জুমঘর সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপ্রতিরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ব্লগ বিষয় ভিত্তিক আর্কাইভ chtbd.org মাল্টিমিডিয়া জুম্ম সংস্কৃতি





বন্ধুদের জন্য দু’টি ছিন্নপত্র লেখক- ধীমান ওয়াংঝা



বন্ধুগণ,
পুরনো একটি ডায়েরির প্রায় অস্পষ্ট দু’টো ছিন্নপত্র খুঁজে পেলাম। খুব সম্ভবত ১৯৮৭-৮৮ সালে লেখা হয়েছিলো। তখন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলাম। যৎসামান্য জ্ঞানচর্চার অভ্যাস ছিলো বলে এখন বেশ শ্লাঘা অনুভব করছি। ভালো কিছু নজরে এলেই ডায়েরিতে টুকে রাখার অভ্যাস ছিলো, যা এখন হারিয়ে ফেলেছি। আলোচ্য দু’টি ছিন্নপত্রে আমার সেই পুরনো জ্ঞানচর্চা তথা ‘আলোকচিত্র’ এবং ‘ইংরেজি সাহিত্য’ বিষয়ে জানার আগ্রহ পরিস্ফুট হয়েছে। প্লিজ পড়ে দেখুন। আশা করি, আমার এই দুই ছিন্ন পৃষ্ঠা পড়ে উপরোক্ত বিষয়ে আপনাদের অনুসন্ধিৎসাও কিছুটা প্রশমিত হবে।

১। আলোকচিত্র

পৃথিবীর তাবৎ শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে আলোকচিত্র শিল্পও একটি শক্তিশালী নান্দনিক শিল্পমাধ্যম। আলোকচিত্রের আবিষ্কার এবং এর প্রসার শিল্পকলার জগতে নানামুখী, বিচিত্রবিধ প্রভাব রেখেছিল। প্রথমদিকে যদিও এটি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারমাত্র ছিল, পরবর্তীতে দেখা গেল আলোকচিত্র নিজেও ক্রমে হয়ে উঠেছে একটি স্বাধীন সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম। এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, ষষ্ঠদশ শতাব্দী থেকেই বস্তু ও দৃশ্যের আলোকচিত্র তৈরির নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আলোকচিত্র পরিষ্ফুটন প্রায় সার্থকতার পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং কারিগরি উন্নতির জন্য গবেষণার পাশাপাশি আলোকচিত্রের শৈল্পিক ব্যবহারও সেই প্রথম পর্যায় থেকেই শুরু হয়ে যায়। শিল্পজগতে এর সফল অগ্রযাত্রার কারণে এমন একসময় ছিল, যখন আলোকচিত্রকে চিত্রকলার এক শক্ত প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল। ফরাসী দেশে আলোকচিত্রকে বে-আইনি ঘোষণা করার একটি দাবি উঠেছিল চিত্রকরদের তরফ থেকে, যেখানে অ্যাঁগ্র (Ingress)-এর মতো বিখ্যাত শিল্পীও দাবিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু আলোকচিত্র এখন আর চিত্রকলার প্রতিযোগী নয়, বরং সহযোগী। ইমপ্রেশনিস্টদের আমল থেকে দেখা গেল, আলোকচিত্রের অনেক সুবিধাকে চিত্রকরেরা তাদের ছবিতে প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন। যেমন - চলমান বস্তুর সঠিক রূপ নির্মাণ, বিষয়কে অসচেতন ও তাৎক্ষণিকরূপে ধরা, বিভিন্ন কষ্টসাধ্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়কে দেখা ইত্যাদি। যে আলোকচিত্র শুরু হয়েছিল দৃষ্টিগ্রাহ্য বাস্তবের সাদা কালোর বিশ্বস্ত রূপায়ন হিসেবে, তা আজ বাস্তবতার পরিধি ছাড়িয়ে পরিস্ফুটনের নানান কৌশলের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কখনও শিল্পের প্রায় বিমূর্তরূপে পৌঁছে যাচ্ছে। রঙের প্রয়োজনীয়তা তাকে আরও বৈচিত্র্যের সুযোগ এনে দিয়েছে।

আধুনিক কালের আলোকচিত্র অন্য যে কোন সৃষ্টিশীল শিল্পরীতির মতোই শিল্পের একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন শাখা, যার সত্ত্বা ও বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ তার নিজস্ব। বর্তমানে বিশ্বব্যাপি আলোকচিত্র শিল্পীদের রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং কমনওয়েলথসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্যান্য বহু প্রতিষ্ঠান। একটি সাধারণ অবস্থা থেকে আলোকচিত্রকে যারা শিল্পোত্তীর্ণ মাধ্যমে পরিণত করেছেন তাদের মধ্যে হেনরী ফক্স, ট্যালবট, ফরাসী শিল্পী নাদার, পিটার এমারসন, স্টিগলিজ অবশ্যই স্মরণীয় নাম। নাদার-এর দ্যোলাক্রোয়ার প্রতিকৃতি কিংবা মায়ব্রিজ-এর ছুটন্ত ঘোড়ার ছবি এক্ষেত্রে পথিকৃৎ উদাহরণ। এই উপমহাদেশেও আলোকচিত্রের আগমণের সঙ্গে সঙ্গে এর শৈল্পিক প্রয়োগের প্রচেষ্টা দেখা যায়। এক্ষেত্রে লালা দীন দয়াল, জর্জ টমাস, ভরদ্বাজ, গোলাম কাশেম ড্যাডি, আমানুল হক প্রমুখ স্মরণীয় নাম। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পর এদেশে এক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা গ্রহণ করেন আমানুল হক, মনজুর আলম বেগ, নাইবউদ্দীন আহমদ, মনজুর আলম চৌধুরী, ডঃ নওয়াজেশ আহমেদ প্রমুখ। বর্তমান বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে যারা আলোকচিত্র শিল্পের সাধনা করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে ভারতের শ্রী বেনু সেন, সুধীর সাক্সেনা, কানাডার টম ওয়েব, হংকং-এর কে এইচ চিয়াং, লিন ডুং লেউং, থাইল্যান্ডের ডাকেন বুরানাবুনবাট, অস্ট্রেলিয়ার ওয়েলিংটন লী অবশ্যই বিখ্যাত কয়েকটি নাম।

২। ইংরেজি সাহিত্যের রূপরেখা

ক) এ্যালবিয়ন - প্রাচীন ব্রিটেনের নাম। পরে ‘ব্রিটন’দের নামানুসারে ব্রিটেন হয়। ব্রিটনরা ছিল ‘কেল্ট’ (Celt) বংশের মানুষ, যাদের ভাষা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীরই এক ভাষা।

খ) মার্টিন লুথার কিং, ক্যালভিন, স্কটল্যান্ডের জন নকস্ এরাই ছিলেন খ্রিস্টান ইউরোপের ধর্মশোধনের (Reformation) পুরোধা। তাদের বিদ্রোহে ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানী যুদ্ধবিগ্রহে দুই শতাব্দী ধরে বিধ্বস্ত হয়। আর ইংল্যান্ডে এই কাজটি করেছিলেন থিওডর বংশীয় রাজা অষ্টম হেনরী (খ্রীঃ ১৫০৯-১৫৪৭)।

রেনেসাঁসের আগমণের সাথে সাথে রাণী এলিজাবেথের সময়কাল থেকে ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিক যুগের সুত্রপাত। অবশ্য রেনেসাঁ ইংল্যান্ডের আগে প্রথমে ইতালীতে (বিশেষ করে চৌদ্দ ও পনের শতকে), পরে ফ্রান্সে এবং তারও পরে ইংল্যান্ডে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে (পনের ও ষোড়শ শতাব্দীতে) পদার্পণ করে। তখন ইউরোপের জ্ঞান, কর্ম ও ভাবজগতে যে বিরাট উদ্বোধন ঘটে তার উপর ভিত্তি করেই ইউরোপের পাশাপাশি সমগ্র পৃথিবীর আধুনিক যুগ রচিত হয়। কারণ ভারতবর্ষসহ অন্যান্য অনেক দেশের ‘নবজাগরণ’ ইউরোপীয় রেনেসাঁর ক্রমবিকাশের ধারায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, দেশ কালের প্রেক্ষিতে যা নানা বৈশিষ্ট্যে প্রকাশিত হয়। এক অর্থে আবার রেনেসাঁর তারিখ ধরা হয় ১৪৫৩ সালকে। ইংল্যান্ডের আগে মধ্যযুগে খ্রিস্টীয় ১৩০০-১৪০০ সালের মধ্যে ইতালীতে পেত্রার্ক ও বোক্কাচিওর মতো সাহিত্যিক এবং জিওত্তোর মতো শিল্পীরা এই জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন। মধ্যযুগের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশের মধ্যে যে পরবর্তীকালের বিরাট রেনেসাঁর বীজ লুকায়িত ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সাধারণভাবে রেনেসাঁ হচ্ছে জ্ঞানে, কর্মে ও শিল্প-সাহিত্যে সংঘটিত এক মহোৎসব। আর এর উদ্ভব ইতালী ও পশ্চিম ইউরোপে হলেও ইংল্যান্ডে রেনেসাঁর আবির্ভাব একটু বিলম্বে ঘটে। তবুও ইংল্যান্ডই তার দানকে পূর্ণতররূপে গ্রহণ করতে পেরেছে। ইংল্যান্ডই পোপের ধর্মশাসন (Reformation) থেকে মুক্ত হয়ে (খ্রিস্টীয় ১৫২৭-১৫৪৭ বা ১৫৫৮ সাল) বুদ্ধির মুক্তি ঘটিয়েছে এবং সেই সাথে জাতীয় চেতনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এর বদৌলতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ‘মধ্যশ্রেণী’র বিপ্লবের দ্বারা রেনেসাঁর মূল সত্যকে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব প্রয়াসের ফলে সাহিত্যে সংস্কৃতিতে আত্মবিকাশের অবিস্মরণীয় সুযোগ ইংরেজ লাভ করেছে। এ্যাংলো-নর্মান যুগের চসার (খ্রীঃ ১৩৪৫-১৪০০), ল্যাংল্যান্ড (জন্ম - ১৩৩০ খ্রীঃ), উইক্লিফ (Wycliffe), জন গাওয়ার (খ্রীঃ ১৩৩০-১৪০৮) প্রমুখ কবিদের সময়কাল থেকে যদি ইংরেজি সাহিত্যের সূচনা ধরি তাহলে ধরতে হবে এলিজাবেথের যুগের (কবিতার ক্ষেত্রে) ওয়ায়েট (Sir Thomas Wyatt, 1503-1542 AD), স্যারে (Surrey, 1517-1547 AD), স্পেন্সার (Sir Edmund Spenser, 1552-1599 AD), লিলি (John Lyly, 1554-1606 AD), সিডনি (Sir Philip Sidney, 1554-1586 AD), গদ্যে টমাস ম্যালরি (Sir Thomas Mallory), ক্যাকস্টন (Caxton), টমাস মূর (Sir Thomas Moore, 1478-1535 AD); নাটকে টমাস কীড (Thomas Kyd, 1557-1595 AD), ক্রিস্টোফার মারলো (Christopher Marlowe, 1564-1593 AD) প্রমুখ স্রষ্টাদের মাধ্যমে অভাবনীয় ঐশ্বর্যে এ সাহিত্যের পরিপুষ্টি ঘটে।

এরপর রাণী এলিজাবেথের সিংহাসনারোহণের (খ্রীঃ ১৫৫৮) বিশ থেকে চব্বিশ বছর পরে সাহিত্যের এই মহাযজ্ঞে পরিপক্কতা আসে। ততদিন কিন্তু ইতালীতে, ফ্রান্সে জাগরণের উৎসব সংঘটিত হয়েছে। দান্তে, পেত্রার্ক, বোক্কাচিও পথ দেখিয়েছেন আগে, কিন্তু পেত্রার্কের প্রভাব ছিল প্রবল। ইতালীতে তখন এরিওস্টো, তাস্সো, ম্যাকিয়াভেলি (Ariosto, Tasso, Machiavelli) জীবিত, আর ফ্রান্সে ভিঁয়ো (Villon), র্যা ব্লে (Rabelais), রঁসার (Ronsard), মঁতেঞ্ (Montaigne) এদের, বিশেষ করে ইতালীয় কবিতা ও নাটকের অনুকরণ, ইংল্যান্ডের লেখকদের পক্ষে ছিল প্রথম দিকে আত্মগঠনের পথ। আর এলিজাবেথীয় যুগের ইংরেজি সাহিত্যে গানও একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রা যোগ করেছে। টমাস ক্যামপিয়ন (Campion)-এর গান কিংবা শেক্সপীয়র, পিল (Peele), মালো, ওয়েবস্টার প্রমুখ নাট্যকারদের নাটকে অন্তর্ভুক্ত কোন কোন গীত তো কাব্যগুণে অনন্য।

বন্ধুগণ, নস্টালজিয়াবশত আমার এই দু’টি ছিন্নপত্র খুঁজে পাওয়ার সুবাদে একটি আবেদন রাখছি। সেটি হলো, ফাঁকে-ফোকরে সর্বদা পড়ুন, জানুন এবং জাতির অগ্রগতি ও কল্যাণে অবদান রাখুন। একটি জ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক, শান্তিপূর্ণ সমাজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী বিনির্মাণে সবাই এগিয়ে আসুন। কূপমণ্ডূকতা, মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদতা ও রক্ষণশীলতা পরিহার করুন। এই জগতের সকল প্রাণীর শান্তি ও সুস্থিতি নিশ্চিত করুন।

সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু ! জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক !! ????????????







লেখক: Jummoblogger


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):