আর্কাইভ

 বাংলাদেশের কলংক ( দ্বিতীয় অংশ)    

by | Nov 5, 2020 | অনুবাদ, বিশেষ প্রতিবেদন, মানবাধিকার

[ নিম্নের লেখাটি বিবিসি পোডকাস্ট নিবেদিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বানানো ফিল্ম মেকার এবং সাংবাদিক লিপিকা পেলহামেরঅডিও ডকুমেন্টারি “Bangladesh’s Hidden Shame এর অনুবাদ। ডকুমেন্ট টির প্রথম অংশ পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রথম পর্বটি পড়তে এখানে  ক্লিক করুন।   বিবিসির মূল অডিও প্রতিবেদনটি শুনতে হলে এখানে ক্লিক করুন ]

আমরা আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম। কিন্তু প্রথমে আমাদেরকে আর্মি বেসে সাক্ষর দিয়ে যেতে হবে। 

 

 এইসব ফর্মালিটির দেখা শোনা করার দায়িত্ব আমার গাইডের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি গাড়িতে বসে থাকলাম। 

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হচ্ছে রাঙ্গামাটি যার মানে আমাদেরকে কাপ্তাই লেক পার হয়ে যেতে হবে, যে লেকটির জন্ম ১৯৯৬ সালে হাইড্রো-ইলেক্ট্রিক বাঁধ তৈরি করার  মাধ্যমে এবং তখন থেকেই মূল সমস্যার শুরু হয়।    

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় এক হাজার বর্গ কিলোমিটার পরিমাণের জমি পানির নিচে তলিয়ে যায় যার ফলস্বরূপ প্রায় এক লক্ষ আদিবাসী মানুষ বাস্তুচুত্য হয়।  

 

(লিপিকা পেলহামের ভাষ্য)

“১৯৮০ সালের দিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী মানুষেরা সংখ্যার দিকে থেকে বাঙ্গালীদের থেকে বেশি ছিলো।  কিন্তু এখন এখানে যে ফেরিগুলো আসছে সেখানে তাকিয়ে দেখলে আপনারা দেখতে পাবেন যে ফেরিতে যে চেহারাগুলো দেখা যাচ্ছে তার সিংহভাগ বাঙ্গালি চেহারা, আদিবাসীদের নয়। ২০ বছর আগেও যেটা ছিলো চিন্তার বাইরে। “ 

বিপুল পরিমানের সেটলার জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখানকার আদিবাসী এবং তাদের ভিন্ন ধরণের জীবন যাত্রার উপর ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িকভাবে অসহিষ্ণুতার প্রভাব পড়ছে।    

আমাদের ড্রাইভার এখন বাঙ্গালী মুসলিম, সে সেইসব সেটেলারদের একজন যাদের কে সরকার এখানে পূর্ণবাসন হতে উৎসাহ দিয়েছিলো।   এক পর্যায়ে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে মদ্য পানের বিষয় চলে আসলো। পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে পুরো বাংলাদেশের একমাত্র অঞ্চল যেখানে মদ মুক্ত ভাবে পাওয়া যায়। 

সে আমাদের বলে যে মদ্য পানে খারাপ কিছু নাই, এটা শুধু মাত্র চালের রস। আমি তাকে তখন জিজ্ঞেস করলাম তাহলে এটা তাদের ধর্মে নিষিদ্ধ কেনো?সে আমার প্রশ্নের জবাব দেয় যে, কারন এই মদ পাহাড়িরা বানায় তাই।  সে মনে করে যে এখানে বাঙ্গালী টুরিস্টদের বিপুল আনাগোনার পিছনে মদ একটা অন্যতম কারন । 

সে দুপুরের খাবারের পর মদ্যপান করে, এবং বলে যে কোন সমস্যা হবেনা। যে সে চোখ বন্ধ করেও গাড়ি চালাতে পারবে। আমার চিন্তা করার কিছু নেই। 

