বাংলাদেশী হতে পারেনি তাই তার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একই অবস্থা । পাহাড়ের সকল সংঘাতের মূলে এই বাঙালি ও সেনা আগ্রাসন । সকল অবস্থা কৃত্রিম ভাবে সৃষ্টি পেছনে বিশেষ অবদান আমাদের বাঙলাদেশ সেনাবাহিনীর ও ডিজিএফআইয়ের । এই জন্য বিশ্বের নামিদামী হানাদার ইনিষ্টিটিউট গুলোতে আমাদের সেনাবাহিনীকে সফলতম পেশাদার সেনাবাহিনী বলা যায় ।

কল্পনার শেষ কথা ছিল “দাদা মরে বাজা” অর্থাৎ “দাদা আমাকে বাঁচাও” । ক্রমাগত বলি মিলা , সুজাতা, তুমা চিং ও সবিতারা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার । আজ যদি তাদের ভাই বোনেরা তাদের বাচাঁতে এগিয়ে আসে তবে সেটাকে কি বলা হবে ?? পাহাড়িদের জন্য আত্নরক্ষা ও বাঙালিদের জন্য উপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক হামলা । দুইটা কারণ হল এক আমরা তাদের স্বীকৃতি দেই না দুই আমরা আমাদের পরিচয় তাদের উপর চাপিয়ে দেই ।আর সাথে শোষন নির্যাতন ও চলমান প্রক্রিয়া ।

দুই বছর সেনা শাষনে আমাদের রাজনীতিবিদেরা দেশ গেলরে বলে চেচামেচিতে বিশ্ব তোলপাড়, সাথে আমাদের সাধারন গণতন্ত্রকামী মানুষও। আর যেখানে ৪২ বছর ধরে সেনা শাষন চলছে সেখানে বাঙালির কোন মন্তব্য নেই । হয়তো এর ফলাফল হবে, নতুন ইতিহাস রচনায়- বাঙালি একটি হানাদার জাতি ।

(চলবে)
ঢাকা
২৭শে ফেব্রুয়ারী ২০১৪

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

Ananya Azad March 4, 2014 তাদের গঠনতন্ত্র গুলোতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা বলা নেই। বলা আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরাপত্তা...

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

সংযুক্ত পেইন্টিংঃ শিল্পী তুফান রুচ সাজেক একটি ইউনিয়নের নাম যা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন; যেটি দেশের বৃহত্তম জেলা রাঙামাটি এবং বাঘাইছড়ি উপজেলার...

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

সংযুক্ত পেইন্টিইং এর শিল্পী- চানুমং মারমা লেখক- লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা    এদেশের নারীবাদী দর্শন বা নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতাকে থিওরাইজ বা তত্ত্বায়ন...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *