আর্কাইভ

মানবাধিকার কর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা সাথীর সাথে সিসিএ ফেসবুকে লাইভ প্রসঙ্গেঃ

by | Apr 28, 2021 | আদিবাসী বিষয়ক, সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে

[ গত বছরের জুন মাসে (২৯ জুন ২০২০)  “Chittagong Hill Tracts Perspectives: Environment, Wildlife and Indigenous Peoples”, এই শিরোনামে  ফেসবুকে লাইভ আলোচনা  হয়। পরিচালনায় ছিলেন মানবাধিকার কর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী । আলোচনায় অংশগ্রহন করেন উন্নয়নকর্মী লেলুঙ খুমি, সিসিএ এর প্রধান শাহরিয়ার সিজার রহমান ও সুপ্রিয় চাকমা । এর আগে অনিবন্ধিত এনজিও ‘Creative Conservative Alliance (CCA)’-এর পাহাড়ে  কার্যক্রম নিয়ে অনলাইন-অফলাইনে  ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও অসন্তোষ তৈরি হয় । অনলাইন এই আলোচনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন  এক্টিভিস্ট ডেনিম চাকমা । ]

 

প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে শুরু করছি। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা রিজার্ভ ফরেস্ট প্রতিষ্ঠা করার পিছনে মূল কারণ ছিল ধীরে ধীরে পাহাড়িদের একেবারে জুমচাষ বন্ধ করে দেওয়া এবং গতিশীলতা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামে বনসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল কারণ সম্পূর্ণরুপে ছিল অরণ্য যা সংরক্ষিত বনাঞ্চল করা কোন প্রয়োজনই ছিল না। জুমচাষ বন্ধ করে দিয়ে ভূমিরাজস্বকে অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করা ব্রিটিশ প্রশাসকদের ছিল অন্যতম পদক্ষেপ। প্রথম পদক্ষেপ ছিল হালচাষের উদ্যোগ। যা সমতল থেকে বাঙালি নিয়ে যাওয়া হয়। ১৮১৮ সালে, সেই সেটলম্যান্টকে Special Grant বলা হয়। এই জমির পরিমাণ ছিল ৪৫০ একর। তারপর প্ল্যান অনুযায়ী বহু পরে এসে ১৮৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে অ্যাসিস্টেন্ট (Assistant Conservator) কনসারভেটরের নিয়োগ করা হয়। তারপর ১৮৭১ সালে ফেব্রুয়ারী ১ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক সীমানার আওতায় সমস্ত বনাঞ্চলকে Government Forest বলে ঘোষণা করা হয়। এই সময় থেকে বনবিভাগ অর্থাৎ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট বনাঞ্চল ব্যবহারের পূর্ণ ক্ষমতা অর্জন করে। এই ক্ষমতার প্রয়োগের দৃষ্টান্ত ১৯৭১/৭২ সালে সেগুন গাছ লাগানো এবং সংরক্ষিত বা Reserved Forest তৈরি করা। জুমচাষিদের হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে সেখানে সেগুন গাছ লাগানো শুরু হয়। ম্যাকেঞ্জি, হান্টার ….. এনাদের বইগুলো পড়লে জানতে পারবেন। ১৮৮০ থেকে ১৮৮৩ সালের মধ্যে মাতামুহুরী, কাসালং, সাংগু, সীতাপাহাড়…… অঞ্চলে সংরক্ষিত বন সৃষ্টি করা হয়। এই অঞ্চলের মোট আয়তন ছিল ১৩৬৫ বর্গমাইল, যা কিনা ছিল জুমচাষীদের ব্যবহৃত মোট অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ। কিন্তু ১৯২৭ সালের ‘Report on The Administration of Bengal’ এ আছে আয়তন ১৪২১ বর্গমাইল। ইতিহাস বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হচ্ছে উপনিবেশিকভাবে নিপীড়নের একটা হাতিয়ার।

