JUMMOVOICE





ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমার অংশগ্রহণ: কিছু ঘটনার স্মৃতিচারণ


এই লেখাটি জুম্ম জাতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র বিপ্লবী স্নেহ কুমার চাকমার নিজস্ব বয়ানে লেখা আত্মচরিত।
তিনি স্বয়ং পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। ইংরেজীতে লেখা তাঁর মূল আত্মচরিতের
অনুবাদটি এখনো অসমাপ্ত তবে অচিরেই অনুবাদের সম্পূর্ণ অংশ প্রকাশ করা হবে।

লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা

১৯২০ সালের গোড়ার দিকের কথা। আমি তখন আমাদের খবঙপুজ্যা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। রাঙ্গামাটি শহর থেকে ৪১ মাইল উত্তরে আমাদের এই গ্রাম। তখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র তথা রাজধানী ছিলো রাঙ্গামাটি। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত একটি জেলা। ঐ সময় একটি গান প্রায়শ শোনা যেতো। ভ্রাম্যমান এক যাত্রা দলের কিছু ছেলে ছোকরা সমবেত কন্ঠে নাচতে নাচতে গানটি গাইতো। গানের কথাগুলো ছিল এরকম - “গান্ধীজী জয় বলো সকলে, ভারতবাসী স্বরাজ পেতেছে (স্বরাজ পেতে যাচ্ছে)।” এই গানটি তখন আমার কল্পনার জগৎকে আলোড়িত করেছিলো। বিশেষ করে ‘গান্ধীজী’ এবং ‘স্বরাজ’ শব্দ দু’টি আমার হৃদয়ের গহীনে অপরিসীম অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত করলো। পরবর্তীতে এই অনুপ্রেরণাই নিজের অজান্তে আমার জীবন ও কর্মধারাকে প্রভাবিত করেছে। পথ চিনিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়েছে। কারণ প্রথম দিকে ওসব বিষয়ে আমার সুস্পষ্ট কোনো জ্ঞান বা পূর্বধারণা ছিলনা।

পরে ছোটমহাপ্রুম স্কুল থেকে আমি আমার উচ্চতর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করি। রাঙ্গামাটি শহর থেকে ১২ মাইল উত্তরে ছোটমহাপ্রুমের অবস্থান। এরপর রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ঐ সময় সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় এটিই ছিল একমাত্র সরকারি হাই স্কুল। এই স্কুলে ১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে আমি তখন ক্লাস ফাইভের একজন ছাত্র। স্কুলের সাথে সংযুক্ত সরকারি বোর্ডিং হাউজেই ছিল আমার থাকার ব্যবস্থা। উচ্চতর প্রাথমিক শিক্ষা শেষে হাই স্কুলে এসে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়াটাই ছিল ঐ সময়কার সাধারণ রীতি। কিন্তু ১৯২৭ সালে আমি যখন ভর্তি হতে যাই, তখন রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে কোনো সিট খালি ছিলো না। অর্থাৎ আগে থেকেই ক্লাসের সব আসনে ভর্তি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এমন পরিস্থিতিতে স্কুলের হেডমাস্টার মশাই আমাকে ক্লাশ থ্রী-তে ভর্তি হতে বললেন। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানালাম এবং গোঁ ধরলাম যে, আমাকে ক্লাস ফাইভেই ভর্তি করতে হবে। কারণ আমি জেনেছি, ততদিনে নি¤œ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আমার অনেক সহপাঠীকে ক্লাস ফাইভে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। তারা নি¤œ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে আমার আগে সরাসরি এই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হেডমাস্টার মশাই আমাকে বেশ একটি কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করলেন। কিন্তু ঐ পরীক্ষায় আমি এতো ভালো রেজাল্ট করলাম যে, তিনি আমাকে ক্লাস ফাইভেই ভর্তি করতে বাধ্য হলেন। পাশাপাশি হুমকিও দিলেন। বললেন, বৎসরের নির্ধারিত তিনটি পরীক্ষার একটিতেও যদি খারাপ রেজাল্ট করি, তাহলে তিনি আমাকে বহিষ্কার করবেন। এমন পরিস্থিতিতে আমাকে স্কুল এবং হোস্টেল উভয় স্থানেই বেশ কড়া নজরদারিতে রাখা হলো। ফলে সব ক্ষেত্রেই আমি ‘ভালো ছেলে’ হিসেবে টিকে থাকার সাধনা করতে বাধ্য হলাম। এর সুফলও হাতেনাতে পেলাম। দেখা গেলো, বৎসরের তিনটি পরীক্ষা শেষে আমার ক্লাস সিক্সের রোল নং দাঁড়ালো এক। মানে, আমি এখন ক্লাশের ফার্স্ট বয়। ক্লাস সেভেন এবং ক্লাস এইটেও আমি এই ‘ফার্স্ট বয়’ হওয়ার কৃতিত্ব অব্যাহত রেখেছিলাম।

তবে ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত স্বদেশীদের কিছু পুঁথিপত্র কিভাবে যে আমার হস্তগত হলো, সেটি এখন আর মনে নেই। ঐসব পুঁথিপত্রে বা লেখায় মতিলাল নেহেরু, লালা লাজপত রায়, শরৎ চন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহেরু, সুভাষ চন্দ্র বসু, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত প্রমুখের নাম লিপিবদ্ধ থাকতো। উল্লেখিত নামগুলোই মূলত আমার বিপ্লবী সত্ত্বাকে গড়ে তুলেছে। আমাকে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীতে রূপান্তরিত করেছে। আর এই রূপান্তর বলতে গেলে নিজের অজান্তেই।

আমি যখন ক্লাশ সেভেনের ছাত্র, তখন একটি বিষয়ে আমার জন্মদাত্রী মাকে উদ্বুদ্ধ করে ফেলি। তাঁকে বললাম, আমি লাহোর কংগ্রেসের সর্বভারতীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করবো। পরে পাহাড়ের তুলা থেকে সুতা কেটে তৈরি মায়েরই বোনা একটি খাদি নিয়ে আমি প্রদর্শনীতে সত্যিই অংশ নিলাম। সেটি ১৯২৯ সালের কথা। পুরস্কার ঘোষিত হলে দেখি, ‘মানকুমারী চলামা’ চাকমার খাদির কাজটি এই সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। মায়ের সেই অর্জনে আমার বেশ গর্ববোধ হলো। আর গর্বিত হওয়ার আসল কারণটি হলো, পুরস্কার সনদে স্বনামধন্য মতিলাল নেহেরু এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র জওহরলাল নেহেরু উভয়েরই স্বাক্ষর খোদিত রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সব সময় ছিলো ব্রিটিশদের আইনকানুন বর্জিত ও তাদের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত একটি জেলা। অর্থাৎ শাসন বহির্ভূত এলাকা। তাই এই অঞ্চলটি সকল রাজনৈতিক কর্মী তথা বিপ্লবীর যাবতীয় বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের বা আওতার বাইরে ছিলো। অধিকন্তু আমার এভাবে বলাটা হয়তো অতিশয়োক্তি হবেনা যে, তখনকার জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং জাতীয় দলগুলোও আমাদের পার্বত্য অঞ্চল এবং তার জনগণের প্রতি খুব বেশি মনোযোগ দেননি।

তবে ঐ সময় আমাদের যাবতীয় সমস্যা ও সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করার জন্য একজন ধুরন্ধর ব্যক্তি সদা তৎপর ছিলেন। তাঁর নাম শ্রী এস. কে. ঘোষ। তিনি একজন আইসিএস অফিসার এবং বাঙালি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। একইসাথে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি কমিশনার এবং রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যানও। পরবর্তীকালে শ্রী সংকর সেন নামের আরেকজন ব্রিটিশ শাসকদের পদলেহী তথা স্থানীয়দেরকে হত্যাকারী সরকারি সারমেয় এসে যুক্ত হলে শ্রী ঘোষের শক্তি ও দাপট বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই সংকর সেন হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি মেদিনিপুরে স্বদেশীদের দ্বারা সংঘটিত বুর্গি সাহেবের হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে এক বা একাধিক জাতীয় বীরকে গ্রেফতার করেছিলেন। ফলে স্বদেশী বিপ্লবীরা তাঁকে অনুসরণ করছিল। তাই শ্রী সেনকে প্রয়োজনীয় আশ্রয় ও সুরক্ষার জন্য তখনকার দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের রাঙ্গামাটি সদরের এসডিও হিসেবে পাঠানো হয়। শ্রী এস. কে. ঘোষ এবং শ্রী সংকর সেন দু’জনই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্বদেশী আন্দোলনের যাবতীয় নামগন্ধ মুছে ফেলতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছিলেন।

কিন্তু আমাদের অন্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা তথা মুক্তির আকাঙ্খা খুবই তীব্র ছিলো। ১৯৩০ সালে আমি তখন ক্লাশ এইটের ছাত্র। স্বদেশী আন্দোলনের উন্মাদনায় একদিন আমি নিজেকে একজন ক্ষুদে নেতা হিসেবে আবিস্কার করলাম। এর ফলস্বরূপ অচিরেই স্কুলে একটি ধর্মঘট ডাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। তাই একদিন সকালবেলা আমরা কাউকে না জানিয়ে নিজেরাই নিজেদের হোস্টেল থেকে ছুটি নিলাম এবং জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল অভিমুখে রওয়ানা দিলাম। আমাদের উপরের ক্লাশের ছাত্র-ছাত্রীরা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশি ছিলো। কিন্তু আমি জানিনা, তাঁরা সেদিন কী ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমার সাথে তখন প্রায় একশত জন ছাত্রের একটি দল। তাদেরকে সাথে নিয়ে জেলার প্রধান সড়ক ধরে উত্তর দিকে এগোতে থাকলাম। অর্থাৎ খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালার দিকে। জেলা সদরের সরকারি হাই স্কুলের ছাত্রদের এহেন ধর্মঘট নিজেই একটি বড়সড় স্বদেশী বিপ্লবীয়ানার নজির। কিন্তু আমি ওখানেই থেমে থাকতে চাইনি। তাই আমরা ‘বিলাতি বর্জন’ আন্দোলনও শুরু করে দিলাম।

সেদিন প্রায় ১৪ মাইল হাঁটার পর আমরা গ্রামের একটি বাজারে এসে পৌঁছলাম। জায়গাটির নাম বুড়িঘাট। দিনের যাবতীয় কেনাবেচা শেষে তখন বাজারের স্থায়ী ও ভাসমান সব দোকানপাট বন্ধের আয়োজন চলছিলো। এই অবস্থায় আমরা উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বিলেতি সব দ্রব্য বর্জনের ডাক দিলাম। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ কেউ বিদেশি পণ্য ছুঁড়ে ফেলে দিলো। আমরা উপস্থিত সবার সামনে সেসব পণ্য পুড়িয়ে ফেললাম।

তবে আমার এক সহপাঠী ছিলেন। বেশ লম্বা-চওড়া সুঠাম গড়নের অধিকারী। নাম খগেন্দ্র লাল দেওয়ান। তিনি বুড়িঘাট বাজারের ঐ সীমিত বিপ্লবী কর্মকান্ডে মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারলেন না।

বুড়িঘাটের তুলনায় নান্যাচর বাজারটি আয়তনে অনেক বড়ো ছিলো। তাই আমরা সেখানে একটি বড়ো রকমের স্বদেশী আন্দোলনের মহড়া প্রদর্শনের সংকল্প নিলাম। ওখানে পৌঁছে আমি বক্তব্য দিতে শুরু করলাম। কিন্তু উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে উপর্যুপরি অভিযোগ আসতে থাকলো যে, তাঁরা বক্তাকে দেখতে পাচ্ছেন না। আমার বিশালদেহী বন্ধু, সহপাঠী খগেন্দ্র লাল দেওয়ান তখন আমাকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এবং কাঁধের উপর বসিয়ে শক্ত করে ধরে রাখলেন, যাতে পড়ে না যাই। এই অবস্থায় আমার প্রায় আধ ঘন্টার জ্বালাময়ী বক্তৃতা শোনার পর দোকানীরা একে একে নিজেদের দোকান থেকে সব ধরনের বিদেশী পণ্য ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো। এরপর অতি শীঘ্রই সমগ্র নান্যাচর বাজার এলাকা অগ্নীচ্ছ্বটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সাথে ছিলো গগন বিদারী শ্লোগান - ‘বন্দে মাতরম’।

আমাদের বিপ্লবীয়ানার সংবাদ অতি দ্রুত ছড়াতে লাগলো। আমরা দেখলাম, যাত্রাপথে যেসব হাটবাজার পড়ছে সেগুলো আগে থেকেই আমাদের আদেশ-নির্দেশের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। যাত্রার প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হাটবাজার খাগড়াছড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম। রাঙ্গামাটি শহর থেকে প্রায় ৪০ মাইল উত্তরে চেঙ্গি নদী ও খাগড়াছড়ির ছড়ার তীরবর্তী এই পার্বত্য বাজার তথা জনপদ। সেদিন ছিলো নির্ধারিত বাজার বার অর্থাৎ হাটের দিন। কিন্তু হাজারে হাজার জনতা সেদিন বাজারে উপস্থিত হয়েছিলো পণ্যের খরিদ্দার হিসেবে নয়, বরং আমাদের বিপ্লবী দলকে এক নজর দেখার জন্য। তখন আমাদের দলটি সংখ্যায় ৫০ জনের নীচে নেমে গেছে। তবুও আমরা ছিলাম সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত করে খাগড়াছড়ি বাজারে প্রবেশ করছি, আর হাজার হাজার মানুষ আমাদেরকে অনুসরণ করছে। আমি যেই না ‘স্বদেশী’ বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম (যে ধরনের অনলবর্ষী প্রতিবাদ ও রণহুঙ্কার ভারতের এই অংশে প্রথমবার উচ্চারিত হলো), অমনি উপস্থিত জনতার মধ্যে শোরগোল উঠলো যে, তাঁরা বক্তাকে দেখতে পাচ্ছেন না। অবশ্য এমন পরিস্থিতির জন্য বন্ধু খগেন্দ্রের কাছে আগে থেকেই পরিকল্পনা প্রস্তুত ছিলো। কালবিলম্ব না করে সে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পাশের এক বিশাল বটবৃক্ষের ডালে বসিয়ে দিলো। নীচে দাঁড়িয়ে সে বটগাছের ডালটিকে খুব কায়দা করে ধরে রাখলো, যাতে আমি পড়ে না যাই। খাগড়াছড়ি ছিলো আমার নিজের এলাকা। বাজারের এক মাইল পশ্চিমেই হলো খবংপুজ্যা, আমার নিজ গ্রাম। অনেক ভয়ভীতি, সংশয় কাটিয়ে এবং জনতার স্বতস্ফুর্ত জয়ধ্বনির মাঝে এক ঘন্টার বেশি বক্তৃতা দিলাম। বক্তব্যের শেষদিকে সকল বিলেতি পণ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানালাম। মুহুর্তের মধ্যেই বাজারের সব উন্মুক্ত স্থানে বিলেতি পণ্যের পাহাড় গজিয়ে উঠলো এবং ডজনকে ডজন কেরোসিনের ড্রাম থেকে সেসব পণ্যের উপর কেরোসিন ঢালা হলো, যাতে সহজে সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। উপস্থিত হাজার জনতা ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘বন্দে মাতরম’ প্রভৃতি রণধ্বনির সাথে দিনে দুপুরে এহেন বহ্ন্যুৎসব দারুণভাবে উপভোগ করলো। যেখানে একটি মিহি ম্যানচেস্টার ধুতির মূল্যই ছিলো এক রুপি (তখনকার দিনে), আর ১০ কাঠির একটি অগডেন পোলো সিগারেট প্যাকেটের দাম ছিলো দুই থেকে তিন আনা (প্রত্যন্ত অঞ্চলেও), সেখানে লক্ষ লক্ষ রুপির পণ্য সেদিন খাগড়াছড়ি বাজারে পোড়ানো হয়েছিলো।

পরদিন সকালে আমি ২৫ জনের একটি দল নিয়ে আমার গ্রামের নিজ বাড়িতে গিয়ে হাজির হই। সেদিন জন্মদাতা পিতা আমার দিকে সরাসরি না তাকিয়ে নিজের মতো করে আবোল-তাবোল সব কাজকামে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমার মা জুমের সুতো থেকে তাঁর ছেলের জন্য নিজেরই বোনা ধুতি পরিহিত আমাকে দেখে অনির্বচনীয় এক গর্বে-গৌরবে যেনো লাল টকটকে হয়ে গেলেন! তবে এর পরও তিনি আমাকে নয়, বরং আমার বন্ধুদেরকেই সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। অবশেষে মৃদু স্বরে বললেন, ‘কেনো তোমরা এখন নিজেদের পড়াশোনায় ফিরে যাচ্ছো না? আমাদের পরবর্তী উন্নততর প্রস্তুতির জন্য সেটি যে ভীষণ দরকার!’

