জুমঘর সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপ্রতিরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ব্লগ বিষয় ভিত্তিক আর্কাইভ chtbd.org মাল্টিমিডিয়া জুম্ম সংস্কৃতি





মাচাং ঘরের নীচে শুকরগুলি... (১)



মাচাং ঘরের নীচে শুকরগুলি চুউ চুউ ডাকা শুরু করছে। ভুতুড়ে হিজহিজ পরিবেশে বাড়ির উঠোনের সামনে নীরার লাগানো নয়নতারা গাছের ফাঁকেফাঁকে ভুট্টার গাছগুলি তখনো দুলছে মাতাল যুবকের মতো। নীরা একা তার ভাইকে কোলে নিয়ে বৃষ্টি দেখবে বলে বাশের তৈরী কিঞ্চিৎ ছিদ্র বিশিষ্ট জানালায় মুখ রাখল। নীরার ভাই অমল। বয়েস তার তিন বছর, দু মাস। পাহাড়ে যাবার আগে তার মা তাকে দুপুরে বুকের দুধ খাওয়াইতে খাওয়াইতে বলেছিলো,... নীরা, বিকাল হইলে অমলকে গোসল করিয়ে চার পট চাল বসিয়ে রাখিস। কাজ থেকে ফিরে এসে জুমের প্রথম সবজি চালকুমড়া দিয়ে শামুক রাঁধবো। অমল ঘুমিয়ে রইলো তার নানীর তৈরীর বাঁশের পাহাড়ি দোলনায়। মা চলে গেল জুম চাষে তামুক টানতে টানতে। অমলকে নিয়ে নীরা অত্যন্ত বিরক্তিতে ভোগে, মাঝেমাঝে সে হাতও তুলে ফেলে। অমল একরোখা, অল্পতেই অভিমান করে আর বেশি বেশি অনায়াসেই কেঁদে ফেলে। নীরা চাইলো এইবার তার ভাইকে ঘরে রেখে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পানি সংগ্রহ করবে। কিন্তু সে আর করতে পারলো না। অমল প্রচণ্ড বৃষ্টি ভয় পাই, তার চাইতেও তার ভয় বজ্রপাতে। নীরার বাবা অনুপম নিজের জমিতে পাশাপাশি অন্যের জমিতেও কাজ করে থাকে অর্থনৈতিকভাবে আরো স্বাবলম্বী হইতে। অমলের অহেতুক ভয়ের অজুহাতে নীরার উপকৃত হইলো কাজের কিছুটা অংশ ফাঁকি দিয়ে। অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছিল বিষাদিত সন্ধ্যা, ধুয়ে যাচ্ছিল পৃথিবীর বিষাদিত মুখ।নীরা তার মায়ের ভাষায় দিয়ে গুণ গুণ করে গাইলো সর্বহারার গান। মনে পড়লো তাদের পুরনো বাড়ির কথা। নীরার বান্ধবী পড়াশুনা করত সরকারি প্রাথমিক স্কুলে।গত তিন বছর আগে তারা একই গ্রামে ছিলো। পরে সেনার দুঃশাসনের কবলে পুড়িয়ে যায় নীরার বাড়ি, গ্রাম, বন্ধুত্বের সম্পর্ক। নীরার স্পষ্ট মনে আছে, যখন তার বাবাকে অকারণে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো সেনারা তখন নীরার মা নীরার সামনে প্রথম হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলো।তার আগে তার মাকে কখনোই সে কাঁদতে দেখেনি। মা পাহাড় থেকে ফিরলো বৃষ্টির মধ্য দিয়ে। অমল হু হু করে কেঁদে উঠলো তার মাকে দেখে কোলে যাবার অভিপ্রায়ে। ধুম করে অনাকাঙ্ক্ষিত এক বজ্রপাত তাকে আরো উম্মাদ করে তুলল হঠাৎ করে। নীরা তার ভাইকে রেখে ঘরের ভেতর হইতে একখানা শুকনো পিনন বাড়িয়ে দিলো তার মায়ের কাছে। গোসল তোসল শেষ করে অমলকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াইতে খাওয়াইতে নীরাকে বললো বুদ্ধের কাছে প্রদীপ জ্বালিয়ে, পরে ঝুপড়ী হইতে চাল কুমড়াটাকে বের করে ধীরেধীরে চামড়াটা ছুলতে। নীরার মনে মনে রাগ উঠে, নীরা চেয়েছিলো তার ভাইকে নিয়ে মাচাং এ বসে বসে মেঘ ধরতে আর তার বাবার জন্য অপেক্ষা করতে। নিরুপম প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে তার আদরের সন্তান অমলের জন্য দুই টাকার মুড়ি কিনে আনত দোকান হইতে। অমলকে খাওয়ানোর ফাঁকেফাঁকে অনেকক্ষণ মজা করে নীরাও খেতে পারতো দুই টাকার সেই মুড়ি।



লেখক: aongmarma


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):