সুপ্রিয় দা‘র প্রসঙ্গেঃ

সুপ্রিয় দা একটা কথা বলেছেন, ব্রিটিশরা যা করে গেছে ঐটুকুই সম্পদ আমাদের কাছে আছে! সুপ্রিয় দা, আপনি হয়ত জানেন কাপ্তাই বাঁধের পরিকল্পনা ১৯২২ সালে প্রথম ব্রিটিশরা করেছিল। পরিকল্পনার স্থান ছিল বরকল। কোন কারণেই এটা প্রশাসনিকভাবে বাতিল হয়। আবার ১৯৪৬ সালে ঐ পরিকল্পনা শুরু হয়। তারপর ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশদের প্ল্যান অনুযায়ী পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই বাঁধ সম্পন্ন করে। রেডক্লিপের রেখার একটা অংশ ছিল কাপ্তাই বাঁধ। এই কাপ্তাই পুরো চাকমা সভ্যটা ধ্বংস করে দিয়েছিল। কাপ্তাই বাঁধের কারণে স্টিল সারভাইভ করে যাচ্ছে পাহাড়ি মানুষ। সমতল থেকে পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসন, রিজার্ভ ফরেস্ট তারপর কাপ্তাই বাঁধ। পাহাড়িদের উপর যে উপনিবেশিক শাসন করার জন্য ব্রিটিশদের যে প্ল্যান। এইগুলো কি আপনি অস্বীকার করেন? ব্রিটিশরা আমাদের কি কি সম্পদ দিয়ে গেছে? আপনার কাছে প্রশ্ন থাকল।

আর আপনি বলেছেন, একটা রক্ষা করার প্রেসার আর ধ্বংসের প্রেসার। কিন্তু ধ্বংসের প্রেসার এতোই বেশি রক্ষা করার প্রেসারটাকে পুশ করছে। কিন্তু কি কারণে ধ্বংসের হার বেড়ে যাচ্ছে সেইটা বিস্তারিত তুলে ধরেন নি।

আপনি একটা প্রাক্টিক্যাল অভিজ্ঞটা বলেছেন, যে ম্রোদের একটা পাড়ায় আপনাকে মেরে ফেলার প্রসঙ্গে। আপনি কি একজন হিউম্যান হিসেবে ওয়াইল্ড লাইভের বাইরে একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের যে সম্পর্ক ঐ পাড়ার গিয়ে তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন?(!)

আপনি শান্তিচুক্তি পরে কাসালং ধ্বংস হওয়ার উদাহরণ দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সংগ্রাম করে গেছে। ১৯৯৭ সালে চুক্তি হয়। ধর্ষণ-নিপীড়ন হত্যা…এর মধ্যে দিয়ে এতো বছর সংগ্রাম করে যাওয়ার পর ঐ মানুষগুলোর

সম্বল আর কি থাকতে পারে! যা আপনার কাছে বন ধ্বংস হয়ে গেছে সেটাই প্রধান্য পেয়েছে। আর আপনি বলেছেন শান্তি চুক্তি। শান্তি চুক্তি নয় পার্বত্য চুক্তি।

সাথী দির প্রসঙ্গেঃ

সাথী দি বলেছেন ‘ অন্যের দোষ ধরাটা আমাদের জন্য বেশি সহজ, কিন্তু নিজের মাথায় ময়লা আমরা দেখতে পাইনা। আর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন।’

এবার আমিও কিছু বিষয়ে আঙ্গুল তুলে বলছি, শাহরিয়ার সিজার ভাইয়ের ওয়াইল্ড লাইভ নিয়ে যে কাজ সেই কাজ কিন্তু ফেসবুকে হয়না। ফেসবুকে লাইভে যাওয়া অপ্রাসঙ্গিক মনে করি। আপনার উচিত ছিল ফেসবুকে লাইভে না এসে ঐ সাংগুতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া আসলে মানুষ উচ্ছেদ হচ্ছে না হচ্ছে না। পাহাড়ে যে সিস্টেমে আগ্রাসন চলে সেই প্রেক্ষাপথে দেখলে শাহরিয়ার রহমান সিজার একজন আগ্রাসন বাস্তবায়নের এজেন্ডা হতেই পারে। আপনি ভিক্তিমদের কাছে না গিয়ে শাহরিয়ার সিজারের সাথে কথা বলেই বুঝতে পারলেন?(!) আপনি একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে যার উপরে আঙ্গুল উঠেছে বা অপরাধী তার কথাই বিশ্বাস করলেন ভিক্তিমদের কাছে না গিয়ে?(!) আপনি অভিযুক্তদের পক্ষে গিয়ে সাফাই গাইলেন। (!) একজন মানবাধিকার কর্মীর কাজটাই আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিলেন। আপনি ফেসবুকে লাইভের মাধ্যমে কি বুঝাতে কিংবা কি অর্জন করতে চেয়েছেন? আপনার কাছে প্রশ্ন থাকল।

 

শাহরিয়ার সিজার ভাইয়ের প্রসঙ্গেঃ

শাহরিয়ার সিজারের সাথে ৩ বছর আগে আমরা বেশ কয়েকজন দেখা করেছিলাম। ঢাকা, কাজী পাড়ায়, ২০১৭ সালে। সিজার ভাই কিন্তু বরাবরই বন ধ্বংস হওয়ার পিছনে ঐখানকার আদিবাসীদের দায়ী করেছেন। এমনকি জুমচাষ নাকি সবচেয়ে বন ধ্বংসের জন্য দায়ী। উনি মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার বা Relocate করার কথা বলেছেন। আমরা মেনে নিতে পারিনি। আবার থানচিতে ওনার সাথে এক্টিভিস্টদের এই বিষয় নিয়ে সাক্ষাৎ হয়। বরাবরই ওনার কাছের বিষয়ে আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সিজার ভাইয়ের বিস্তারিত প্ল্যান কিন্তু পরিষ্কার করে বলতে পারেন নি। আলোচনার মধ্যে বরবারই বেশ রহস্য থেকে যায়। তার আলোচনা থেকে এটাই জানতে পারি মানুষগুলো সিজার ভাইয়ের কাছে মুল্য নেই। শুধুমাত্র ওয়াইল্ড লাইভ তার প্রধান। আপনার দিকে এতোই অভিযোগ! তার পরেও সিসিএ এনজিও রেজিস্টারভুক্ত না হয়ে সিসিএ ব্যানারে কিভাবে সাঙ্গুতে কার্যকলাপ চলে। (!) এমনকি আঞ্চলিক পরিষদের সাথেও কোন সম্পৃক্ততা নেই। আপনার গায়ে যদি কোন ময়লা না থাকে আশা করি তাহলে আর্থিক লেনদেনের ডকুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পাবলিকের কাছে পাবলিশ করবেন। মানুষ কি চায় সেইটা আগে জানতে হবে।

পরিশেষে, পাথর উত্তোলন, প্রতিনিয়ত থানচি থেকে ট্রাক ভর্তি গাছ সমতলে চলে আসা। এইগুলো গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরী। একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা হয় না। পাহাড়ের পরিবেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সেগুন গাছ। এমনকি পাহাড়ে ভূমি ধসের জন্য অনেকটা সেগুন গাছ। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট চাইলে কিন্তু সেগুন গাছ রোপণ বন্ধ করতে পারে। কিন্তু করছে না কেন? (!) কারণ সেগুন ব্যবসার সাথে শাসকগোষ্ঠীর বড় একটা অর্থনৈতিক লেনদেন জড়িত।

আলোচনার নিউজ লিংক:https://hillvoice.net/shahriar-caesar-avoids-most-of-the-basic-questions-in-online-discussion/

লেখক: ডেনিম চাকমা

এক্টিভিস্ট,বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

 

পপুলার পোস্ট

Related Post

রাঙামাটির ভূষণছড়া হত্যাকান্ড নিয়ে দেশের মূলধারার মিডিয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের প্রতিবাদে  জুম্ম ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম এর প্রতিবাদ ও  বিবৃতি

রাঙামাটির ভূষণছড়া হত্যাকান্ড নিয়ে দেশের মূলধারার মিডিয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের প্রতিবাদে  জুম্ম ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম এর প্রতিবাদ ও  বিবৃতি

গত ৩১ মে ২০২১, দেশের মূল ধারার মিডিয়া যমুনা টিভি, ইনডিপেনডেন্ট টিভি, এসএ টিভি, ডিবিসি নিউজ টিভি, সমকাল, দৈনিক ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ভূষণছড়া...

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেন্ডার ভিত্তিক বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

শহর অঞ্চলের সমাজঃ পাহাড়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্তিতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি সংস্কৃতিক আগ্রাসন। পাহাড়ের মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে...

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

“কাপ্তাই বাধঁ, মৃত্যুর ফাঁদ”-করুণাময় চাকমা

পানির নিচে সেই ঝগড়াবিল আদাম: আমার নাম করুণাময় চাকমা। বর্তমান নিবাস রূপকারী, মারিশ্যাতে হলেও রাঙামাটির যে পর্যটন মােটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *