জুমঘর সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপ্রতিরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ব্লগ বিষয় ভিত্তিক আর্কাইভ chtbd.org মাল্টিমিডিয়া জুম্ম সংস্কৃতি





জুম পাহাড়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়-ধ্বসের সম্ভাবনাঃ আমাদের ব্যক্তিগত অসহায়ত্ব এবং রাজনৈতিক প্রস্তুতি লেখক- ধীমান ওয়াংঝা


জুম পাহাড়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়-ধ্বসের সম্ভাবনাঃ আমাদের ব্যক্তিগত অসহায়ত্ব এবং রাজনৈতিক প্রস্তুতি

???????? বন্ধুগণ, আমার বন্ধু তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া 'দ্বি' নামের বন্ধুটির কয়েকটি পোষ্ট দেখে এই ক’টি লাইন লিখতে অনুপ্রাণিত হলাম। মূল কথা হলো, এখন আমাদের প্রাণপ্রিয় জুমপাহাড়ে উপর্যুপরি বর্ষণে পাহাড়ধ্বসের সমূহ সম্ভাবনাসহ জনজীবন একপ্রকার বিপর্যস্ত। আমি নিজেও এখন আমার গ্রামের কারো সাথে কথা বলছি না, যদিও নানান মাধ্যমে তাঁদের খোঁজখবর নিয়মিতভাবে রাখছি। কারণ, ফোন করলেই তাঁরা আমাকে তাঁদের বিপর্যস্ত জীবনের তথা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা শোনাবেন এবং সাহায্য চাইবেন। আশা করি, সৌভাগ্যক্রমে দেশের রাজধানীসহ অন্যান্য প্রধান কয়েকটি নগরে বসবাসরত অধিকাংশ জুম্ম ভ্রাতা-ভগ্নীর অবস্থাও এখন এই অধমেরই অনুরূপ। তাঁরাও নিশ্চয় এখন কাকে ছেড়ে কাকে সামলাবেন, এমন এক হযবরল অবস্থায় পড়েছেন, যা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রয়োজনীয় বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, এর দায় তো আসলে সরকারের তথা রাষ্ট্রের। এর জন্য আমাদেরকে (ব্যক্তিবিশেষকে) কেন উদ্বিগ্ন, বিচলিত, উদ্ভ্রান্ত হতে হবে?

???????? প্রশ্ন হলো, আমরা আদিবাসীরা কেন আজ এহেন একটি বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়লাম? আমার শৈশব জীবনে দেখেছি, বৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি হলেই বরং আমার গ্রামবাসীরা অত্যন্ত খুশি হতেন। কারণ, বন্যা হলে ঘরের আঙিনার আশপাশের নালা, পুকুরে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। আমরা দলবেঁধে সেসব মাছ ধরতে যেতাম। বন্যা পরবর্তী নতুন পলিতে ভরপুর আবাদি জমিগুলোতে অনেক শস্য, ফসল ফলতো। কিন্তু ১৯৮০ সাল পরবর্তী সময় থেকে সেই সুখ ও সুদিন আদিবাসীদের জীবন থেকে উধাও হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় মদতে ও ব্যবস্থাপনায় প্রায় চার লাখ নতুন বসতকারী তথা বাঙালি সেটেলার (স্থানীয় ভাষায় ‘জাপানী বাঙাল’) পাহাড়ে ঢুকেছে। তাঁরা নিজেদের গৃহস্থালির চাহিদা তথা বাস্তব প্রয়োজনে নির্বিচারে পাহাড়, প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছে (এখন যেমন রোহিঙ্গারা করছে)। আদিবাসীরা যেখানে নিজেদের প্রকৃতি-বান্ধব আদি জ্ঞান দিয়ে এতোদিন পাহাড়কে আগলে রেখেছিলো, সেই পদ্ধতি পরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষনায় অভিবাসিত সেটেলার বাঙালিদের হাতে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। তারা নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থে নির্বিচারে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনজ সম্পদ যেমন ধ্বংস করেছে, তেমনি সমতলের আদলে পাহাড়ের নানান স্থান/অঞ্চল/বনভূমিকে কেটে সমান্তরাল করে বসতিস্থান বানিয়েছে। আর এখন অতিবৃষ্টির কারণে মূলত পাহাড়ের সেসব অঞ্চলেই সর্বাধিক ভুমিধ্বস হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আশপাশের পাহাড়ি/আদিবাসীরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

???????? এটি স্থানীয়ভাবে প্রশাসনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা, উন্নাসিকতা এবং গণজীবনের কল্যাণে তাদের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্ত্ব ও দায়বদ্ধতা প্রতিপালনে ব্যর্থতার একটি দৃষ্টান্ত তো বটে। আর এই প্রক্রিয়ার সাথে পাহাড়ের/আদিবাসীদের কিছু নেতৃবৃন্দও যে জড়িয়ে আছেন, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এই পাহাড়িরা/আদিবাসীরা সরকার এবং অ-সরকার দুই দলেই রয়েছেন। কিন্তু আধুনিক যুগের বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা, রিনিউঅ্যাবল এনার্জির ব্যবহার, কনজিউমারিজম তথা ভোগবাদের লাগাম টেনে ধরা প্রভৃতি আধুনিক ধারণার সাথে তাঁদের কোনরূপ সংযোগ বা পরিচয় আছে কিনা সে ব্যাপারে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। কারণ, এইবিধ সচেতনতা থাকলে আমরা নিশ্চয় নিজেদের মধ্যে মারামারি করতাম না। আগামী ৫০-১০০ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর উপকূল ঢাকা শহরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসবে বলে অনেকে ভবিষ্যৎবাণী করছেন। অন্যদিকে হিমালয় পর্বত এবং উত্তর মেরুর বরফ এমন দ্রুতগতিতে গলতে শুরু করেছে যে, বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও বহুগুণ দ্রুতলয়ে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ পৃথিবীর উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা এখন সর্বজনবিদিত।

???????? তাই এহেন প্রেক্ষাপটে আমাদের জুম্মদের জন্য করণীয় কী, সে ব্যাপারে গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমি মনে করি না, ‘এদ মারিম, দাত সারিম’ পদ্ধতিতে আমাদের বিশেষ কিছু সুফল অর্জিত হবে। এই পদ্ধতিতে বিগত তিন দশকে যা অর্জিত হয়েছে সেই পদ্ধতি এখন নিজেই এক অথর্ব, অঘা জুম্মর নির্বিষ রণহুংকারে পর্যবসিত হয়েছে, বিগত প্রায় এক দশক ধরে। তাই টেকনিক বা কৌশল বদলাতে হবে। আপনি যদি নিজের জুম্ম জাতিকে সত্যিই ভালোবাসেন, জাতির কল্যাণে নিজেকে সত্যিই উৎসর্গীকৃত দেখতে চান, তবে জাতি উদ্ধারের সেই পথ ও কর্মপন্থা নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন। আর বিশ্বের তথা দক্ষিণ এশিয়ার চলমান ভূ–রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে বা উপেক্ষা করে জুম্ম জাতির মুক্তি যে কখনো সম্ভব নয়, সে বিষয়টি আমাদের সকলের স্মরণে রাখা উচিৎ। আশা করি, আপনারা সেটি জানেন এবং এই ভূ-রাজনীতির তাৎপর্য বোঝেন।

???????? সংক্ষেপে বলিঃ অবাধ জ্ঞানচর্চা, তথাগত বুদ্ধের মধ্যম পন্থার রাজনীতির মাধ্যমে জুম্ম জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা, আধুনিক কালের বিশ্ব–প্রকৃতি ও ভূ–রাজনীতির হাল-হকিকত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা, আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে নৈমিত্তিক কাঁটাছেঁড়া, রাজনৈতিক প্রজ্ঞাদীপ্ত দূরদর্শী জাতীয় নেতৃত্ব, শিক্ষা ও অর্থনীতির অবাধ অগ্রযাত্রা, জুম্মদের আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি, বিশ্বের ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতির খেলোয়াড়দের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা প্রভৃতিই হবে আগামীতে আমাদের জুম্মদের জন্য প্রকৃত রক্ষাকবচ।



লেখক: Jummoblogger


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):