JUMMOVOICE





পার্বত্য চট্টগ্রাম: জুম্ম জাতীয়তাবাদ ধ্বংসে রাস্ট্রের পায়তারা


বাংলাদেশ, বিশ্ব মানচিত্রের বুকে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত নৈসর্গিক তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান মিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান যার দুদিকে রয়েছে প্রতিবেশী রাস্ট্র ভারত ও মায়ানমার। পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে তেরো টি জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক বৈচিত্রের মেলবন্ধন। এই তেরোটি ভিন্ন ভাষা, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠীর মানুষগুলো শত বছর ধরে জুম্ম জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে সুখে দুঃখে হাতে হাত রেখে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই জুম্ম জাতীয়তাবাদ চেতনায় রাস্ট্র এবং প্রশাসনের নগ্ন থাবায় আজ ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রুতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ স্বাধীন বাংলাদেশের একটি অংশ। এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগণ উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের পূর্ব হতে নিজেদের স্বতন্ত্র দ্বারা বজায় রেখে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছিল। ব্রিটিশ ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এই অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম রেজুলেশন দ্বারা পরিচালিত হত যা ছিল একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভেঙ্গে দ্বি জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান নামক দুটি আলাদা রাস্ট্রের উদ্ভব হলে পার্বত্য অঞ্চলের বসবাসরত জুম্ম জনগণের জাতীয়তাবাদী চেতনার উপর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার হতে শুরু করে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত অনির্বাচিত সকল সরকার জুম্মদের উপর বৈষম্য ও নিপীড়ন করে আসছে যা এখনও সমভাবে চলমান।

পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর জুম্ম জাতীয়তাবাদের উপর প্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদের আঘাত হানে বাহাত্তর সালে প্রণীত ও তৎকালীন মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত সংসদে পাসকৃত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বাঙালি জাতিসত্বা ব্যতীত সমতল ও পাহাড়ে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষীর সকল জাতিসত্বার অস্তিত্ব সম্পূর্নরুপে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে। তারই পরিক্রমায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভাষাভাষীর তেরোটি জুম্ম জনগোষ্টি সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে। দুই যুগ সরকারী বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশী বিদেশী বিভিন্ন পক্ষের মধ্যস্থতায় শত শত নাম না জানা শহীদ ও মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ৯৭ সালে ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়। যার ফলে বন্ধ হয় দীর্ঘ দু যুগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের। জুম্ম জনগণ সমৃদ্ধ ও সুখের পার্বত্য চট্টগ্রামের আশায় অস্ত্র সমর্পন করে চোখে মুখে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ফিরে।

কিন্তু না, যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে জুম্ম জনগণ সরল মনে সরকারের সাথে চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল সেই চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকার একের পর এক জুম্ম জনগণের অস্তিত্বের পরিপন্থী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে থাকে, যা সম্পূর্ণ পার্বত্য চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক।সরকার ও প্রশাসন চুক্তির পর থেকে অধ্যবধি জুম্ম জনগনের সাথে যেন ইঁদুর বিড়াল খেলা খেলে যাচ্ছে ফলে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত ঝড়ছে রক্ত, হচ্ছে ভাইয়ে ভাইয়ে ভেদাভেদ। সরকার রাস্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে জুম্মদের কিছু সুবিধাবাদী অংশকে নিয়ে বিভিন্ন দল-উপদল তৈরি করে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের মাঝে এক আতংকের পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে। সাথে সরকার দলীয় জুম্মদের ব্যবহার করে জাতিগত বিবাদ তৈরি করছে, ফলশ্রুতিতে পাহাড়ে বসবাসরত তেরোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস, দ্বন্ধ প্রকাশ্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই দ্বন্ধকে কাজে লাগিয়ে সরকারী বাহিনী ব্যারাকে ফেরার বদলে পাহাড়ে তাদের শাসন দিন দিন আরো পাকাপোক্ত করছে। সহজ সরল নিরক্ষর জুম্ম জনগনকে বিভিন্ন লোভ-লালসা ও ভ্রান্ত স্বপ্ন দেখিয়ে জাতিগত ঘৃণার বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, ফলে জাতিগত বিদ্বেষ প্রকট আঁকার ধারণ করেছে, যা জুম্ম জনগোষ্ঠীর জন্য এক অশনি সংকেত। অন্যদিকে নিজের আখের গোছাতে কিছু জুম্ম জেনেশুনে সরকারের জুম্ম জাতীয়তাবাদ ধ্বংসে এসব ঘৃণ্য কর্মকান্ডে নিজেদের জড়িয়ে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্মদের বসবাসের অযোগ্য একটি ভুমিতে রুপান্তরের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

এখনো সময় আছে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার, সময় আছে পুনরায় ঘুড়ে দাড়ানোর, সময় আছে নিজেদের আরেকবার ঝাঁকিয়ে নেওয়ার। তবে এসবের মূলে অবশ্যই দরকার পুনরায় জুম্ম জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ হওয়ার। মনে রাখতে হবে বিচ্ছিন্ন ভাবে আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন মুক্তি সম্ভব নয়, তবে ধ্বংস সম্ভব। রাস্ট্র যন্ত্রের সকল পায়তারা ভেদ করে জুম্ম জাতীয়তাবাদী চেতনায় পুনরায় গর্জে উঠার মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগনের মুক্তি নিহিত।

লেখক: Mong


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):