আর্কাইভ

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

by | Dec 20, 2020 | বাংলাদেশ, বিশেষ প্রতিবেদন, রাজনীতি- অর্থনীতি

Ananya Azad
March 4, 2014

তাদের গঠনতন্ত্র গুলোতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা বলা নেই। বলা আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা ।

তাদেরই বা দোষ দিয়ে কী হবে! যেখানে গোড়ায় গলদ-সেখানে গাছের আগা ডালপালার কী দোষ আর ফল কী পাওয়া যাবে-সেটা আগে ভাবা উচিত ছিল। এমনকি সংবিধান রচনার আগে কতজনের মতামত নেওয়া হয়েছিল বা সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছিল কি ?? যারা মতামত দিতে চেয়েছে তাদের মতামতকে নেওয়া হয় নি।

মালিকানার সমস্যা শুরু এখানেই বলতে হবে। পরিকল্পনা ছিল বাঙালির জন্য বাঙলাদেশ ও শুধু তাদের জন্যই হবে । আর বাঙালি তো তখন দুই প্রকারের মুসলমান আর হিন্দু। তবে এই বাঙলাদেশ মুসলমানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। ভেতরে ভেতরে বাঙলাদেশ ভেঙে পাকিস্তান ফেডারেশন করারও কথা চলছিল, কিন্তু হল না ।

কিন্তু বিশ্ব তখন ঝুঁকছে গণতন্ত্রায়নের দিকে আবার সমাজতন্ত্রের দিকের সমর্থন দরকার। সব কিছু মাথায় রেখে বলল – এ রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও অসাম্প্রদায়িক। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মুক্তির জন্য যুদ্ধ, শুধু বাঙালির জন্য নয়, সকলের জন্য। এদেশ হবে সবার যারা গনতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ।

দেশের বিশেষ এক দলিলে বলা আছে, বাঙালি সরকার কোন উপনিবেশকারীকে সমর্থন দেবে না, কিন্তু তারাই উপনিবেশকারীদের মত আচরণ করছে । সেটা আর কত দিনই বা লুকায়িত রাখা যাবে! যারা মূল স্রোতের সাথে যুক্ত হতে চেয়েছিল নিজেদের স্ব্কীয়তা বজায় রেখে সেটা অসাম্প্রদায়িক বাঙালিদের সহ্য হয়নি ।

কারণ তাদের চেয়ে বেশি অসাম্প্রদায়িক মনোভাব তাদের জন্য, তাদের পরিকল্পনার জন্য হুমকি স্বরূপ। চাপিয়ে দেওয়া হল, খেতাব দিলো বিছিন্নতাবাদী । নিয়ে যাওয়া হল হাজারে হাজারে হাভাতে সাম্প্রদায়িক বাঙালি চেহারার কিছু কৌশলগত বেসামরিক যুদ্ধাস্ত্র। যাদেরকে পাহাড়ের স্থানীয়রা সেটেলার বলে চেনে ।

সমতলে হাভাতে সৃষ্টি করা হল কৃত্রিমভাবে ,সৃষ্টি করা হল খাদ্য সংকট, লোভ দেখানো হল পাহাড়ে গেলে বসে বসে খাওয়ানো হবে বিনিময়ে শুধু দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় থাকবে যা পাবে যা দেখবে সব তোমাদের । ধরে ধরে ট্রাকে লড়িতে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হল উপনিবেশিক কায়দায় এক বিশাল সাম্প্রদায়িক বাহিনী ।

তাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া মূল উদ্দেশ্য অনেক কিছু তবে প্রধানত তিনটাকে ধরা হয় : ১)পাহাড়িদের সংখ্যালঘুতে রূপান্তর
২) যা সেনাবাহিনী সরাসরি করতে পারছে না সেগুলো করা
৩)পাহাড়ের ভোটের হিসেব বাঙালি শোষক গোষ্ঠীদের দিকে নিয়ে আসা ।
সাথে ধর্মীয় আগ্রাসন তো আছেই ।

তাছাড়া, কারা এত জঙ্গি ট্রেনিং দেয়, কোথায় দেয়, কীসের জন্য দেয়-সেগুলো তো বলতে মানা। পাহাড়ে শান্তি না থাকলে ওই শান্তি স্থাপনের জন্য যাদের দরকার ঘটনার পেছনে তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। এটাকে কমাতে চাইলে শোষকগোষ্ঠীর গদিও বদলাতে আইএসআই আদলের ডিজিএফআই’য়ের মোটেও বেগ পেতে হবে না ।

২০ বছরে অগনিত শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্কুলের বদলে প্রাথমিক জেলখানায় পুরে রাখা হতো যাতে তারা আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিজেদের দাবি বাস্তবায়ন করতে না পারে । কতজনের শরীরের হাড় ভেঙেছে তা পাহাড়ের দুই দশকের প্রাথমিক-মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রসংখ্যা দেখলে হয়তো জানা যাবে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড তাই এই মেরুদন্ড ভেঙে দিলেই হয়তো আরো বেশি দিন কাঁধে চড়ে থাকা যাবে-এটাই ছিলো আরেকটি চক্রান্ত ।

বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় জেলখানা যেন পার্বত্য চটগ্রাম । আসামী হল তারা , যারা নিজেদের ন্যায্য অধিকারের হক ও নিরাপত্তা চায়। বাঙলাদেশ বিশ্বে কোঁটা সুবিধা নিয়ে আধুনিক বিশ্বে নিজেদের পণ্য রপ্তানি করে অর্থনীতিকে দাড় করাতে চায়, সবার জানা। কিন্তু নিজ দেশের ভিতর যাদের মৌলিক অধিকার কেঁড়ে নেওয়া হচ্ছে ও কৃত্রিমভাবে এবং পিছিয়ে রাখা হচ্ছে তাদের কোঁটা সুবিধায় অনেকেরই ঈর্ষার কারণ।

গণতান্ত্রিক বাঙলাদেশের গণজমায়েত একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। হাজার হাজার বাঙালি আসে জমায়েতে । কিন্তু পাহাড়ে বাঙালি জমায়েত হয় পাহাড়িদের কচু কাটা করার জন্য। অভয় দেওয়া হয় অসুবিধে নেই তোমরা যাও; সাদা পোশাকে আমার হাবিলদার ও সুবেদার দুইজনই থাকবে তোমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য।

সাদা পোশাকে সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটানোর জন্য আবার তাদের পেশাদারিত্বের জুরি নেই। কিন্তু কপালের দোষ শিকারী বেড়াল গোঁফে চেনা যায়। হাবিলদার সাহেব ধরা পড়ে যায়। বাঘাইছড়ির এক সাম্প্রদায়িক হামলায় অংশগ্রহণকারী বাঙালি ধরা পড়ে যায় পাহাড়ীদের হাতে। তাকে কিছুটা উত্তম মধ্যম দিয়েছিল হয়তো। পুরো হামলায় শুধু একজন বাঙালি আহত আর পাহাড়িদের অনেক ঘরবাড়ীতে লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ ও অনেক পাহাড়ি আহত।

যাই হোক, মাঝে মাঝে সেটেলার বাড়িতে দু’এক রোগী এমনিতেই মারা যায়। এইসব মরার খবরটা যেন সবার আগে নিকটবর্তী সেনা ক্যাম্পে যায় সেটার নির্দেশনা আগেই দেওয়া থাকে । মিটিং বসে । শুধু শুধু একটা বাঙালি মারা গেল কিন্তু এই মৃত লাশটি’কে কীভাবে কাজে লাগানো যায়!

মেজর সাহেবের নির্দেশ, যা লাশটাকে পাহাড়িদের ক্ষেতে জমিতে বা গ্রামে রাতের আঁধারে রেখে আসো। আবার কোন সময় টহলগাড়ি পার্সেল পৌছে দেয় কখনো বা তারাই ধরাধরি করে । তার পরদিন সকালে ব্যাপক সমারোহে পাহাড়ি কচুকাটা উৎসব আর মুখে মুখে স্লোগান নারায়ে তাকবির বাকিটা আল্লাহ আকবর ।

ব্যাপক পাহাড়ি কচুক্ষেত সাফ হলে মেজরের কিন্তু প্রমোশনের গতি বাড়ে সাথে সাহসিকতা আর মানবাধিকার রক্ষার (বাঙালি স্বার্থ) জন্য বিশেষ মেডেল মিলবে। এখনো সারা দেশে হাভাতে ধরারা ছেলে ধরাদের মত করে লোভ দেখিয়ে সাম্প্রদায়িক বাহিনী রোজ নিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু যারা একবার পাহাড়ে যাবে তারা আর ফিরে আসতে পারবে না। আসতে চাইলেই হাবিলদারেরা কিন্তু তাদের গুম করে কচুকাটা উৎসব পালনের আয়োজন করে।

হাবিলদারেরা তাদের অফিসারদের সরকার বলে। সেটা বেসামরিক বাংলাদেশিদের কতজন জানে সেটা নিয়ে আমি সন্দিহান । এখান থেকে বুঝা যায় পাহাড়ের সরকার কারা!

ঢাকা ০৩-০৩-২০১৪

পপুলার পোস্ট

Related Post

সাজেকে বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে এবং পাহাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানববন্ধন

সাজেকে বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে এবং পাহাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানববন্ধন

সাজেকে বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে এবং সেনাক্যাম্প স্থাপন, পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ ও তথাকথিত উন্নয়নের নামে পাহাড়ি  উচ্ছেদের প্রতিবাদে...

চিম্বুকের ম্রোদের  ভূমি বেদখল করে পাঁচতারা হোটেল নির্মান বাতিলের দাবীতে বান্দরবানে লংমার্চ অনুষ্ঠিত

চিম্বুকের ম্রোদের ভূমি বেদখল করে পাঁচতারা হোটেল নির্মান বাতিলের দাবীতে বান্দরবানে লংমার্চ অনুষ্ঠিত

চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের নামে ম্রোদের ভূমি বেদখল অব্যাহত রাখার প্রতিবাদে আজ ৭ ফেব্রুয়ারি কয়েক হাজার ম্রো...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *