JUMMOVOICE





"তোমাদের ভালোর জন্য করতেছি"


মানুষ স্বভাবতই জেনোফোবিক। অর্থাৎ নিজ গোত্রের, নিজ ধর্মের লোক ছাড়া অন্য গোত্রের বা ধর্মের লোক খুব একটা ভালো চোখে দেখতে না পারায় জেনোফোবিক। আর দেখতে পারলেও সন্দেহের চোখে দেখে।
ঢাকাশহরে যদি হঠাৎ আদিবাসী লোকের সংখ্যা বেড়ে যায়, আপনার মনে খুঁতখুঁত করবে। এতো উপজাতি (স্থানীয়দের ভাষায়) কোত্থেকে এলো। ঠিক যে কারণে কোন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় যদি খ্রীষ্টান লোকের সংখ্যা বেড়ে যায় ওরা সন্দেহের চোখে দেখবে। রহস্যভেদ করার চেষ্টা করবে। ঠিক এ কারণে কোন অফিসের বস যদি উত্তরবঙ্গের লোক হন, কিছুদিন পর উক্ত অফিসে উত্তরবঙ্গের স্টাফ বাড়ানোর সম্ভাবনা থেকে যায় এবং অফিস উত্তরবঙ্গময় হয়ে যাবে।
আপনি এটাকে অঞ্চলপ্রীতি বা স্বজনপ্রীতি বলতেই পারেন। কিন্তু সেটা অফিসের বস বা ওই ধর্মাবলী বা গোত্র লোকের দোষ নেই। মানুষ মাত্রই কমপোর্ট জোনে থাকতে পছন্দ করে। সে তার নিজ ধর্মের বা নিজ এলাকার ভাই ব্রাদারদের প্রতি যেভাবে খবরদারি করতে পারবে অন্য ক্ষেত্রে তা অসম্ভব হতে পারে। আমাদের ডিএনএ'র গভীরে যে আমরা ভার্সেস তোমরা বলে একটা ব্যাপার আছে, সেই ভূগোলের অংশে আমরা পড়ি। সাথে তার এলাকার আপন লোকজন। এর বাইরের পৃথিবী তার কনসার্নের মধ্যে পড়েনা।

সুদানে Dinka নামে একটা জাতিগোষ্ঠী আছে, ওদের ভাষায় Dinka মানে মানুষ। তারমানে এর বাইরে আর কেউই মানুষের সংজ্ঞায় পড়েনা। Dinka-দের চিরশত্রু হলো Nuer জনগোষ্ঠী। নয়ারদের ভাষায় Nuer মানে হচ্ছে আসল মানুষ। সুদানের সভ্যতা হতে বহুদূরে আলাস্কায় ইয়াবাক জনগোষ্ঠীর বাস। ইয়াবাক জনগোষ্ঠীদের মতে ইয়াবাক অর্থও প্রকৃত মানুষ, সো হোয়াট? এ পর্যায়ের জেনোফোবিক মানুষ কিভাবে সাম্রাজ্যের জন্ম দিলো? সেটা নিশ্চয় ভাববার বিষয় এবং আলোচনা সাপেক্ষ। তবে খুব সিম্পল যে সভ্যতা জন্ম নিয়েছিল অন্যায় আর রক্তপাতের হাতের তালুর মধ্য দিয়ে।

আমেরিকা যখন ইরাক বা আফগানিস্তান আক্রমণ করে তখন নিজেদের কাজকর্মকে জাস্টিফাই করার জন্য আমেরিকার বড় কর্তাবাবুরা বলে যে, তোমাদের ভালোর জন্য আমরা এটা করতেছি। তোমরা দোস্তো, শয়তান তাই দমন করা দরকার, সভ্য কি জিনিস বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। অপরদিকে যে হাসপাতাল, বিদ্যালয়ে বোমা পড়ছে, শিশু এতিম হচ্ছে, মানুষ গৃহহীন হয়ে যাচ্ছে এগুলি সব স্থূল দর্শন।

"তোমাদের ভালোর জন্য করতেছি" শাসকদের স্ক্রিপ্টে এটা নতুন কোন বিষয় নয়। বেশ পুরনো। রোমানরাই মনে করতো সভ্যতায় একমাত্র তারাই সেরা, একমাত্র তারায় সভ্যের আলোতে বাস করছে। যারা এ সভ্যতার স্বাদ পায় নি তারা অন্ধকার জগতের মানুষ। এদের অন্ধকার হতে সভ্য আলোতে আনার জন্য রোমান শাসনের অধীনে রাখাটা খুব জরুরি। বরং যারা বেঁচে আছে তাদের রোমান শিক্ষায়, রোমান সংস্কৃতির আদলে গড়ে তোলা খুব দরকার। অন্যথা যে অসভ্য ও বর্বর জাতি হয়ে রয়েই যাবে।

এখানে একটু থামুন, রোমান শাসনের সাথে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের শাসন, শোষণের চিত্র মিলে কিনা মিলিয়ে দেখুন। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার মতো বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু বাঙালি এটা বলে কিনা যে আদিবাসীদের (তাদের ভাষায় উপজাতি) সভ্য করার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী যা করছে তা ভালোই করছে। তাদের শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে পুজ ইন হওয়ার ফলেই তোমরা (পাহাড়িরা)সভ্য হচ্ছো। আগে অনেক বেশি অসভ্য ছিলে, এখনো আছো। অর্থাৎ বাংলাদেশে বাঙালি জাতি সভ্যতার আলো দেখেছে এবং স্বদেশে বসবাস করা অপরাপর ৪৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী তা দেখেনি এবং অন্ধকার জগতেই আছে। তাই অন্ধকার হতে সভ্য জগতে আনার জন্য রাষ্ট্রীয় ভাবে তাদের (বাঙালি) নৈতিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্র চাইলেই নির্দিষ্ট এলাকায় সামরিকতন্ত্র জিইয়ে রেখে অসভ্য মানুষদের সভ্য করার নৈতিক দায়িত্বে পড়ে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক, নারী সহিংসতা বৃদ্ধি পাক, পাহাড়ি ভূমিহীন হোক সেটা মূখ্য বিষয় নয়, সেটা স্থূল দর্শন মাত্র। আমরা যা করতেছি তোমাদের ভালোর জন্য করতেছি, সমস্বরে রাষ্ট্র ও সংখ্যাগুরু বাঙালি তাই বলে।

নিজ সভ্যতাকে সে ছড়িয়ে দেয় বটে। পরাধীন জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সভ্যতাকে দৈনিক ব্রাঞ্চের সাথে হজম করে ফেলে সে। আবার পরাধীন জনগোষ্ঠীর কেউই যদি সভ্য হয়ে ওঠে, তাকে সেই সভ্যতার সার্টিফিকেট দিতেও চরম অনীহা। সব তোমাদের ভালোর জন্য করতেছি, এর আড়ালে হচ্ছে বন্দুকের নলে আপনাকে দাবিয়ে অসভ্য বলে জায়েজ করা। কারণ আপনি সভ্যতার জন্মের উৎস রক্তপাত ও অন্যায়ের শৃঙ্খল ভাঙতে চান। আর সেটায় আপনার অস্যভতা।

লেখক: milinda


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):