প্রথম বর্ষার বৃষ্টির সাথে সাথে আমরা রাঙ্গামাটিতে পৌছালাম। এখানে চাকমাদের বসবাস। তারা বাংলাদেশে বসবাস করা সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনগোষ্ঠী। কিন্তু বান্দরবানের মতো রাঙ্গামাটিও সেটেলার অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।  

সেটেলারেরা বহু দশক ধরে চাকমা এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের যে অত্যাচার চালিয়ে আসছে সেগুলো বহু ডকুমেন্টেড কেস থেকে জানা যায়। 

কাছের একটি গ্রামে আমি একটি মেয়ের সাথে দেখা করলাম যার বাবা মাকে সেটেলারেরা নির্মম ভাবে আক্রমন করেছিলো। 

(ভুক্তভোগী আদিবাসী মেয়েটির ভাষ্য)

“তখন অনেক রাত, প্রায় ১০-১১ টা বাজে। বাসার সবাই ঘুমাচ্ছে। বাঙ্গালিরা বোটে করে আসে এবং আমাদের বাড়ির দরজায় ধাক্কা দেয়। আমরা দরজা খুললে তারা জোর করে ভিতরে ঢুকেই আমার বাবার গলা কেটে দেয়। আমি তাদের কারোর চেহারা দেখিনি ভালোমতো। তারা আমার মাকেও কুপায়। 

আমরা মশারির ভিতরে ঘুমাচ্ছিলাম। তারা আমাকে দেখেনি কিন্তু আমার ছোট ভাইকে দেখে । তারা আমার ভাইয়ের পায়ে কোপ দেয়, একটুর জন্যে আমার ভাইয়ের পা কেটে আলাদা হয়নি।  

আমার চাচা আমাদের চিৎকার শুনে মনে করে আমার বাবা মা ঝগড়া করছে।  তার বউ খবর নিতে আসলে রক্তের গন্ধ পায়। সে তখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করে। আমার বাবা সেখানেই মারা যান আর আমার মা হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারা যান। “   

<বিরতি>

আমরা সামনের চার দিন মোটর বাইকে করে রাঙ্গামাটি ঘুরলাম। আমি চেহারা লুকানোর জন্যে একটি টুপি এনেছি। শহরের মাঝখানে এসে আমি মাইকে জোরে বাজানো আজানের শব্দে অবাক হলাম। এটা বুদ্ধিস্টদের জেলা হওয়া সত্ত্বেও এখানে অহরহ মাদ্রাসা ও মসজিদ এবং সরকারী স্কুলগুলোতেও চাকমা মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ দিতে হয় ইউনিফর্ম হিসেবে। ধর্ম নিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অন্যতম অংশ কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সুকৌশলে ইসলামিকরণ করা রোধ করার জন্য সরকার কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। 

একটি ছোট্ট মেয়ে  আমাকে বলে যে তাকে বাসা থেকে একটি মাদ্রাসায় মুসলিম সেমিনারে নিয়ে যাওয়া হয়,

(ছোট্ট আদিবাসী মেয়েটির ভাষ্য) 

“ আমাদের বাসায় একটি মানুষ আসে, সে জানায় সে আমাদেরকে শিক্ষিত বানাতে তার সাথে নিয়ে যেতে চায়। সে আমাদের গ্রাম চংগলছরি থেকে  আমি সহ আরো ২২ জন শিশুকে তার সাথে করে নিয়ে যায়। সে ছিলো লম্বা এবং শুকনো। তার পরনে ছিলো লম্বা পাঞ্চাবী। সে  আমাদের কে ইসলাম বাড়িতে(মসজিদ) নিয়ে যায়। 

আমাদেরকে সেখানে সকালে খাওয়ার জন্য ভাত দেওয়া হয়। ইমাম বলে আমাদের দুপুরে মাদ্রাসায় নেওয়া হবে। সে বলে তোমাদেরকে কালিমা শেখা  লাগবে, যে শব্দ তোমাদেরকে মুসলিম বানাবে। তারা বলে যে আমরা যদি সেটা না শিখি তাহলে আমরা মুসলিম হবো না। তারা বলে যে আমাদেরকে ভোর ৪ তাই উঠে প্রার্থনা করতে হবে। এরপরে তারা আমাদেরকে কিছু খাবার দেয় এবং বলে যে তোমরা এখানে থাকো, আমরা চলে যাচ্ছি। এরপরে আমরা আর তাদেরকে দেখিনি”

 স্থানীয় সাংবাদিকের তৎপরতায় যখন খবরটি বাইর হয় তখন এই ২২ টি শিশুকেই উদ্ধার করা হয়। 

 রাঙ্গামাটি শহরের মাঝখানে মাথা উঁচু করে বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমানের মূর্তি দাড়িয়ে আছে, যিনি একসময় বলেছিলেন, “আমরা সবাই বাঙ্গালী”  

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে দেশের সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে কোন পরিস্কার বিধান উল্লেখ করা ছিলো না। 

“এই যে আমার  মাতৃভূমি  এই যে আমার দেশ, এই দেশেরই ধুলো বালি ভালো লাগে বেশ” যে গানটি তারা গাইছে সেটা এদেশের অন্যতম জনপ্রিয় একটি দেশাত্মবোধক গান। এই আদিবাসী শিশুরা বাংলাদেশী কিন্তু তারা বাংগালি নয়, তারা মুসলিম ও নয়।   

বাংলাদেশ এখনো সম্পূর্ণভাবে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করেনি, যে চুক্তিকে তৈরি করা হয়েছিলো আদিবাসীদের ভুমি অধিকার এবং সাংস্কৃতিক্  পরিচয়কে  রক্ষা করা জন্য। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করার মানেই হলো আর্মি এবং বাঙালী সেটেলারদের ইস্যুকে আমলে নেওয়া। 

“আমরা সবাই যেটা মনে করি সেটা হচ্ছে অন্য সব জিনিসের মধ্যে  যেইটা করা সব চেয়ে বেশি জরুরী সেটি হচ্ছে  সম্মানের সাথে সেটেলারদেরকে পূর্ণবাসন করা। কারন পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হচ্ছে ভূমি নিয়ে বিরোধ“ 

কথা বলছেন চাকমা রাণী ইয়ান ইয়ান। 

“বাইরের থেকে যে কেউ এসে যদি আমাদের ভূমি দখল করে নেয় তাহলে আমাদের সমাজে অখণ্ডতা নষ্ট হয়ে যাবে”  

“ এখন যদি সমতলের সেটেলারেরা বলে যে তাদেরকে পূর্ণবাসন করা যাবে না কারন সমতলে তো বিশাল পরিমানের জনসংখ্যার সমস্যা এবং ইতিমধ্যে গ্রাম থেকে আসা লক্ষ লক্ষ  মানুষদেরকে জায়গা দিতে গিয়ে সরকার হিমশিম খাচ্ছে,পার্বত্য চট্টগ্রামে তো অনেক জায়গা তাহল এখানে জমি কিছু ভাগ দিতে সমস্যা কোথায়?”  (লিপিকা পেলহাম)

“তাহলে একজন বলতেই পারে সরকার তাদেরকে কেনো সুন্দরবনের ভিতরে জায়গা দিচ্ছে না?”(রাণী ইয়ান ইয়ান)

“ এটা তো ম্যান গ্রোভ ফরেস্ট। সেখানে কি বাস করা যায়?“(লিপিকা পেলহাম)

“ সেখানেও তো আদিবাসীরা থাকে, তাহলে সমতলের মানুষেরা  কেনো সেখানে থাকতে পারবে না যদি তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এখানকার আদিবাসীদের সাথে থাকতে পারে? 