এটি সুস্পষ্ট যে, ডেপুটি কমিশনার শ্রী এস কে ঘোষ ইতোমধ্যে আমাদের গার্ডিয়ান লেভেলে তাঁর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আমার পিতা ইতোমধ্যে প্রতিবেশী অন্যান্য ছাত্র/ছাত্রীদের অভিভাবকদের দ্বারা এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন যে, কেনো তাঁর এই ছোট্ট স্বৈরাচারী অন্যসব সুবোধ/অবোধ বালকদেরকে বিপথে পরিচালিত করে তাদের মূল্যবান সব জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছেন!

আমি বন্ধু খগেন্দ্রের দিকে তাকালাম। সে ক্লাসে ফিরে যেতে সম্মতি জানালো। অবশেষে আমরা ক্লাশে ফিরলাম। আমাদের অভিভাবকদের অনেকেই দল বেঁধে ছাত্রদের এই প্রত্যাবর্তন যাত্রায় সামিল হলো। কারণ তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, অবশেষে কথিত এইসব ক্ষুদে ‘স্বদেশীদের’ সবাইকে পাকড়াও করা সম্ভব হয়েছে! কিন্তু স্কুলে পদার্পণের সাথে সাথেই আমি দেখলাম, শ্রী এস কে ঘোষ স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হয়ে বসে আছেন। ফলে ক্লাশ এইটের সব ছাত্র-ছাত্রীর মধ্য থেকে একমাত্র আমিই গুরুতর শাস্তিটা ভোগ করলাম। সেটি হলো, চিহ্নিত ছয় জন মারাত্মক অপরাধীর মধ্যে একমাত্র আমাকেই ‘ছয় মাসের বহিস্কারাদেশ’ দেওয়া হলো। ফলে আমি ১৯৩০ সালের শেষার্ধে ছয় মাসের জন্য বহিস্কৃত হলাম। তবে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক পরীক্ষায় বসার অনুমতি আমাকে দেওয়া হলো।

এভাবেই আমি ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার এবং আইসিএস অফিসার শ্রী এস কে ঘোষের রোষানলে চলে এলাম। সেটি ১৯৩০ সালের কথা। তখন আমি রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম।

শ্রী ঘনশ্যাম দেওয়ান ছিলেন আমার রাজনৈতিক দর্শনের গুরুদেব। তিনি তখন চট্টগ্রাম শহরে থাকতেন এবং একজন কলেজ ছাত্র ছিলেন। তাঁর মাধ্যমে একদিন মহেন্দ্র বড়–য়া নামের একজন গোপনে আমাদের সাথে রাঙ্গামাটি শহরে দেখা করতে আসেন। এরপর জিমনাস্টিকস, লাঠি খেলা, ছুরি খেলা ইত্যাদি আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের প্রিয় অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে। এসব খেলার মধ্য দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে এক একজন কঠিন, কঠোর বিপ্লবীতে রূপান্তরিত হতে থাকি। আমাকে একদিন শ্রী চারু বিকাশ দত্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। তিনি তখন চট্টগ্রাম অনুশীলন কেন্দ্রের একমাত্র নেতা ছিলেন। অন্যদিকে আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন ঋষি অরবিন্দ ঘোষ, বারীণ ঘোষ প্রমুখ বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ। তবুও একদিন আমি চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত শ্রী মতিলাল রায়ের প্রবর্তক সংঘের সাথে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু তাদের শিল্পবান্ধব বাণিজ্যিক কর্মসূচি এবং কথিত অধ্যাত্মবাদ আমাকে রীতিমতো অস্থির করে তুললো। ফলে আমি শ্রী ঘনশ্যাম দেওয়ান, মহেন্দ্র বড়–য়া এবং চারু বিকাশ দত্তের বৈপ্লবিক জীবনদর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম গান্ধীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে সুস্পষ্ট কোনোরূপ পার্থক্য না বুঝেই। বিপ্লবী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে দেখা হয়েছিলো বলে আমি এখনও খুব গর্ব অনুভব করি। ১৯৩০ সালের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম শহর পরিদর্শনে এলে ‘যাত্রা মোহন সেন’ হলে তাঁর সাথে আমার প্রথম মোলাকাৎ হয়। আমার এখন স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, তখন আমি ভারতের স্বাধীনতার জন্য অহিংস পন্থার চেয়ে সহিংস পন্থায় সেটি অর্জনের প্রতি বেশি অনুরাগী ছিলাম।


(চলবে)




লেখক: jummovoice


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):