জুমঘর সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপ্রতিরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ব্লগ বিষয় ভিত্তিক আর্কাইভ chtbd.org মাল্টিমিডিয়া জুম্ম সংস্কৃতি





জুম পাহাড়ে বিপন্নতার রাজনীতি: বাঙালি বনাম পাহাড়ি লেখক- ধীমান ওয়াংঝা


বাঙালিরা পাহাড়ে অতি বিপন্ন জনগোষ্ঠী বলে একটি জোর প্রচারণা তাদেরই দ্বারা পরিচালিত কিছু প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক-অনলাইন মিডিয়াতে সচরাচর দেখা যায়। কিন্তু বাঙালি যে একটি দাপুটে জীবন পাহাড়ে উপভোগ করছে, এই নির্জলা সত্যটি তাদের মিডিয়াগুলো কখনও প্রচার করেনা। ব্যাপক হারে পাহাড়ি নারী ও শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাকাণ্ড এবং ভূমি জবরদখলের মতো অপরাধ করেও অধিপতিসুলভ ক্ষমতার দৌরাত্ম্য দেখিয়ে তারা সারাদেশে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারে। তাদের গায়ে সামান্য আঁচর কাটার সাধ্যও কারও নেই। নিরাপত্তা বাহিনীর নিরাপত্তা বেস্টনীর মধ্যেই ট্রাক-লরি ভর্তি সেটেলার যোদ্ধা, ড্রামভর্তি পেট্রোল, রামদা-টেটা-বর্শাসহ নানা মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র সমাবেশিত করে তারা আদিবাসীদের গ্রামে হামলা, লুটতরাজ ও হত্যাকাণ্ড চালাতে পারে। আদিবাসীর বাড়িঘর, দোকানপাটে অগ্নিসংযোগসহ নির্বিঘ্নে যৌনসন্ত্রাস ও অপহরণকাণ্ডও ঘটাতে পারে। অথচ এসব গর্হিত কাজ কস্মিনকালেও সাধারণ পাহাড়িরা বাঙালির উপর করতে পারেনি বা করতে চায়নি। আটের দশকে গেরিলা যুদ্ধের কৌশলগত কারণে শান্তিবাহিনীকে যখন কিছু সেটেলার গ্রামে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে হয়েছিল, তখনও বাহিনীর নিয়মিত সদস্যরা ছাড়া সাধারণ পাহাড়ির, গ্রামবাসীর কোন অংশগ্রহণ সেখানে ছিলনা। কোন গণহত্যা বা যুথবদ্ধ সাম্প্রদায়িক আক্রমণে অংশ না নেওয়া সত্ত্বেও সাধারণ পাহাড়ির শান্তিপূর্ণ দৈনন্দিন জীবনযাপন ও স্বাধীন চলাফেরাকে পর্যন্ত সেটেলার বাঙালি এখন সহ্য করতে পারছেনা। আদিবাসী বিরোধী নানা সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষপ্রসূত বক্তব্যে তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা এবং অনলাইন মিডিয়াগুলো সয়লাব হয়ে আছে। বিস্ময়ে দ্বিধান্বিত হই যখন দেখি, উপরোক্ত এতসব অপরাধ করা সত্তে¡ও পাহাড়ের সেটেলার বাঙালিরা প্রায়শ দেশের নদীভাঙা অসহায় মানুষদের স্বরে ‘আমাদের সব শেষ, সব শেষ’ বলে বিচিত্র কোরাসে কান্না জুড়ে দেয়। কিংবা একটু সুযোগ পেলেই ছদ্ম-আহাজারিতে চারপাশের আকাশ-বাতাস-প্রকৃতিকে ভারী করে তোলে। পাহাড়িদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে তারা দেশি বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদের উপর চড়াও হয়। একই অভিযোগে দেশের স্বনামধন্য জুরিস্ট এবং সংবিধানপ্রণেতার উপর দলবেঁধে হামলা চালানোর সাহসও তারা দেখায়। সেটেলার বাঙালির কোন গবাদিপশু হারালে কিংবা বয়োঃবৃদ্ধ কারও স্বাভাবিক/অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে তারা নির্বিচারে পাহাড়ির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলতে পারে। পরে সেসব অভিযোগ জায়েজ করার জন্য পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলা পরিচালনাতেও তাদের কোন সমস্যা নেই। আর এসব করে সেটেলার বাঙালি যথারীতি উতরেও যায়। রাষ্ট্র, প্রশাসন তাদের এহেন চক্রান্তমূলক কর্মকাণ্ডকে বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজন বোধ করেনা। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই এসব চক্রান্তের তাত্ত্বিক স্রষ্টা। এসব ঘটনার বিচার চাইতে গেলে উল্টো পাহাড়িরাই নিগ্রহের শিকার হয়। এভাবে শাসকগোষ্ঠীর নীরব প্রশ্রয় পেয়ে সেটেলার বাঙালি আরও দ্বিগুণ উৎসাহে আদিবাসী পীড়নে নেমে পড়ে। দেশের ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা’র গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সে বিনা বাধায় পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন চালিয়ে যায়। আর এভাবেই যুগ যুগ ধরে শাসকগোষ্ঠীর প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে পাহাড়ি জনপদে সেটেলার বাঙালির উগ্র জাতীয়তাবাদী নিপীড়ন ও ভয়ের সংস্কৃতির নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন-পুনরুৎপাদন চলতে থাকে।

# এতো নির্বাধ স্বাধীনতা ও কতৃত্ব ভোগ করা সত্ত্বেও সেটেলার বাঙালির অভিযোগ, তারা পাহাড়িদের চেয়েও দীন-হীন-জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে আছেন। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা পাহাড়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আসা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদের উপর একাধিকবার আক্রমণ হেনেছেন, যা ইতোপূর্বেও উল্লেখিত হয়েছে। কখনওবা তাদের হাতে-পায়ে ধরে হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়েছেন নিজেদের ছদ্ম-অসহায়ত্বকে তুলে ধরতে। পাহাড়িদের বিরুদ্ধে নানা কল্পকাহিনী সাজিয়ে সরকার ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছে উপস্থাপন তাদের কাছে এখন নেশার মতো একটা ব্যাপার। উদ্দেশ্য নিজেদের দুষ্কৃতির পক্ষে সমর্থন আদায় করা। পাহাড়িরা অবশ্য তাদের বিশেষ আত্মমর্যাদাবোধ ও সাংস্কৃতিক চারিত্র্যের কারণে সেটেলার বাঙালির এই নাগরিক অভিনয়-শিল্পটি এখনও রপ্ত করতে পারেনি। খেতে না পেয়ে দেহত্যাগ করলেও অন্যের কাছে সহজে হাত পাতার অভ্যাস নাকি পাহাড়ি আদিবাসীর নেই। আদিকাল থেকে সমাজে প্রচলিত একটি রীতি বা মূল্যবোধ হিসেবে পাহাড়ি মানুষ এই অনভ্যাসটির প্রতি বেশ শ্রদ্ধাশীল। চারিত্র্যগত এই ঋজুতাও হয়তো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কবলিত আদিবাসীদেরকে হতদরিদ্র করে রেখেছে। অত্যন্ত প্রতিকুল ও অস্বাভাবিক একটি সময়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম হয়েও পাহাড়ি আদিবাসীদের অনেকে কিন্তু এখনও শাসকগোষ্ঠী প্রণোদিত লুম্পেন পুঁজির সুরসুরি আর নানান প্রলোভনের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। তারা বরং এক শোষণহীন মানবিক সমাজের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যে বেঁচে আছেন। তবে গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া কিছু মানুষকে দেখে সেটেলার বাঙালিরা দাবি করেন, পাহাড়ের সব ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা নাকি নাকবোঁচা পাহাড়িরা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। ফলে, তাদের ভাষায়, বাঙালি জাতি চরমভাবে অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তাদেরকে পাহাড়ের সবকিছুতে নাকি সম-অধিকার দিতে হবে। এর মানে দাঁড়ায়, পাহাড়ি সমাজের ঐতিহ্যবাহী রাজতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আঞ্চলিক পরিষদের যৎসামান্য এক্তিয়ারসহ পুরো প্রথাগত শাসন ব্যবস্থাটিকে বাঙালির হাতে তুলে দিলেই তাদের বঞ্চনাবোধ পরিতৃপ্ত হবে। কারণ এই সামান্য কিছু আদি প্রথা ও রীতিনীতি ছাড়া পাহাড়ির হাতে তো আর কোন ক্ষমতাই অবশিষ্ট নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রশাসন, আইন-আদালত, ব্যাংক-বীমা, আর্মি-পুলিশ-বিজিবি, সিংহভাগ আবাদি জমি, সংরক্ষিত পাহাড় ও বনাঞ্চলসহ রাষ্ট্রীয় যত সম্পদ সবই তো এখন একচ্ছত্রভাবে বাঙালিরই দখলে।

# তারা এও অস্বীকার করতে চান যে, এই পাহাড়িরা বাঙালিদের আগমনের বহু আগে থেকে পাহাড়ের আদি অধিবাসী। তাদের রয়েছে বাঙালি সমাজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, প্রকৃতিসংলগ্ন, স্বাধীন ও প্রথাগত একটি সমাজ ব্যবস্থা। বাঙালি সমাজ পাহাড়ি/আদিবাসী সমাজের অন্তর্গত যে বৈশিষ্ট্য, জাতিগত যে অভিজ্ঞতা, ধর্ম ও প্রকৃতিলগ্ন যে আধ্যাত্মিকতা তার সাথে পরিচিত নয়। সে কারণে আদিবাসী পাহাড়ি ও বাঙালি সম্পূর্ণভাবে দু’টি আলাদা সত্তা। এই দুই জাতিকে জোরপূর্বক এক জাতি ও এক সংস্কৃতিভুক্ত করার যে কোন সরকারি ধারণা বা প্রচেষ্টা অনধিকারচর্চা ও মানবাধিকার পরিপন্থী কাজ শুধু নয়, সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিবিরুদ্ধও। তারা একই রাষ্ট্রীয় সীমানায় বসবাস করে, মানবতাবাদের একই সুত্রে তারা পরষ্পর গ্রথিত ও অবিচ্ছিন্ন; কিন্তু তাদের জাতি (নাগরিকত্ব নয়), ধর্ম, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, প্রথাগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, ভাষা, আধ্যাত্মিক জীবন ও জাতিগত অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অথচ এদেশের শাসক সমাজ গায়ের জোরে পাহাড়ির/আদিবাসীর জাতিগত ভিন্নতাকে অস্বীকার করে আসছে। এখন পাহাড়ির স্বতন্ত্র জাতিগত আত্মপরিচয়কে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ তাঁদের নিজেদের একক সত্ত্বাবিশিষ্ট জাতীয়তাবাদ কিংবা ‘অখণ্ড জনগণসত্ত্বা’ নামক এক বায়বীয় মানবিক ধারণার খোলসে পুড়ে নিশ্চিহ্ন, নির্মূল করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তাই আজ নিজেদের জন্মভিটাসহ দেশের কোথাও পাহাড়িরা, আদিবাসীরা ভালো নেই। সুখে ও স্বস্তিতে নেই। কারণ তাদের আত্মপরিচয়ের এবং জীবনের নিরাপত্তা নেই। নিপীড়নমুক্ত, স্বাধীন-স্বচ্ছল-সুন্দর একটি ভবিষ্যত নেই।

# অন্যদিকে পাহাড়ে বসবাসরত সব বাঙালি পরিবার তাদের পাহাড়ি প্রতিবেশিদের তুলনায় ঘর-বাড়ি, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, বাগান-বাগিচা, খাদ্য ও শারীরিক নিরাপত্তাসহ সব দিক থেকে বেশ ভালোই আছেন। অন্ততঃ সমতলের জেলাগুলোতে বসবাসরত তাদের সমশ্রেণির বাঙালিদের তুলনায় তো শতগুণ ভালো আছেন। পাহাড়ের সব ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থবিত্ত, উঁচু বা নিচু পদের প্রায় সব সরকারি চাকুরি, গাড়ি-বাড়ি, পুলিশ-মিলিটারী-আদালত-প্রশাসন, পর্যটন কেন্দ্র, রিজার্ভ ফরেস্ট, শিল্প-কারখানা সব তো বাঙালিরই দখলে। উপরি পাওনা হিসেবে আছে সরকার প্রদত্ত রেশন সামগ্রী। অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে বিনা পয়সায় প্রাপ্ত চাল, ডাল, নুন, আটা, তেল ইত্যাদি। তাছাড়া পাহাড়ে তো বটেই, সমতলের যে জেলায় তাদের আদি নিবাস সেখানেও তারা নিজেদের বাড়িঘর, জমিজমার প্রসারসহ বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হতে পারেন, পাহাড়বাসী হওয়ার কল্যাণে। সেটেলার বাঙালির আদিনিবাস সমতলের ঐসব জেলার সাথে এখন পাহাড়ের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলার সংযোগকারী বিভিন্ন পরিবহন সার্ভিসেরও বেশ রমরমা অবস্থা, যা আগে অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। এসব গণপরিবহনে যাতায়াতকারীরা মূলতঃ সেটেলার বাঙালিই, যারা নিয়মিতভাবে তাদের ‘দেশের বাড়ি’র সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলছেন। অন্যদিকে একজন পাহাড়ি আদিবাসীর কাছে ‘দেশের বাড়ি’ বলতে তো সেই পাহাড়ই, যা প্রতিনিয়ত সেটেলার বাঙালির দখলে চলে যাচ্ছে। পাহাড়ে তার সম্বল নিজের সামান্য বাস্তুসংস্থানসহ এক টুকরো জমি। এই জমি থেকে সংবৎসরের খোরাকও জোটেনা। অনেকের আবার বাস্তুভিটা বা জমি কিছুই নেই। কারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা উৎপীড়নের ফলে বহুকাল আগে থেকে তারা আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। পাহাড়ে গিয়ে পর্যটকের চোখে নয়, মানুষের চোখ দিয়ে দেখে আসুন কোথায়, কি কষ্টে দিন কাটছে এই আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের, যার মধ্যে কিছু বাঙালি পরিবারও হয়তো রয়েছে। প্রমাণস্বরূপ, ভাগ্যবিড়ম্বিত এই পাহাড়ি উদ্বাস্তুদের অধিকার-বঞ্চনা ও কষ্টের কিছু বয়ান ছড়িয়ে আছে ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন এনজিও এবং স্বাধীন গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনগুলোতে। যদিও ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর সত্যিকার কষ্ট ও বেদনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এসব প্রতিবেদনে পুরোপুরিভাবে তুলে আনা কখনও সম্ভব নয়।

# জনসংখ্যার বিচারে বাঙালির চেয়ে পাহাড়ি চাকুরিজীবীদের সংখ্যাও বেশ নগণ্য। এই স্বল্পসংখ্যক পাহাড়ি চাকুরিজীবীর মধ্যে কয়েকজন সরকারি উচ্চপদে আসীন থাকলেও আদিবাসীদের অধিকার ও সহযোগিতার প্রশ্নে তারা হয় সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাহীন, নয়তো শাসকগোষ্ঠীর আদিবাসী বিরোধী নীলনক্সা বাস্তবায়নের অত্যুৎসাহী সহযোগী (অবশ্য সবাই নন)। অথচ দেখুন, আদিবাসীর এসব মাথাকাটা সৈনিককে দেখিয়েই কিন্তু সেটেলার বাঙালি নিজেদের পরশ্রীকাতরতা, বঞ্চনাবোধ আর জুম্মবিরোধী প্রচারণাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেশ ও জগৎবাসীর সামনে উপস্থাপন করছে। তারা তো জানেনই যে পাহাড়ে তারা নিজেরা কত বেশি ক্ষমতায়িত, আদিবাসীদের চেয়ে। কিন্তু তাদের লালিত ঈর্ষা আর চাওয়ার মূল জায়গাটি হলো নাকবোঁচা পাহাড়ি বাবুটির বেতন-বোনাস-আনুতোষিক-পেনশন সুবিধাসহ তার সরকারি পদবিটি। কারণ, সেটি পেলে সেটেলার বাঙালি পাহাড়ি তো বটেই, নিজের সমশ্রেণীর অন্য সেটেলার আত্মীয় বা পড়শীজনের উপরও নিজের অসাধারণ ক্ষমতা জাহির করতে পারে। পাহাড়ির জন্য সরকারি চাকরিটি নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে পড়ে কোনক্রমে বেঁচে থাকার একটি জরুরি অবলম্বন। আর ক’জনই বা আছেন সরকারি চাকুরিজীবী, দেশের মোট ৪৫ বা ততোধিক আদিবাসী জাতির প্রায় ৪০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে থেকে? কিন্তু সেটেলার বাঙালি তবুও পাহাড়ি বাবুর চাকুরিটি হস্তগত করতে চায়। কারণ সেটি তার জন্য সমাজে, রাজনীতিতে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা ভবিষ্যতে অর্থে-প্রতিপত্তিতে আরও অধিক বড় হওয়ার সোপান। তাই সে সর্বান্তকরণে কতিপয় নাকবোঁচা পাহাড়ির সামান্য সরকারি চাকুরির দিকেও এখন হাত বাড়াতে চায়। ‘পাহাড়িরা সরকারি কোটাসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা কুক্ষিগত করে বাঙালিকে বঞ্চিত করছে’ জাতীয় ঈর্ষাকাতর প্রচারণা তারই ফলশ্রুতি।

# এভাবে পাহাড়ির অধিকার হরণ করে নিজেকে আরও অধিক ক্ষমতায়িত করাটা হলো তার অভিপ্রায়। আর আদিবাসী বিদ্বেষ এবং ঈর্ষাকাতরতার এই প্রবল প্রবাহে পাহাড়ের বড়ুয়া বৌদ্ধ ও বাঙালি হিন্দুরাও এখন যোগ দিয়েছেন। তারা ইতোমধ্যে গঠন করে ফেলেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের হিন্দু-বড়ুয়া অধিকার রক্ষা পরিষদ জাতীয় সংগঠনও। আদিবাসী বিরোধী নানা প্রকল্পের মতো এর পেছনেও কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর ইন্ধন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ধর্ম ভিন্ন হলেও তাদের সংস্কৃতি, জীবনদৃষ্টি, স্বপ্ন-কল্পনা বা জীবনের চাওয়া-পাওয়া অভিন্ন বলেই হয়তো পাহাড়ি আদিবাসীর প্রতি তারা এখন সম-কোরাসে খড়গহস্ত, কুপিত ও ঈর্ষান্বিত। মাথামোটা পাহাড়ি আদিবাসী তাদের এই অভিন্ন অধিকার হরণ-স্পৃহা এবং সেটেলার বাঙালির সংস্কৃতিলগ্ন সহজাত ঈর্ষাকাতরতাকে সেভাবে কখনও বুঝতে পারেনি। ভবিষ্যতে আদৌ বুঝতে পারার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কারণ বাঙালি সমাজকে ভেতর থেকে গভীরভাবে ও স্বাধীনভাবে চেনা-জানার সুযোগ আদিবাসী সেভাবে কখনও পায়নি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অনীহার কারণে ভবিষ্যতেও যে পাবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ততদিনে বাংলাদেশের জুম্ম/পাহাড়ি/আদিবাসীরা বাঙালি জাতির দেহে-মনে তাদের স্বকীয় সত্ত্বা ও পরিচিতি হারিয়ে ফেলতে পারে। তবে ভারত ও মিয়ানমারে বসবাসরত স্বজাতিভুক্ত আদিবাসীদের কথা অবশ্য ভিন্ন।

# আগেও বলেছি, পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিপুত্র হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, মুরং, খুমী, পাংখো প্রভৃতি জাতিভুক্ত পাহাড়ি মানুষেরাই। জাতিসংঘের কল্যাণে তারা আজ সারা বিশ্বে ‘আদিবাসী’ (Indigenous Peoples) হিসেবে সুপরিচিত। ভূমিপুত্র হলেও পাহাড়ের সর্বত্র আগের মতো স্বাধীনভাবে বিচরণের অধিকার তাদের নেই। তবে পার্বত্য অঞ্চলে বহিরাগত সেটেলার বাঙালির সেই অধিকার আছে। তারা ইচ্ছেমত সেই অধিকারের মাত্রাহীন অপপ্রয়োগও ঘটাতে পারেন। বান্দরবানের বগালেক, নীলগিরি থেকে শুরু করে রাঙ্গামাটির সাজেকের বনপাহাড়-ঝিরি-ঝরণাসহ প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে তাদের দাপুটে বিচরণ দেখে সহজে বোঝা যায়, পাহাড়ে বাঙালিরা ভালো আছেন। এর বিপরীতে, কি পাহাড়ে কি সমতলে, আদিবাসীর বিচরণ বেশ সীমাবদ্ধ এবং ভয়-ভারাক্রান্ত। শহরের রাস্তা-ঘাটে তাদেরকে দেখামাত্র ‘চেং-চুং-চেং’ জাতীয় নানা অশ্লীল শব্দ প্রয়োগসহ বিচিত্র সব অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন কিছু বাঙালির জাতীয় অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদিবাসী নারীর প্রতি তাদের আচরণ ও মনোভঙ্গি আরও ভয়াবহ। আজকাল শুধু পাহাড়ে নয়, শহরে নগরেও বাঙালি কর্তৃক আদিবাসী নারীর ধর্ষিত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ের রাস্তা-ঘাটে যত্রতত্র সেনা-তল্লাসীসহ ‘সেনা নিয়ন্ত্রিত’ পার্বত্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি চলছে। এর ফলে পাহাড়ের আদিবাসীরা নিজেদের বসতিকেন্দ্রিক নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে একপ্রকার বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। এক অঞ্চলের পাহাড়ি মানুষ সহজে অন্য অঞ্চলে যেতে পারেন না। কারণ তার উপর সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রাজনৈতিক দলগুলোর নেকনজর থাকে। অথচ বাঙালির উপর ডেমোক্লিসের সেই খড়গটি ঝুলে নেই। তাই পাহাড়ে তার বিচরণ অবাধ। বস্তুতঃ বাঙালিরা পাহাড়ে সমতলের চেয়েও স্বাধীন ও নির্ভার। ধর্মীয় মৌলবাদী, ধর্ষকামী, অপরাধপ্রবণ অংশটি তো আরও বেশি মুক্তকচ্ছ ও দুর্বিনীত। সব মিলিয়ে ভালো, মন্দ সব কাজে পারদর্শী সেটেলার বাঙালির জন্য পার্বত্য অঞ্চলের মতো জবাবদিহিতামুক্ত স্বর্গরাজ্য বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের আর কোথাও আছে বলে মনে হয়না।

# অভিনয় দক্ষতা, আগ্রাসনপনা, হাঙ্গামা-হৈচৈ কিংবা কোন বিষয়কে অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রেও পাহাড়ি আদিবাসীর চেয়ে পাহাড়ের বাঙালি বেশ চৌকস ও অগ্রণী। এক্ষেত্রে দুই জাতিগোষ্ঠীর অবস্থান দুই বিপরীত মেরুতে। পাহাড়িরা আবহমান কাল ধরে প্রকৃতির অনুগত সন্তান। তাদের অভিনয় দক্ষতা, কষ্ট বা বেদনার প্রকাশভঙ্গি প্রকৃতিরই মতো সরল ও সীমিত। প্রিয়জনের বিয়োগ-বেদনায় গানের সুরে বাঙালি নারীর (কখনওবা পুরুষের) যে বুকফাটা মাতম আমরা প্রায়শঃ দেখি, পাহাড়ি সমাজে সেটি বেশ বিসদৃশ ও মাত্রাতিরিক্ত অস্বাভাবিকতার প্রকাশ বলে গণ্য। অনেকের কাছে বিষয়টিকে এক ধরনের অনুভূতিশুন্য কৃত্রিম উন্মাদনাও মনে হতে পারে। প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় যে কোন আদম সন্তানের মতো পাহাড়ি মানুষও কাতর হয়, কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গি বেশ শালীন ও সীমিত। বুকফাটা যন্ত্রণা ও আর্তচিৎকার হয়তো অন্তরের গভীরে গুমরে মরছে, কিন্তু উৎসুক মানুষের জটলায় তার দুঃসহ বহিঃপ্রকাশ প্রকৃতি ও জনগণের স্বাভাবিক সহাবস্থানগত শান্তিকে বিঘ্নিত করবেনা। অধিকাংশ আদিবাসীর ধর্মীয়-সামাজিক আচারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উচ্চকন্ঠের কোন জিগির নেই, মাত্রাতিরিক্ত উল্লাস, বিষোদগার বা দেখানোপনা নেই। আদিবাসীর সংস্কৃতিগতভাবে অন্তর্মুখী এহেন মূল্যবোধ ও অনাগ্রাসী আচরণের সাথে বাঙালির চূড়ান্ত প্রকাশপ্রবণতা এবং সর্বতোভাবে বিজয়ী হওয়ার প্রত্যয় বেশ পরষ্পর বিরোধী বলে প্রতীয়মান হয়। মনন ও সংস্কৃতিগত এই ভিন্নতার কারণেই হয়তো বাঙালি দেশের পাহাড়ির, আদিবাসীর অধিকার বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ এবং অসহায়ত্বের মর্মবেদনাকে বুঝতে পারেনা। উল্টো বিপন্ন আদিবাসীকেই সে শত্রু বলে গণ্য করে।

# তবে পাহাড়ি আদিবাসীর বড় একটি দুর্বলতা হলো, তার মাথা খুব গরম এবং স্বভাবে সে অত্যন্ত ধৈর্যহীন। একটু উস্কানিতেই চন্ডমূর্তি ধারণ করে সে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দিতে পারে। তার মুখের চেয়ে হাত-পা দ্রুত চলে (অনেকটা কুংফু, জুজুৎসু স্টাইলে)। বাঙালি যেখানে তর্কাতর্কি করে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারে, সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাহাড়ির ঢুস্-ঢাস্ কিল-ঘুষি শুরু হয়। ফলে পরিণতি যা হবার তাই হয়। সংঘাত, হানাহানি, শত্রুতা, প্রতিহিংসা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। আদিবাসীর চরিত্রের এই বিশেষ দুর্বলতাটিকে কাজে লাগিয়েই শাসকগোষ্ঠী পাহাড়ি সমাজকে বহুদলে বিভাজিত করে দীর্ঘস্থায়ী ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বাঁধিয়ে দিতে সফল হয়েছে। ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির কুশীলবরা সংঘাত বাঁধানোর উপায় হিসেবে লক্ষিত জাতি বা জনগোষ্ঠীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সবলতা, দুর্বলতাগুলো নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সে অনুযায়ী যুৎসইভাবে নানা প্রলোভন, প্ররোচনা কিংবা প্রতারণার হরেক কৌশল প্রয়োগ করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংঘাত বাঁধিয়ে দেন। এর পেছনে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক নানা গবেষণা, গভীর পর্যবেক্ষণ, স্বার্থের হিসাব-নিকাশ এবং প্রচুর অর্থ ও মেধার বিনিয়োগ থাকে। পৃথিবীর নানা জায়গায় চলমান সংঘাত ও সহিংসতাগুলো সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের দেশে শাসকগোষ্ঠীর আদিবাসী-বৈরী চলমান প্রকল্পগুলোও যে সেভাবেই গৃহীত হয়েছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অন্যদিকে শাসকশ্রেণীর এসব সুপরিকল্পিত আগ্রাসন কিংবা নির্মূলীকরণ প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করার মতো কোন সুচিন্তিত প্রস্তুতি, দক্ষতা, গবেষণা ও সদিচ্ছা আদিবাসীদের তরফে সেভাবে কখনও পরিলক্ষিত হয়নি।

# এছাড়া, নানা বিবেচনায় বাঙালি সমাজ পাহাড়ি সমাজের চেয়ে শতগুণ জটিল ও বিচিত্র একটি সমাজ। এই সমাজে নারীর অধস্তনতাসহ ধর্ষণ, যৌতুকপ্রথা ও ভূমিদস্যুতার হার শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, সারা বিশ্বে অদ্বিতীয়তার দাবি রাখে। পাহাড়ে বসতিকৃত সেটেলার বাঙালিরা অধিকাংশই চরাঞ্চলের নদীভাঙা, মঙ্গাকবলিত জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অংশের সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ। জীবন-জীবিকার তাগিদে সহিংস প্রতিযোগিতা ও প্রাণান্ত সংগ্রাম, ভূমির অপ্রতুলতা, দখলদারিত্ব ঐসব অঞ্চলে যেন জীবনেরই অন্য নাম। এসব জীবন বাস্তবতার বিবরণ আমরা বাংলার গল্প-উপন্যাস-কবিতায় হরহামেশা পড়ে থাকি। জনসমাজে বিরাজিত ঐসব নিষ্ঠুরতা এবং টিকে থাকার সহিংস, বিশৃঙ্খল একটি আবহে তাদের জীবনদৃষ্টি ও মানসকাঠামো গড়ে ওঠে। পাহাড়ে এসে তারা স্বাভাবিকভাবেই আদিবাসীদের উপর তাদের সেই লব্ধ বিদ্যার নির্বিঘ্ন প্রয়োগ ঘটায়। বাড়তি শক্তি হিসেবে এখানে তাদের পেছনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে যায় স্থানীয় সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র। অন্যদিকে এর বিপরীতে নিজেদের সামান্য বসতভিটা ও জুমভূমিকে আঁকড়ে অনিরাপদ ও বিপন্ন একটি জীবন কোনক্রমে নির্বাহ করে যায় ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত ও নিঃসহায় পাহাড়ি মানুষ। তাই জুম্ম আদিবাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সবকিছু দখল করে বসে আছে, বাঙালিকে তারাই অধিকার বঞ্চিত করছে, এসব অভিযোগ একদিকে যেমন বাস্তবতাবর্জিত নির্মম রসিকতা, অন্যদিকে সেগুলো সেটেলার বাঙালির পাহাড়ি বিদ্বেষপ্রসূত ও স্বভাবজাত অতিরঞ্জন।

# তবে এসব ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে একটি সাধারণ সত্য বা কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। বিষয়টি এদেশে এখনও এক অমিমাংসিত মানবিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। আর এই সমস্যার সমাধান আসতে হবে ‘পাহাড়ি-বাঙালি’র সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি থেকে নয়, মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত একটি সাহসী রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা থেকে। সমস্যাটি হলো, পার্বত্য অঞ্চলসহ সারাদেশে নিম্নবর্গের বাঙালির দারিদ্র্য পরিস্থিতির চিত্রটিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। স্বস্তিদায়ক হলে অবৈধ সাগরপথে দূরদেশে অভিবাসী হতে গিয়ে দরিদ্র বাঙালি সমুদ্রজলে হারিয়ে যেতো না। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার উপকূলবর্তী জঙ্গলে মানব পাচারকারিদের অত্যাচারে নিহত বাঙালির গণকবরও আবিস্কৃত হতো না। তবে অমিমাংসিত এই সমস্যাটির জন্য তো দেশের বৈষম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা আর সামন্ত-পুঁজিবাদী সমাজকাঠামোই দায়ী। এর জন্য অযথা পাহাড়িদের, আদিবাসীদের দায়ী করা হচ্ছে কেন? দেশের সরকার ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমছে দাবি করলেও বাস্তবে আমরা এখনও এর বিপরীত চিত্রটিই দেখছি। নানা মহলের জোর দাবি সত্ত্বেও বাংলাদেশের কোন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় ভূমি সংস্কারের বিষয়টি কখনও ছিলনা, এখনও নেই। ফলে এদেশের কতিপয় মানুষ প্রচুর জমি ও ধন-সম্পদের মালিক, আর অধিকাংশ মানুষ নিঃস্ব। অথচ ভূমি-সংস্কার করা হলে সমবন্টনের ভিত্তিতে দেশের সব মানুষকে প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্ধ দেওয়ার পরও অনেক জমি উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। তখন দেশে আর কোন ভূমিহীন, দরিদ্র মানুষ থাকতো না। ফলে ভূমির জন্য দেশের আদিবাসী/সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর প্রতি ভূমিহীন বাঙালির আগ্রাসী দৃষ্টিও আর আকৃষ্ট হতোনা। সারাদেশে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে উৎপীড়ন এবং তাদের ভূমিকে জবরদখল প্রবণতারও চির অবসান ঘটতো। সমতলে স্বচ্ছল-সুন্দর একটি জীবনের অধিকারী হতে পারলে কে আর অতো কষ্ট করে এবড়ো থেবড়ো পাহাড় ডিঙোতে যায়!

# আমরা জানি, দেশের বাইরে পুঁজি পাচারের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ। এদেশের অর্থমন্ত্রীও নানা কথায় বুঝিয়ে দেন ঘুষ গ্রহণ বা প্রদান নাকি বড় কোন অপরাধ নয়। কারণ এতে নাকি কাজের গতি বাড়ে। সরকারি প্রশ্রয়ে মূল্যবোধের কি সুন্দর ও সংবেদনহীন করুণ অবক্ষয়! এদেশের ঘুষখোর-সুদখোর ধনী ও কালো টাকার মালিকেরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। সে টাকায় তাদের স্ত্রী-পুত্র-সন্তানদের থাকার জন্য কানাডায় প্রাসাদোপম বাড়িসহ ‘বেগমপাড়া’ গড়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুরে গড়ে উঠছে দেশের সম্পদ পাচারকারিদের ‘সেকেন্ড’ হোম’। তাছাড়া নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, দুবাইয়ের মতো বহু শহরে এদের বিলাসবহুল ভ্রমণ, জীবনযাপন ও কেনাকাটা তো আছেই। দুর্নীতিতে পরপর তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এই দেশ। অথচ দুর্নীতি না থাকলে স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি যে পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য এদেশে এসেছে, তা দিয়ে এদেশকে আক্ষরিক অর্থে ‘সোনার বাংলা’ বানানো যেতো। দেশের অধিকাংশ রাস্তাঘাট সোনার পাতে মোড়ানো সম্ভব হতো। চীন, ভারতের আদলে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদীর দুইপাড় ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণসহ যথাযথ নদীশাসনের মাধ্যমে এদের দুঃসহ ভাঙনের হাত থেকে দরিদ্র মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হতো। এখন দেশের দরিদ্র মানুষের হাতে পর্যাপ্ত জমি, জীবিকা, বাসস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানি নেই। পর্যাপ্ত বিনোদন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তাসহ নানা অপরিহার্য সেবা প্রাপ্তির সুযোগ নেই। অথচ রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, জুডিসিয়ারি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব সেক্টরে দুর্নীতির যে সীমাহীন বিস্তার তা রোধ করা গেলে, সেই অর্থ দিয়ে সাধারণ মানুষের এইসব অধিকার বঞ্চনা অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব হতো। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে বিপুল অপচয় হয়, সেটি রোধ করে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমতা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্র ও সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। পাহাড়ে পুনর্বাসিত হতদরিদ্র কিছু বাঙালিও মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রের এই লাগামহীন দুর্নীতিজনিত ব্যর্থতা ও ধনী-গরিবের বৈষম্যক্লিষ্ট শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। কিন্তু পাহাড়ে সেটেলার বাঙালির দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের যে করুণ বয়ান প্রচার করা হয়, সেখানে দেশের শাসকগোষ্ঠীর অপশাসন এবং রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদের দুর্নীতিজনিত অপচয়কে দায়ী করা হয়না। অন্যায্যভাবে দায়ী করা হয় যুগ যুগ ধরে অনুরূপ বঞ্চনার শিকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকেই। যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের নানাবিধ শোষণ-পীড়নে ওষ্ঠাগতপ্রাণ পাহাড়িরাই বাঙালিকে ‘উন্নয়ন’ দেওয়ার মালিক। যেন পাহাড়ির সর্বশেষ বসটভিটাটি সেটেলার বাঙালির হাতে তুলে দিলেই বাঙালির আত্ম-উন্নয়ন বাসনা পরিতৃপ্ত হয়। এতে তার ‘সম অধিকার’ প্রাপ্তিও সম্পূর্ণ হয়। তাদের ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার অনুপাতে তারা এখন পাহাড়ের ভূমি, বন, প্রশাসন থেকে শুরু করে আদিবাসীদের প্রথাগত শাসন ব্যবস্থাটিকে পর্যন্ত হস্তগত করতে চায়। দেখুন, কি করুণ বিবেচনাবোধ এদেশের মানুষের, বিশেষ করে ‘সমঅধিকারের’ জন্য আন্দোলনরত পাহাড়ের সেটেলার বাঙালির! আর আদিবাসীর প্রতি কি নির্দয় ‘ন্যায়বিচার’ এদের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা দেশের সেনা প্রভাবিত শাসকগোষ্ঠীর! বেঁচে থাকলে গ্রিকবীর আলেক্সান্ডার পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত ‘শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন’ এর এহেন একটি মডেল দেখে হয়তো আবারও বলে উঠতেন, ‘সেলুকাস, দেখো কী বিচিত্তির এই দেশ’, ‘কী বিচিত্তির এই শান্তির মডেল!’

# অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলসহ সারাদেশে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী আদিবাসী জনসংখ্যার হার যে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ (মতান্তরে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ), সেই অপ্রিয় সত্যটি পাহাড় ও সমতলের ‘সমঅধিকার’ সচেতন বাঙালিরা কখনও প্রচার করেন না। ভেবে দেখুন, সারাদেশে দারিদ্র্য সীমার হার যেখানে মাত্র ২২.৪ শতাংশ, সেখানে ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ আদিবাসী এখনও দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করেন! পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা দারিদ্রের এই কষাঘাত ছাড়াও যুগ যুগ ধরে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আর স্বভূমি হারানোর রাজনীতিরও করুণ শিকার। আর সেটি মূলতঃ তাদের প্রতি রাষ্ট্রের বিমাতাসুলভ ভূমিকার কারণেই। এই সহজ সত্যটি মেনে নিতে গেলে অধিকারমুখর বাঙালির বিবেক ও মানবিকতাবোধ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। আসলে রাষ্ট্র বলুন কিংবা পাহাড়ের স্থানীয় রাজনৈতিক দল বলুন, কেউই আর এদেশের আদিবাসীদের কল্যাণ-স্বস্তি-সমৃদ্ধি চায় বলে মনে হয়না। নাহলে যুগ যুগ ধরে তাদেরকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি, এই দুই শক্তির দ্বারা নির্মম শোষণ ও পীড়নের শিকার হতে হতোনা। ভাগ্যবিড়ম্বিত আদিবাসী জনগণের একটি বড় অংশ বহুকাল আগে থেকে শহর, বন্দরে এসে প্রায় জীবন্মৃত ও ছিন্নমূল জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। ইদানীং শুনছি ও দেখছি, পিতৃপুরুষের আবাসিত যেসব অঞ্চল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে ইতোমধ্যে আদিবাসীদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, সেখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠছে। ঐসব অঞ্চলে এখন নাকি উন্নয়নের জোয়ার বইবে। পাঁচতারকা হোটেলসহ হাস্যে-লাস্যে ভরপুর নানা বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠবে। আদিবাসীবিযুক্ত সেই উন্নয়ন কার হৃদয়ের স্ফুর্তি, উদর আর ইন্দ্রিয়ের প্রশান্তি ঘটাবে সেটি বাঙাল চেতনাবাদী নানা প্রচারমাধ্যমের উন্নয়ন প্রোপাগান্ডা থেকে সহজে অনুমান করা যায়।

# ফলে দেখা যাচ্ছে, ইদানীং মেঘ-পাহাড়-ঝরণার মিতালির ঐশ্বরিক সৌন্দর্য উপভোগের আহ্বান জানিয়ে সাজেকের রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রের বিজ্ঞাপন বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু ভাসমান সাংবাদিক, সংবাদপত্র এবং সামাজিক আন্তর্জালের কল্যাণে পাহাড়ের এই কৃত্রিম লাস্য ও ভোগের দুনিয়া অতি দ্রুত দেশে-বিদেশে সবার কাছে উন্মোচিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জন্য বাড়তি অস্বস্তির একটি বিষয় এখানে আছে। সেটি হলো, এদেশের দখলপ্রিয় সেটেলার বাঙালির পাশাপাশি কেএফসি-ম্যাকডোনাল্ডস-পিৎজাহাটস্ প্রজন্মের কিছু নাকবোঁচা পাহাড়িও এখন এসব উন্নয়ন প্রচারণার উন্মাতাল গ্রাহক বা সহযোগী। তারা এসব পর্যটনকেন্দ্রের পক্ষে নানা রোমাঞ্চকর তথ্য ও ছবি ফেইসবুকসহ আন্তর্জালের রঙিন দুনিয়ায় উৎসাহের সাথে প্রচার করছেন। বোঝা যাচ্ছে, এই তরুণ-তরুণীরা নিজের দেশ-জাতি-সমাজ-স্বজনের নিপীড়িত-উচ্ছেদিত জীবনের করুণ বয়ান আপাতত ভুলে থাকতে চান। শাসক মহলও নিশ্চয় জানে, বিশ্ব-পর্যটকের সহজিয়া বিলাস ও লাস্যে আপন দেহ-মনকে ভাসিয়ে দেওয়ার স্বপ্নে হতাশাগ্রস্ত-অলস-স্বপ্নবিলাসী অনেক পাহাড়ি তরুণ-তরুণীও বিভোর হতে পারে। কারণ মাদকদ্রব্য ছাড়াও সহজে বিপথগামী হওয়ার সকল উপাদান এখন পাহাড়ে মজুদ রয়েছে। রঙচঙে পর্যটন শিল্প এতে বাড়তি রসদ জোগাবে। আর এই শিল্পে আদিবাসী মানুষের আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে সরকারি কোষাগার স্ফীত হতে থাকবে। অথচ যে অঞ্চলটির কথা বলছি, সেখানে এই কিছুকাল আগেও আমাদের স্বজাতীয় ভ্রাতা-ভগ্নী শ্রী লক্ষী বিজয় চাকমা, শ্রী লাদুমনি চাকমা ও শ্রীমতি বুদ্ধপুদি চাকমাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। অনেক আদিবাসী পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছিল তাদের আদি বসতভিটা থেকে। আমরা কি এত সহজে সাজেকের সেই আক্রান্ত, উচ্ছেদিত পরিবারগুলোর কথা ভুলে গেলাম? এদেশেরই নিরাপত্তা বাহিনী ও সেটেলার কর্তৃক লক্ষী বিজয়, লাদুমনি ও বুদ্ধপুদি চাকমার নির্মম হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল। শুনেছি, তারা গুলিবিদ্ধ বুদ্ধপুদি চাকমার নিম্নদেশে লাথি মেরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক স্বার্থ, ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের জন্য মানুষ কত নির্মম, নিষ্ঠুর হতে পারে, এটি তার প্রমাণ। কি ছিল এই তিন নিরীহ পাহাড়ির অপরাধ, যার জন্যে তাদেরকে জীবন দিতে হলো? মানবাধিকার কর্মীরা জানাচ্ছেন, তারা নাকি নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদিত হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আপন ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও একটি ঘোরতর অপরাধ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা’র এই দেশে? আন্তর্জাতিক আইন ও দেশের সংবিধান মোতাবেক যা একটি মৌলিক মানবাধিকার, শাসক মহলের দৃষ্টিতে সেটি সহজেই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হয়ে উঠতে পারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই সোনার বাংলায়? মুক্তিযুদ্ধের কথিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে এরূপ জবরদস্তিমূলক ‘ন্যায়বিচার’ কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ বা সাংঘর্ষিক, আগ্রহী নাগরিকগণ ভেবে দেখতে পারেন। আর এসব ঘটনাবলী থেকে পাহাড়ে কার বিপন্নতা বেশি, বাঙালির না পাহাড়ির, সেটিরও সঠিক উত্তর খুঁজে পাবেন।

# সবার জন্য আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভকামনা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

(বিশেষ নোটঃ আলোচ্য রচনাটি ২০১৬ সালে একুশে বইমেলায় প্রকাশিত আমার ‘আদিবাসী জুম্ম জাতির ভবিষ্যৎ’ বইটি থেকে নেওয়া। তবে ইতোমধ্যে তিন বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও লেখাটি এখনো খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি দেখুন, পৃষ্ঠা: ৭৯-৯০)।



লেখক: Jummoblogger


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):