আমাদের কাছে জায়গা নেই! পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপুল পরিমানে জায়গা আছে এটা আসলে স্রেফ একটা বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়, এটা শুধুই একটা গুজব” (রাণী ইয়ান ইয়ান)

আমার সমতলবাসী বাঙালী ড্রাইভার পাহাড়ে বসতি স্থাপনে কেনো তাদেরও অধিকার আছে সেই ব্যাপারে নিজের যুক্তি স্থাপন করে। 

সে আমাকে বলে যে এখানকার পাহাড়িরাও বহিরাগত কারন তারা বার্মা থেকে এসেছে। তারা বার্মা থেকে এসে এখানে থাকতে পারলে বাঙা্লীরাও কেনো থাকতে পারবে না। সে আরো বলে যে বাঙালীরা যদি এখানে না আসতো তাহলে এখানকার স্থানীয়  পাহাড়িরা এখনো কোমড়ে কটি কাপড় পরে থাকতো।  

আমরা আমাদের সেটেলার ড্রাইভারকে রেখে এখন একজন চাকমা গাইডকে সাথে নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলার দিঘিনালার পথে রওনা দিলাম। 

আমার দেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য সব জায়গা থেকে দিঘিনালাতে সব চেয়ে বেশি মিলিটারির ঘাটি দেখলাম।

“আমাদের কে রোড জাংশন এ থামতে হয়েছে কারন দুইটি আর্মি ভ্যান রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। “(লিপকা পেলহাম) আমরা আমাদের রুট ঘুরালাম। আমি এখানে ২১ টি আদিবাসী পরিবারের সাথে দেখা করতে এসেছি যারা দাবী করে তাদেরকে জোর উদ্দ্বাস্তু করা হয়েছে। 

“সেই কারনে আমরা সামনে ঘাটি করা আর্মিদের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইনা। তাই অন্য আরেকটি রাস্তা দিয়ে গ্রামে ঢুকছি। তাদের গাড়িগুলো গ্রামের ঠিক নিচে পার্ক করা আছে”   (লিপিকা পেলহাম)

বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড এর জন্য বেস এবং সেই সাথে একটি মিলিটারি রেঞ্জ বানানোর জায়গা করে দেওয়ার জন্য ৮৭ জন আদিবাসীকে তাদের নিজেরদের বাড়ি থেকে জোর করে উদ্বাস্তু করা হয়। 

আর্মিরা দাবি করে  যে এই সীমানার অঞ্চলটি খুবই স্পর্শকাতর ,কিন্তু তারা কি ধরণের হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে সেটা বলা মুশকিল। কারন বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি এবং সেই সাথে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবী করে যে এখানে বর্তমানে সামান্য পরিমাণেরও বিদ্রোহ নেই।   

 

আমি একটি টিনেরচালাওয়ালা বাড়ীর একটা রুমে বসে আছি, এখানে আমার সামনে দশজন পুরুষ এবং প্রায় ১৫ জন নারী বসে আছে, সাথে অনেকগুলো শিশু।  একজন লোক সবার হাতে হাতে লিফলেট বিতরন করছে, যেক্ষানে লেখা আছে “আমরা আমাদের নিজেদের বাড়িতেই বহিরাগত”। 

এই তরুণী কৃষক এখন একটি ছোট কুড়েঘরে বসবাস করছে।

(আদিবাসী তরুণী কৃষকের ভাষ্য)

“তারা ভোর ৩ টাই আসে এবং ঠিক আমাদের বাড়ির সামনে তাঁবু করে। তারা আমাদের কে চলে যেতে বলে কিন্ত আমরা চলে যেতে অস্বীকার করি। তাই তারা আমাদেরকে ঘর বন্ধি করে রাখে, আমরা আমাদের প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়ের সাথেও দেখা করতে পারিনা।

আর্মিদের সাথে আমাদের সংঘর্ষ হওয়ার পর তারা আমাদেরকে জানায় যে আমরা তৎক্ষণাৎ যদি বাড়ি ছেড়ে চলে না যাই তাহলে আমাদেরকে সারাজীবন ঘর বন্ধী হয়ে থাকা লাগবে। তাই আমরা এখানে এসেছি”

“এখানে আরো সংঘর্ষ হয়। আমরা দুইদিন পর্যন্ত টিকে ছিলাম। এরপরে তারা আমাদের কে বলে আমরা এখানে এখনো কি করছি, চলে যাও এখনি। “

আদিবাসীদের অধিকার আন্দোলনকারীরা আমাকে জানায় যে একটা ঘটনা আছে যেটার মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিতরে কি ঘটছে সেটা বুঝা যায়।   

কল্পনা চাকমা, যিনি ছিলেন একজন মানবাধিকার কর্মী এখনো নিখোজ।  তাকে এবং তার দুই ভাইকে বাংলাদেশ আর্মি জোর করে তুলে নিয়ে যায়।   এই সপ্তাহে তার নিখোজ হওয়ার ২২ বছর পূর্ণ হবে। এই ঘটনায় কাউকেই বিচারে আওতায় আনা হয়নি, যদিওবা তার কেসটি সেসময় স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে অনেক সারা জাগিয়েছিলো।  

 

কল্পনার বড় ভাই কালিন্দী সেই রাতের কথা আমার কাছে স্মরণ করে, 

(কালিন্দীর ভাষ্য)

“সেনা বাহিনীরা এসে প্রথমে আমার বাড়ি ঘেরাও করলো। তারা জিজ্ঞেস করে যে আমাদের কেউ বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর সাথে যুক্ত কিনা। আমরা বললাম না। 

প্রথমে তারা আমার ছোট ভাইকে পাহাড়ের নিচে নিয়ে যায়, তারপর তারা আমার বোন কল্পনার জন্যে আসে, আমি তার সাথে মেইন রোড পর্যন্ত যাই। তারা আমাদের তিন জনকে পাহাড়ের নিচে পুকুরের পাড়ে নিয়ে যায় এবং আমাদের চোখ বেঁধে দেয়। 

তারা বলে সামনে যাও, আমি কল্পনার হাত ধরে ছিলাম। এরপর গুলির শব্দ। আমি ভেবেছিলাম তারা আমার ভাই কে মেরে ফেলেছে, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তারা আমাদের সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলবে। আমি ঝাপ দিয়ে পানিতে ঝাপিয়ে পড়লাম, তারা আমাকে গুলি করে কিন্তু মিস করে। আমি হাতের বাধন খুলে পাহাড় বেয়ে উপরে দৌড় দিলাম, শেষ যে জিনিষটা শুনেছি সেটা হচ্ছে কল্পনার কন্ঠ “দাদা দাদা তারা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে”? “    

 

একটি সুন্দর জামা পড়া মেয়ে আমার সাথে কথা বলার জন্যে অপেক্ষা করছে।  

দুই বছর আগে যখন তার বয়স চৌদ্দ বছর , সে তার দুই জন বন্ধুকে নিয়ে দিঘিনালা বুদ্ধ মন্দিরের একটি ধর্মীয় উৎসব থেকে ফিরছিলো। ফেরার পথে তাদের সাথে ৪ জন বাঙ্গালি পুরুষের একটি দলের সাথে দেখা হয়।  

(ভুক্তভোগী কিশোরীর ভাষ্য)

“তারা আমাকে একটি তামাকের ক্ষেতে নিয়ে যায় এবং আমাকে ধর্ষণ করে। তারা আমার বন্ধুদের কে বেঁধে রাখে। আমার এক বন্ধু কোনভাবে হাতের বাঁধন খুলে গ্রামের দিকে পালিয়ে যায় এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার করে। যখন মানুষজন আমার খোজে এখানে আসে, ততক্ষনে সেই ৪ জন বাঙ্গালী পালিয়ে যায়।  পরের দিন পুলিশ আমাকে সেই তামাকের ক্ষেতে  নিয়ে যায় এবং আমাকে জিজ্ঞেস করে  আমি তাদের কারোর চেহারা চিনতে পারি কিনা।  একজনের চেহারা আমি দেখেই চিনে ফেললাম। সে বলে সে সেখানে ছিলো না। 

আমি বললাম “হ্যাঁ তুমি ছিলে, তুমি আমাকে ধর্ষণ করেছো।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু বছর ধরে অসংখ্য ধর্ষণ, অত্যাচার এবং এমনকি খুনের ঘটনার কেস করে আসছে। ২০১৪ সালে, এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায় যে শুধুমাত্র সেই বছরে ১৭০ জন আদিবাসী নারী এবং কিশোরী ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে।  

পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি যতোদিন ছিলাম এই ধরনের অনেক অভিযোগ আমি শুনতে পাই, তাহলে কেনো এই সমস্যা গুলো আমলে নেওয়া হচ্ছে না? 

