JUMMOVOICE





একটি পাহাড়িয়ার গল্প [১]


শান্তশিষ্ট বয়ে চলে কর্ণফুলী নদী। সেই নদীর পাড়ে ধানক্ষেত। ধানগাছ গুলি এখনো শিশু। সেই শিশুধান গাছের পাশে একটা ঘর। মাটি দিয়ে গড়া ঘরটি আর মাথায় দেয়া ছনের চাল। ঘরটির মালিক বর্তমানে মংচিং এর। দূর থেকে ঘরটিকে যতটা জীর্ণ লাগে কাছে গেলে ততটাও নয়। ঘরের ভেতরই আরো তিনটা রুম। একটাতে থাকে মংচিং এর মা। বয়স ৫২। অন্য ঘরে মংচিং ও তার বউ। অন্যদিকে অর্থাৎ বারান্দায় তার ছেলে হ্লামং। তাদের দু'টো খাট। তিনটা চেয়ার। একটা ভাঙ্গা চোরা পাক ঘর। পাক ঘরের পেছনেই গরুরাই থাকে। ঘরের পাশে রয়েছে বিশাল অাকৃতির গাছ। যেখানে সন্ধ্যায় পাখিদের মেলা বসে। ঝগড়া বিবাদ ও হয় প্রতিদিন। জানা অজানা অনেক পাখিদের আশ্রয়স্থল ছিল গাছগুলি। মংচিং পাহাড় থেকে বঃ বঃ টিঃ টিঃ করে নামিয়ে আনে গরুদের। নামিয়ে আনে সন্ধ্যা। কলহ বাঁধে পাখিদের। মেপ্রু ধানক্ষেত থেকে ফেরে ঘরে। হ্লামং গ্রাম থেকে হু হু করে ছুটে আসে ঘরে। মংচিং এর মা হাতের মুঠোয় চাল নিয়ে টেহ্ঃ টেহ্ঃ কইরা ডাকে মুরগীদের খাওয়াতে।

একদিন মংচিং তার ১৪ টা গরু নিয়ে ঘরে ফেরার কালে সেই এক সাপের সাথে দেখা। মাইরা নিয়ে এলো ঘরে।

গোয়ালে গরু গুলিকে বাঁধতে বাঁধতে তার বউ মেপ্রুকে বলেঃ-

" উঠোনে একটু আগুন জ্বালাইয়া দাও তো! চোখে না পড়লে আজ ত আমি জঙ্গলে পইড়া থাকতাম। "

বউ এর দিকে সাপটা বাড়াইয়া দিয়া তার ছেলেরে ডাক দেয়...
হ্লামং... হ্লামং...হ্লামং

হ্লামং এর বয়স ১৩।হ্লামং প্রতিদিন গ্রামের দিকে যায় খেলতে তার বন্ধুদের সাথে। হ্লামং দূর থেকে ফারাহ্ বলে সাড়া দেয়।

মেপ্রু, হ্লামং আসুক বলে উঠোনের পাশে শুক্না বাঁশের উপর থেকে লুঙ্গিটা নিয়া গেল নদীতে। এরই মধ্যে হ্লামং ঘরে এসে সাপটার মাথা ফেলে পোড়া শুরু করেছে।

মেপ্রুর শাশুড়ি খেক খেক কাশতে কাশতে কইল "আদা বাড়াইয়া দাও। নয়লে গন্ধ করবে। মংচিং পেটে থাকতে একবারই খাইছিলাম। তোমার স্বর্গীয় শুশুর মাইরা আনছিল। ঝালে আমাদের দু' চোখ জলে ভাইসা গেছিল। এই কথাগুলো মনে পড়তেই বুড়িটার চোখ বেয়ে জল নামে। সেই জল হাত দিয়ে বেশিজোর ধোয়া যায়, মোছা যায়। কিন্তু কান্নাকে বেদনাকে সে কোনো ভাবে সরাতে পারে না।

সন্ধ্যা হতে রাতে ধাবিত হলো। রাত হলে পোকামাকড় ডাক দেয়। সেই ডাক ছুটে আসে বন থেকে। ঝোপ থেকে। অন্ধকারে একা একা পিদিম জ্বালিয়ে মেপ্রু এক চুলোয় ভাত রাঁধে অন্য চুলোয় ভাজে মরিচ। এই মরিচের ঝাঁজে মেপ্রুর গলা থেকে বেরই কাশি। যেন তার শাশুড়ির সাথে চলছে কাশির প্রতিযোগিতা অথবা মেলাচ্ছে তাল। সে তালে তালে ভাজা পোড়া পর্ব শেষ করে বাটা শুরু করে মেপ্রু।

মংপ্রু দ্রুত শীত কাপড় পড়ল। হাতে দাঁ আর মুখে তামুক নিয়ে নেমে পড়ল সাপ কুটার কাজে। খটখট করে কাটল সাপ। সেই সাথে টানে তামাকও। মুখ থেকে ধোঁয়ার পাশাপাশি বের হয় থুতু। হ্লামং উৎসাহ ভরে ঢালে পানি। তার বাবাও পরিষ্কার করে গামলায় সেই পানিতে।

উঁচু উঁচু পাহাড়ের কোলে নদীটার তীরে জন্ম নেয় ঝগড়াবিল। নেয় বললে ভুল হবে। ঝগড়াবিল নাম দেয় সেখানকার পাহাড়িরা। শোনা কথা, সেখানে একটা বিল ছিল। বিলে ছিল ভরা মাছ। সেই মাছ ধরতে গিয়ে মানুষের সাথে মানুষে হয় বিবাদ, ঝগড়া। এই ছিল ঝগড়াবিলের নাম করণের কারণ। শান্ত একটা গ্রাম। শিশুর মতনই গ্রামটার চেহারা। চরিত্রে বসন্ত বাতাসের মতন। যেন গ্রামটা একটা স্বর্গ। সাক্ষাৎ অপ্সরী এসে যেন আদর করেছে, বড় করেছে, লালন করেছে। যতদূর চোখ যায় ততদূর পানি, ততদূরই ক্ষেত খামার। হাওয়ায় হাওয়ায় বয়ে বেড়ানো শান্তি বার্তা। মাছের ভারে যেন নদীটার পাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে। ধানের ভারে নুয়ে পড়ছে ক্ষেত। রাত নামলে ঘরের উঠোনে উঠোনে জ্বলে আগুন। পোড়ানো হয় সেমি আলু। বাচ্চারা সকলেই মিলে সেই আলু তুলে আনে বন থেকে। সেই আলু মুখে নিলে বুড়ো বুড়িদের মুখ হয়ে ওঠে জীবন্ত কথার একেকটা কারখানা। আর বাচ্চাদের কান যত খাড়া হয় তার থেকেও খাড়া থাকে মনোযোগ। বড়দের জমে মদের আসর। এই ঝগড়াবিল থেকে আধা কিঃমিঃ দূরেই মংচিং এর ঘর। ঘর সামান্য দূরে হলেও সামাজিকতায় এক। তার বাবা কেন সেখানে ঘর বেঁধেছিল মংচিং জানে না। জানার প্রয়োজনও মনে করেনি সে। তারা দু' ভাই, বোন নাই। মংচিং ছোট ছেলে। মংচিং তার মায়ের পেটে যাওয়ার পূর্বে তার বড় দাদা হ্লাপ্রু দুনিয়াকে বিদায় দিয়ে অন্তিমের পথে পাড়ি দিয়েছিল।

মংচিং ধুয়ে তুয়ে মাংসটা দিয়া গেল বউ এর কাছে। মশালটা তুলে আগুন জ্বালালো মংচিং। সেটা দেখে মেপ্রু বললঃ--
" সারারাত খাওয়ার লাইগা তোমার জন্যে অপেক্ষা করতে পারমু না। পরে খাবার ঠান্ডা হয়লে মদ খাইয়া চিল্লাইতে পারবা না। "
ক্ষুধা পাইলে খাইয়া নিবা। আমার লাইগা বইসা থাকা দরকার নাই বইল্লা মংচিং তামুক টানতে টানতে গ্রামের দিকে চইল্লা গেল।

গ্রামের দিকে গিয়া সুইমং এর ঘরের দরজায় ডাক দিল। সুইমং বাইর হইয়া দেখে মংচিং রে।

একজন পলাতক সৈনিকের মতন কইরা ঢুইক্কা পড়লো ঘরের ভিতরে। যেন তার পিছনে তাড়া করছে পুলিশ৷ সুইমং দুই ছেলের বাপ। বড় ছেলেটার নাম উমং। হ্লামং এর খেলার সাথী। ছোট ছেলেটা সুইখ্যাং। মেহ্লা সুইখ্যাং কে কোলে নিয়া পইড়া ছিল পিদিমের কাছেই।
" খাওয়া হইলো নাকি দাদা?
না রে! গিয়া খামু।
আমারে এক আধা মদ দে রে। মদ তোলার দিন হয়নাই আমাদের। দুই দিন লেগে যাবে বইল্লা বইসা পড়লো পাটিতে। "

মেহ্লা পিদিমটা সুইমং এর দিকে বাড়াইয়া দিয়া বলল,
নাও, গিয়া একটু দাও। সুইমং পিদিমটারে নিয়া গেল পাক ঘরে। মেহ্লা বলে উঠলো শুনছ? "কি?"
পাতিলে অল্প কইরা মাছ বাইচ্চা আছে মনে হয় বইল্লা সুইখ্যাইং রে শুইয়া দিল বিছানায়।

ফেরার কালে সুইমং পাক ঘর থেইক্কা নিয়া আয়লো এক আধা মদ লগে আনলো বাতি ভরা খাল থেকে কুড়ানো মাছ। সব মাছই ছোট হলেও স্বাদে অনেক বড় এই মাছ গুলি।

মংচিং অল্প মদ অাঙুলে ঢেলে পিদিমের আগুনে ডুবিয়ে দিয়া মদের তেজ যাচাই করলো। ফুঁ দিয়া নিভাইয়া দিল জ্বলন্ত অাঙুল টারে। এক প্যাগ বানাইয়া বাড়িয়া দিল সুইমং এর দিকে।

"অাহা! ভাত খাওয়ার পর মদ নেয়া আমার কাছে অনিরাপদ লাগে বইল্লা সুইমং ঢাইল্লা দিল গলায়। গলা দিয়ে বয়ে গেল সেই গুণগত মদ। লগে লগে বাতি থেকে মাছ তুইল্লা মুখে দেয়। "

ঘরের পেছনে শুইয়া ছিল দুইটা কুকুর। চোর ডাকাতের ভয় কারোর ছিল না। সেই কুকুর দু' টা হঠাৎ ঘেউ ঘেউ কইরা ডাক তুললো। সঙ্গে সঙ্গে চেটে উঠে মেহ্লা।

"আমি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পাহাড় কেটে জুম ক্ষেত করেছি। এখন বান্দরে সব সাবাড় কইরা ফেলতাছে। এই বান্দর তাড়াইতে গিয়া আমার পায়ের ঘাম মাথায় পইড়া যাচ্ছে। এই কুকুর গুলারে খাবাইয়া লালন পালন কইরা লোকসান হয়েছি। ঘরে এলে যত বকবক! বনে গেলে তাগো মুখ কি তখন ভোদা হইয়া যায় বইল্লা খুইঃ খুইঃ কইরা দমগ দেয়।"

"মংচিং মুচকি হাসতে হাসতে বোতল তুলে মদ ঢালে গ্লাসে। বাবা থাকতে ত মা নদীতে গিয়া পুঁজো করতো। বান্দর কাউরে না কি দরাই না, মানে না। কেবল জলদেবী অর্থাৎ স্বরস্বতী কে মানে। কাল সকালে দু' মুঠো ভাত খরচ কইরা দেখ। দু' মুঠো ভাতের বিনিময়ে গোটা একটা জুমক্ষেত রক্ষা পাইলে ক্ষতি কি?"

মদ গিলে অল্প একটু মাতাল হলো। উঠে দাঁড়িয়ে সুইমংদের বিদায় তিদায় জানাইয়া হেলেদুলে ফেরত আসে নিজ ঘরে। ঘরে ঢুকে দেখে সকলেই খেয়ে দেয়ে ঘুম। তার আর সাহস হয়লো না কাউরে ডাকা। নিজেই পাক ঘরে গিয়া খেলে সাপ দিয়া ভাত। একা একা খেতে তার অপছন্দ। মাংসটা স্বাদ হলেও তেমন স্বতস্ফূর্ত হইয়া খেতে পারলো না সে। অল্প ক'টা ভাত খেয়ে দিল এক শান্তির ঘুম।

বাপের ভিটায় দশ হাঁড়ি ধান লাগিয়েছিল। নিজের একটা ছেলে থাকার শর্তেও রোপন করা প্রত্যেকটা ধানগাছকে নিজেদের সন্তান মনে কইরা যত্ন নিতে লাগলো, আদর করতে লাগলো। ধান গাছ দুধ খেলে প্রথমে সে তার বুকের স্তন খুলে খাওয়ায় দিত। দুধ পাওয়া না পাওয়ার কথা পরে। প্রতিদিন সকাল সকাল উঠে গোওয়ালে গিয়ে ঝুড়িতে করে গোবর সংগ্রহ করে। গোবর ভরা ঝুড়ি নিয়া ক্ষেতে যায়। সেই পুষ্টি ভরা গোবর হাতে করে ছিটাইয়া ফেলে ক্ষেতে। গোবর পেয়ে ধানগাছ গুলি যখন বাতাসে দোল খেয়ে যায়ত তখন মংচিং ও দোল খেয়ে যেত মহা আনন্দে।

সকালের সোনালী রৌদ এসে যখন ধানের গায়ে লাগে তখন মংচিং এর অনুভব হয় যেন তার হৃদয়ের ডান পাশে কেউ স্পর্শ কইরা যাচ্ছে। জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। ধানগাছ গুলি ধীরে ধীরে প্রানবন্ত হয়। তার মনে হয় ধান গাছ গুলি যেন তাকে আব্বা আব্বা কইরা ডাকছে। হাটতে জানলে এতোদিনে কোলে উঠতে চাইত। চা বিষ্কুট খেতে চাইত। যখন ক্ষেতের ভেতর গিয়া ময়লা তুলে তখন মনে হতো যেন তার সন্তানের পায়াখানা নিজেই পরিষ্কার করছে, পায়ুপথ ধুয়ে দিচ্ছে। যেন সে তার সন্তানের হাতে পায়ের নখ কেটে ফেলছে। তাতে করে গাছগুলিও হাসত। সে এক অমায়িক হাসি। একমাত্র যে হাসি মোনালিসার হাসিকে হার মানাতে পারে। সেই হাসির মুখ নাই। কিন্তু হাসির ছোঁয়া লেগে আছে তার চিহ্ন গায়ে নাই। যা আছে সবই ভিতরে। সেই হাসিকে কেবল মংচিং দেখতে পারতো, অনুভব করতে পারতো।

মেপ্রু যখন ক্ষেতে আসে তখন দুপুর হয় হয়। সূর্য তখন মাথার উপরে দাঁড়িয়ে হয় বকাবকি করে নয়ত এক মনে ধ্যান করে।

চলমান...



লেখক: aongmarma


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):