এই প্রশ্নটা আমি আর্মিদের কাছে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম যেহেতু তারাই এই অঞ্চলটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কাছে আমার তাদের ইন্টারভিউ নেওয়ার সব অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আর্মিদের মুখপাত্র আমাকে জানায় যে এইসব নির্যাতনের অভিযোগ সব ভুয়া এবং মিথ্যা। 

আমি আমার ভ্রমণ শেষ করলাম একটি বুদ্ধ আশ্রমে ভ্রমণের মাধ্যমে যেখানে বুদ্ধ সন্ন্যাসিদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় থেরোবাদি বুদ্ধিজমের শেষ রেশথুকু সংরক্ষণ করতে। 

এখন আর্মিদের ও সেটেলারদের নিপিড়নের ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের আধ্যাতিক পদ প্রদর্শক এই বুদ্ধ সন্ন্যাসীদের কি মতামত? 

“আমাদেরকে শৃঙ্খলা নিয়ে ভাবতে হবে। সবকিছুর মূলে হচ্ছে শৃঙ্খলা।” (বুদ্ধ সন্ন্যাসী)

“তাহলে এখানে কি প্রতিবাদ করার কোনো জায়গা আছে? নিপিড়নের বিরুদ্ধে কি যুদ্ধ করার কোনো জায়গা আছে?  একজন সন্ন্যাসী হিসেবে আপনারা কি নিজের পায়ে রুখে দাঁড়াবেন?” (লিপিকা পেলহাম)

 

“একজন সন্ন্যাসী হিসেবে আমরা আমাদের নিজেদের মধ্যে শান্তি খুজি এবং একই ভাবে অন্যদের মধ্যেও আমরা শান্তি খুজি। সে কারনে আমাদের কাছে একে অন্যের সাথে বিবাদে জড়ানোর জন্য কোনো জায়গা নেই। কিন্তু আমরাও তো মানুষ ”  (বুদ্ধ সন্ন্যাসী)

উনার কথাগুলোতে বুদ্ধের মধ্যম পন্থার প্রভাব লক্ষ করা যায় যেটা একজন বুদ্ধ সন্ন্যাসীর মুখ থেকে শোনাটাই স্বাভাবিক। 

যখন আমি বুদ্ধিস্ট আশ্রমে ছিলাম আমার কাছে খবর আসে যে একজন বুদ্ধ সন্ন্যাসীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঘটনাস্থল আমি যেখানে আছি সেখান থেকে বেশি দূরে নয়।  বলা হচ্ছে তাকে মুসলিম উগ্রবাদীরা মেরে ফেলেছে। আরেকটা উদাহরণ যে এখানে কি ধরণের ট্রমার মধ্যে এই ধর্মটিকে যেতে হচ্ছে। 

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

Ananya Azad March 4, 2014 তাদের গঠনতন্ত্র গুলোতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা বলা নেই। বলা আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরাপত্তা...

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। প্রথম পর্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। প্রথম পর্ব

Ananya Azad February 28, 2014 বাঙলাদেশ সেনাবাহিনী নিঃসন্দেহে একটি পেশাদার সেনাবাহিনী। তার সাথে আছে যেমন গৌরবোজ্জল ইতিহাস তেমনি অনেক কালো অধ্যায় ।...

ম্রোদের ভূমি রক্ষায় অ্যামনেস্টির চিঠি

ম্রোদের ভূমি রক্ষায় অ্যামনেস্টির চিঠি

“অতি শীঘ্রই চিম্বুক থানচি রুটে বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে হবে”- এই মর্মে গত শনিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *