জুমঘর সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপ্রতিরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ব্লগ বিষয় ভিত্তিক আর্কাইভ chtbd.org মাল্টিমিডিয়া জুম্ম সংস্কৃতি





পার্বত্য সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা: মিথ ও বাস্তবতা লেখক- ধীমান ওয়াংঝা


আদিবাসী বিরোধী এক শ্রেণির নব্য বাঙালি গবেষক এখন বেশ তৎপর। তবে আদিবাসীদের পক্ষেও অনেকেই আছেন। এই বিরোধীদের কেউ কেউ পাহাড়ে সেটেলার বাঙালির রাজনৈতিক অভিবাসনের সমর্থনে যুক্তি দাঁড় করাতে বেশ সিদ্ধহস্ত। যেমন তাঁরা বলেন, ভ‚-রাজনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্পর্শকাতর অঞ্চল। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সেখানে বিশ্বস্ত জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালির সংখ্যাধিক্য বহাল রাখা প্রয়োজন। তার মানে, কথায় প্রভ‚ত পাহাড়ি-প্রীতি শ্রæতিগোচর হলেও বাস্তবে এসব মানুষ নিখুঁতভাবে পাহাড়ি বিদ্বেষী। এই শ্রেণির বাঙালিরা সেখানকার আদি অধিবাসী পাহাড়িদেরকে বিশ্বাস করেন না। কারণ পাহাড়িরা জাতিতে অ-বাঙালি এবং আদিবাসী। তাঁদের ধারণা, ভিন্ন জাতির এই মানুষেরা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি বড়োসড়ো হুমকি! প্রিয় পাঠক, এহেন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে পাহাড়ির প্রতি বাঙালির নির্মম জাতিবিদ্বেষ ছাড়া আর কী বলা যায়? অবশ্য এমন সমালোচনার উত্তরে এইবিধ গবেষকেরা আবার কখনো ভিন্ন কথাও বলেন। সেটি হলো, একসময় পাহাড়ে নাকি অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া যেতো না। তাই কামলা হিসেবে বাঙালি সেটেলারদেরকে সেখানে অভিবাসিত করতে হয়েছিলো। কারণ রাস্তাঘাত, বিল্ডিং ইত্যাদি নির্মাণের জন্য পাহাড়ি শ্রমিক তখন সহজলভ্য ছিলো না। শান্তিবাহিনীর তরফ থেকে এ বিষয়ে পাহাড়ি জনতার ওপর নাকি অলিখিত বিধিনিষেধ জারি ছিলো। অর্থাৎ শান্তিবাহিনীর নির্দেশ ছিলো, সরকার তথা সেনাবাহিনীর কাজে কোনো সহযোগিতা দেওয়া যাবেনা।

# দেখুন, এইসব যুক্তি একজন কাঠমোল্লা বা নিছক খেটে খাওয়া মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ মোহনীয় ও যথার্থ বিবেচিত হতে পারে। মুনাফালোভী, নির্দয় আদম ব্যবসায়ী কিংবা চতুর কোনো নিরাপত্তাবিদের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতিভুক্ত হওয়ার কারণে কেন নিজ দেশের জুম্ম নাগরিকগণকে অবিশ্বাস করা হবে? আর বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের এই যুগে কেনইবা দেশের এক দশমাংশ অঞ্চলের অকর্ষিত, সবুজ প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে হবে? দেশের ও পৃথিবীর স্বার্থে বন, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জাতিবৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ ও বিকশিত করা প্রয়োজন। সভ্য জগতে এটাই এখন প্রচলিত রীতি। আধুনিক জ্ঞানজগৎ, বিজ্ঞজন এবং বিজ্ঞানীদের জোরালো দাবিও তা-ই। কিন্তু সভ্যতার সেই পথে না হেঁটে রাষ্ট্র কেনো আমাদের এতো সুন্দর সবুজ জুমপাহাড়ে কৃত্রিম (অ-প্রাকৃতিক) ইট-পাথর-সিমেন্ট-সুরকির গতানুগতিক উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে চাইছে? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কথিত একদেশদর্শী গবেষক ও নিরাপত্তাবিদদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। বোঝা যায়, সামরিক জীবনে তাঁরা অস্ত্রবাজিতে এবং বর্তমানে গলাবাজিতে বেশ দক্ষ। কিন্তু প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য-জাতিবৈচিত্র্য-সৌন্দর্য-শান্তি-সংহতির একীভ‚ত সংরক্ষণ ও বিকাশ হাল আমলের সর্বাধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্রনীতি। অথচ এই পদ্ধতিতে কার্যকরভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি নিয়ে তাঁদের পড়াশুনো, ঔৎসুক্য ও জ্ঞানগম্যি নস্যি বলেই প্রতীয়মান হয়।

# আসল সত্য হলো, সীমান্ত অঞ্চলে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা একটি অজুহাত মাত্র। কারণ ১৯৯৭ সালে পার্বত্য ‘শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রত্যক্ষ কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে নেই। যা আছে সেটি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট আইন-শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা। সিভিল প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নিয়মিত বাহিনীই এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট। তাই সাধারণ জনগণের প্রদত্ত ট্যাক্সের হাজার কোটি টাকা খরচ করে লক্ষ লক্ষ সেনাসদস্য পাহাড়ে নিয়োজিত রাখার কোনো আবশ্যকতা নেই। আর প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর মতো বাস্তবতাও সেখানে অনুপস্থিত। ফলে প্রতীয়মান হয় যে, পাহাড়ে টনটনে সার্বভৌমত্বপন্থীদের চলমান যেসব কর্মকান্ড, তার মূল চালিকাশক্তি আসলে তাঁদের নিজেদের অন্তরে লালিত প্রবল আদিবাসী/জাতি-বিদ্বেষ, প্রকৃতি-বিদ্বেষ, বৈচিত্র্য-বিদ্বেষ, ভিন্নধর্ম ও ভিন্নসংস্কৃতি-বিদ্বেষ, প্রকৃতিলগ্ন আদি জনতার সরল জৌলুষ ও রাজকীয় জীবনের প্রতি বিদ্বেষ প্রভৃতি। এর পাশাপাশি আমাদের পার্বত্য অঞ্চলকে গেরিলা যুদ্ধসহ একটি বিশ্বমানের বিশেষায়িত সামরিক প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হিসেবে বহাল রাখার তাগিদ তো আছেই। বলাবাহুল্য, জাতি-বিদ্বেষের পূর্বোক্ত বিশেষ ও সংকীর্ণ রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিটি সেই পাকিস্তান আমল থেকেই পাহাড়ে বলবৎ রয়েছে। বর্তমানে আদিবাসীদের প্রায় ছিন্নমূল বিপন্ন জীবন এবং তাঁদের প্রাত্যাহিক জীবনচর্যায় নিয়মিত ও অস্বস্তিকর গোয়েন্দা নজরদারি এর প্রমাণ। পার্বত্য অঞ্চলের একদা ঘন-অরণ্যবেষ্টিত এবং বর্তমানে শ্রীহীন ন্যাড়া পাহাড়গুলোও যেন সে সাক্ষ্যই দিচ্ছে।

# অন্যদিকে পাহাড়ি/আদিবাসী বিদ্বেষী সার্বভৌমত্বপন্থীদের লেখায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে ও কর্মকান্ডে সর্বদা প্রতিফলিত হচ্ছে ভারত ও মিয়ানমার-বিদ্বেষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানধর্ম বিদ্বেষসহ ঐ অঞ্চলে ইসলামী ভাবধারা ও সংস্কৃতি বিকাশের মরিয়া আকাঙ্খাও। কিছুদিন আগে খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারাতে বিশাল এক বুদ্ধমূর্তি ভেঙে দেওয়া, পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে পবিত্র বৌদ্ধ মন্দিরে জুতা পায়ে প্রবেশ করে সেনাদের যথেচ্ছ তল্লাশি, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হেনস্থা এবং দেবী দুর্গার মূর্তি, বুদ্ধের মূর্তি ও মন্দির নির্মাণে বাধা প্রদানের ঘটনাগুলোকে আমরা এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। এছাড়া, উপরোক্ত আদিবাসী প্রান্তিকায়ন ও নিঃস্বায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের কিছু কায়েমি স্বার্র্থগোষ্ঠী কর্তৃক পাহাড়ের ভৌত-অভৌত সকল সম্পদ ভোগদখলের দুর্দমনীয় ইচ্ছা ও প্রতিযোগিতা তো আছেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সর্বত্র মসজিদ-মক্তব-মাদ্রাসা নির্মাণ, ঘন অরণ্যবেষ্টিত পাহাড়ে জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, উন্নয়নের নামে প্রকৃতিবৈরি রাবার চাষসহ নামে-বেনামে হাজার হাজার একর পাহাড়ি ভ‚মি অধিগ্রহণ এবং লুম্পেন পুঁজিনির্ভর পর্যটন শিল্পের প্রসার তার প্রমাণ। এই সকল বিষয় দেশের আদিবাসীবৈরী ওপেন-সিক্রেট পলিসিভুক্ত অপ্রিয় সত্য। তাই কথিত গবেষকদের ক‚টনীতি-ঋদ্ধ লেখনির মারপ্যাঁচে এসব আদিবাসী-হন্তারক গোপন এজেন্ডা ও বিষয় অপ্রকাশিতই থেকে যায়। তার বদলে তাঁরা সামনে নিয়ে আসেন সীমান্তের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা বিষয়ক জুজুর ভয়যুক্ত সব কল্পকাহিনী, যা ইতোপূর্বেও কিছুটা উল্লেখিত হয়েছে।

# তার মানে, এভাবে চলতে থাকলে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের উপর চলমান রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন-বৈষম্য-বঞ্চনার অগ্রন্থিত কষ্ট-কাহিনীগুলো দেশের সাধারণ জনগণ কখনোই সঠিকভাবে জানতে, বুঝতে পারবেন না। একটি সীমান্ত-জনপদের স্থানীয় জনগণকে বঞ্চিত-পীড়িত, বৈরী-বহিস্থ, সন্দেহ-সংশয়দীর্ণ এবং রাষ্ট্রের সংবিধান-বহির্ভূত রেখে কিভাবে সেদেশের কথিত সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সুসংহত রাখা যাবে বা রাখা যায়, তার কোনো খোলাসা আলোচনা তাঁরা করবেন না। কারণ সেটি করতে গেলে এই তথাকথিত দেশপ্রেমিকরা যে স্বদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার হরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য তাঁরা যুক্তি দিতে পারেন যে, সারা দেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গি আস্তানাগুলোতেও নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা চালানোর খবর মাঝে মাঝে দেশের পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হতে দেখা যায়। কিন্তু এর মাধ্যমে আপনি যে বিশেষ রাষ্ট্রীয় পলিসির আওতায় পাহাড়ে সৃষ্ট আদিবাসী গ্রæপগুলোর সাথে এই ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গিদের অস্তিত্বকে গুলিয়ে দিচ্ছেন, তা কিন্তু বলবেন না। মাঝে মাঝে বোধবুদ্ধিহীন কিছু আদিবাসী তরুণকে এনকাউন্টারে হত্যার পর দেশের বিশেষ কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তাঁদেরকে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দেশদ্রোহী ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করে নির্বিচারে আপনারা প্রচার করছেন।

# অন্যদিকে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক আদিবাসীদের উপর সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা, আদিবাসী নারী-শিশুদের উপর তাদের পরিচালিত যৌন সহিংসতা-ধর্ষণ-নিপীড়ন, জুম্মদের ধর্মীয় উপাসনালয়, বুদ্ধমূর্তি, দেবী দূর্গামূর্তি ভাঙচুর প্রভৃতি নৃশংস ঘটনাগুলো আবার কীভাবে যেন দেশের মূলধারার সব মিডিয়া থেকে ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। সুতরাং আদিবাসীদের কল্যাণ বিষয়ে আপনাদের কথিত শুভবোধ ও মায়াকান্নার বয়ানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। আসলে বর্তমানে বলবৎ আদিবাসী বিরোধী রাষ্ট্রীয় বিশেষ নীতির পরিবর্তন না ঘটলে পাহাড়ের কথিত এইসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং রহস্যঘেরা ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গি আস্তানাগুলোর তৎপরতা প্রশমিত হবে বলে মনে হয় না। আর রাষ্ট্রীয় কথিত বিশেষ নীতির পরিবর্তন ঘটলে মাত্র দুই/তিন মাসের মধ্যে পাহাড়ের তথাকথিত সকল সন্ত্রাসী ও জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে এবং পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী আদিবাসীদের বিশেষ জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে পার্বত্য জনপদে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করি। আমাদের সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর সে সামর্থ্য যে আছে, তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।

# ব্রিটিশদের ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সময় একান্ত সহযোগী ভারত ও প্রতিবেশী মিয়ানমার পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো অংশের উপর নিজেদের মালিকানা প্রবলভাবে দাবি করেনি। অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রথিতযশা আমলা ও লেখক শ্রী অন্নদাশংকর রায় বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে মানবিকতার খাতিরে সামরিক, ক‚টনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি সহায়তা দিয়ে এমনি এমনি বদনাম কুড়িয়েছে। সেই সময় বরং আরাকানের রোহিঙ্গারা নিজেদের আবাসিত অঞ্চলকে পাকিস্তানভুক্ত করার জোর দাবি তুলেছিলেন। অন্যদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রয়াত নেতা পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, বল্লবভাই প্যাটেল প্রমুখেরা দেশ বিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারতভুক্তির পক্ষে মিনমিনে কন্ঠে কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন মাত্র। আর সে কাজটিও তাঁরা করেছিলেন মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের সেই যুগের ব্রিটিশ বিরোধী স্বনামধন্য জুম্ম নেতা স্বর্গীয় শ্রী স্নেহ কুমার চাকমার ঐকান্তিক পীড়াপীড়ি ও চাপের কারণে। তখনও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয়নি। তাই তাঁর পক্ষে কিংবা তথাকার বাঙালিদের পক্ষে সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারতভুক্তির বিরোধিতা করার বিষয়টিও ছিলো অবান্তর। ইংরেজদের ভারত বিভক্তির ঠিক চব্বিশ বছর পরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই সময় পাকিস্তানের কাছ থেকে এবং ভারতের পূর্ণ সহযোগিতা ও সম্মতিক্রমে নবীন বাংলাদেশ পার্বত্য চট্টগ্রামকে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পেয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ-ভারত ও পাকিস্তান পার্বত্য চট্টগ্রামকে যথাক্রমে ‘শাসন বহির্ভূত অঞ্চল’ এবং ‘বিশেষভাবে শাসিত অঞ্চলের’ মর্যাদা দিলেও বাংলাদেশ তার শাসনামলে পাহাড়ি এই অঞ্চলটির সেই বিশেষ মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালিদের সাথে পার্বত্য আদিবাসীদের প্রত্যক্ষ ও মনোজাগতিক দ্বন্দ্বের সেই শুরু, যা আজও অব্যাহত আছে। এমনকি ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সেই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সুযোগ কখনও গ্রহণ করেনি। বর্তমানে পাহাড়ে বিরাজমান যে সার্বত্রিক অশান্তি, তার অধিকাংশই আসলে এই বহুল আকাঙ্খিত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ারই ফলশ্রæতি।

# তবে আমাদের পার্বত্য পাহাড়ে বিরাজমান এতোসব অপ্রাপ্তি-অশান্তি-হতাশা ও তজ্জ্বনিত মনোবিকার, রাজনীতিবিকার সত্তে¡ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের পথিকৃৎ ও তার আদর্শের একান্ত অনুগামী ভারত এবং বিশ্ব-রাজনীতিতে নানাভাবে পর্যুদস্ত মিয়ানমার কখনো বাংলাদেশের ইতিহাস মিমাংসিত রাষ্ট্রীয় সীমানাভুক্ত কোনো অংশের দিকে হাত বাড়াবে, সেটি এখনো একটি কষ্টকল্পনা বলেই মনে হয়। অবশ্য কিছু চিরকালীন সত্যও আছে। যেমন, ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বা কোনো বিশেষ অঞ্চলে গোলমাল বাধিয়ে রাখলে তার সুযোগ শুধু প্রতিবেশীরা কেন, পৃথিবীর ভিন্ন গোলার্ধের দূর-দূরান্তের অন্যরাও যে নেয়, তার প্রমাণ তো আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে। বর্তমান সময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, সিরিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, লেবানন, ইয়েমেন এবং আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বপন্থীরা যেহেতু জাতিকে জুজুর ভয় দেখিয়ে সর্বদা জুবুথুবু রাখতে চান, তার প্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন নিশ্চয়ই রাখা যায়। যেমন, সুদূরতম কল্পনার অংশ হিসেবে যদি ধরেও নিই যে, পরাশক্তিধর ভারত একদিন তার দুর্বল প্রতিবেশীদের প্রতি বর্তমান রাশিয়ার অনুরূপ ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হলো! তখন আমাদের অবস্থাটা আসলে কেমন দাঁড়াবে? সেই আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য আমাদের কথিত সার্বভৌমত্বপন্থীরা কী কী ব্যবস্থা ভেবে রেখেছেন, সেসব কি জাতির কাছে খোলাসা করা যায়? কারণ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে শুধু জুজুর ভয়ে সন্ত্রস্ত, দুঃশ্চিন্তা-ভারাক্রান্ত থাকলে তো আমাদের চলবেনা। সেই ভয়, দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তির উপায়গুলো সত্যিই কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য কিনা, তা জানার এবং জেনে ভীতিমুক্ত হওয়ার অধিকারও নিশ্চয় আমাদের রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেসব অপ্রিয় ও আপেক্ষিক বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের কথিত সার্বভৌমত্বপন্থীরা সঠিকভাবে আলোচনা করেন না। তাঁরা আমাদেরকে প্রতিনিয়ত জুজুর ভয়ই কেবল দেখিয়ে যাচ্ছেন এবং এর অন্তরালে নিজেদের পাহাড়ি/আদিবাসী প্রান্তিকীকরণের যে গোপন এজেন্ডা, তা হাসিল করে চলেছেন, মিয়ানমারের সেনাদের মতো।

# এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া উচিত। আমাদের জেনারেলরা চ‚ড়ান্ত বিজয়ের জন্য বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে কী কী নিখুঁত কৌশল বা পরিকল্পনা অনুসরণ করবেন, সেগুলোর আদ্যপান্ত আমরা এখানে জানতে চাইছি না। কিন্তু কথিত নিরাপত্তাবিদ হিসেবে যেসব বুদ্ধিজীবী ভারত ও মিয়ানমারের জুজু কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার ভয় সর্বদা আমাদের জাতিকে দেখিয়ে চলেছেন, তাঁদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক কিছু জানার অধিকার আমাদের অবশ্যই রয়েছে। যেমন, সামরিক শক্তিতে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর ও পরাশক্তিধর প্রতিবেশীর সাথে যুদ্ধে জড়ালে কীভাবে বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব, তা নিয়ে মোটাদাগে কোনো রূপরেখা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও সুপারিশ আমরা নিশ্চয়ই আমাদের নিরাপত্তাবিদদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করতে পারি। কারণ প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হলে আমাদের সেনারা প্রাণপণ যুদ্ধ করে মাতৃভ‚মিকে রক্ষা করবেন, সেটি অবধারিত। কিন্তু একইসাথে ঐ ক্রান্তিকালীন সময়ে শুধু সেনারা কেন, আমাদের সাধারণ জনগণও তো নানাভাবে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন! তাই সার্বিক প্রস্তুতির জন্য জননিরাপত্তা সম্পর্কিত এসব বিষয় আগে থেকে সবার কমবেশি জানা থাকা উচিত বলে মনে করি।

# বর্তমানে দেশের যে রাজনীতি এবং সার্বত্রিক উন্নয়নের যে বাস্তবতা তার প্রেক্ষিতে মনে হয়, আমাদের নিরাপত্তাবিদদের কথিত-কল্পিত সব আক্রমণ (প্রতিবেশীদের দ্বারা) সাধারণ জনপরিসরে বাস্তব কারণে এখনো পর্যন্ত সুদূরতর কল্পনারই অংশ। তাই আপাতদৃষ্টিতে এসব মায়া-মরিচীকাময় বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য এখনো যথেষ্ট সময় তাঁদের হাতে মজুদ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে দেশের মাত্র এক দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা, অখন্ডতা নিয়ে আমাদের কথিত নিরাপত্তাবিদেরা সবসময় যতটা তৎপর ও ভাবিত, সমতলের বাকি ৯০ শতাংশ অঞ্চলকে নিয়ে তাঁদের সেই তৎপরতা ও আয়োজন সেভাবে চোখে পড়েনা। বাংলাদেশের মোট সেনাশক্তির এক তৃতীয়াংশ এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত। অথচ এই অঞ্চলটি দেশের মোট আয়তনের মাত্র এক দশমাংশ। অর্থাৎ দেশটির দশ ভাগের এক ভাগ। তাও পুরোপুরি নয়। তাহলে দেশের বাকি ৯০ শতাংশের জন্য বরাদ্ধ মাত্র দুইভাগ সেনাশক্তি? আসলে রাষ্ট্রের বিশেষ মহল কর্তৃক পাহাড়ি-বিরোধী জুজুর ভয় ছড়ানোর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বোঝার জন্য এই পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট। একটি সহজ হিসাব কষে দেখুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন। সেটি হলো, বহিঃশত্রæ যদি আমাদের দেশটিকে সত্যিই কোনোদিন আক্রমণ করে বসে, তারা কি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশেই আক্রমণ করবে? সমতলের বাকি অংশে আক্রমণ করবে না? আপনি বলতে পারেন, সমতলে আমাদের সাধারণ জনতা গিজগিজ করছে (যে শক্তি পাহাড়ে নেই)। আর এই বিপুল জনতাই শত্রæর আক্রমণ রুখে দেবে। যুক্তির খাতিরে মানলাম, বিশাল জনতা যুদ্ধক্ষেত্রে এক মহাশক্তি। তারা শত্রæপক্ষের স্থলবাহিনীর সদস্যদের ধরে ধরে কচুকাটা করবে। কিন্তু এর পরও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। বিমান হামলা, দূরপাল্লার মিশাইল কিংবা পরমাণু বোমার হামলা ঠেকানোর জন্যও কি এই নিরস্ত্র বিশাল জনতা যথেষ্ট? আশা করি, আমাদের নিরাপত্তাবিদেরা প্রচলিত যুদ্ধকৌশল নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি বর্তমান যুগের পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য হুমকি, ব্যবহার ও পরিণতি নিয়েও ভাববেন। সেই সাথে বহিঃশত্রæর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার নামে দেশের শুধুমাত্র এক দশমাংশ পার্বত্য অঞ্চলে রাষ্ট্রের এক তৃতীয়াংশ সেনাশক্তি মোতায়েনের বিষয়টিও যে এক বিশেষ দূরভিসন্ধিমূলক ও বিপজ্জনক ছেলেখেলা, তা জাতির সামনে খোলাসা করবেন।

# বর্তমান জগৎ সংসারের অবারিত তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে মাঝে এমন খবরও চাউর হয়েছিলো যে, আমাদের প্রতিবেশি মিয়ানমারও নাকি এখন পরমাণু দেবীমাতার হাত ধরে এগোচ্ছে। খবরটি যদি সত্যি হয়, তাহলে মিয়ানমারের এই পরমাণুকান্ড শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র এশিয়ার জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তবে দেশটির পরমাণু অস্ত্রে সজ্জ্বিত হওয়ার ব্যাপারটা অদূর ভবিষ্যতে সত্যি হলেও হতে পারে। জনবিস্ফোরণ ও জেনেটিক কারণে আমাদের গলার আওয়াজটা সদাসর্বদা বৃহৎ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রতিবেশি তিন পরমাণু শক্তিধরের কাছে সেদিন আমাদের ঝাঁঝালো প্রক্ষিপ্ত চিৎকারটি তো আদতে হাস্যকরই শোনাবে, তাই না? এহেন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিজ দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাঁদের যাবতীয় বঞ্চনাবোধকে প্রশমিত করাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির মৌল আদর্শ ও কর্মপন্থা হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু দেশটির বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর বিশেষ বাঙালি জাত্যাভিমানের কারণে বাস্তবে তা কখনো সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। রাজনীতির কুটিল-জটিল বাস্তবতার শিকার হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু মানুষ ১৯৪৭ সালে ভারতের পতাকা উত্তোলনে এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনে বাধ্য বা প্ররোচিত হয়েছিলেন। বহুযুগের প্রতারিত জীবনে অধিকার বঞ্চনা এবং স্বকীয় জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির বিষয়ে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তথা নিজেদের স্বাধীন সত্ত্বা হারানোর ভয়ই ছিলো তাঁদের এহেন পক্ষাবলম্বনের কারণ। আদিবাসী জুম্মদের সে আশঙ্কা পরে বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে। কারণ, পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধের পানিতে পুরনো চাকমা রাজবাড়ি ডুবে যাওয়াসহ লক্ষাধিক পাহাড়ি মানুষ উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল হয়ে পড়েছেন। পরবর্তীকালে পার্বত্য জুম পাহাড়ে ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতির আগ্রাসন অপ্রতিরোধ্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।

# সুতরাং ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর ভারতের সাথে সংযুক্ত হওয়ার আকাঙ্খাটি সঠিক ছিলো। অন্যদিকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পাহাড়ে জুম্ম আদিবাসী নিধনের নির্মম সব ঘটনা ঘটেছে। মৃগাঙ্ক চাকমা নামের এক পাহাড়ি মুক্তিযোদ্ধা সেদিন মেজর জিয়াকে কোলেপিঠে করে চেঙেই নদী পার করিয়ে দিয়ে তাঁর আগরতলায় পাড়ি জমানোর পথে সাহায্য করেছিলেন। অথচ ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর একদিন আগরতলা থেকে স্বদেশে ফেরার প্রাক্কালে মেজর জিয়ার সেনারাই ‘রাজাকার’ সন্দেহে সেই মৃগাঙ্ক চাকমাকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এহেন ঐতিহাসিক নির্মমতা ও বঞ্চনার প্রেক্ষিতে এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংহতির স্বার্থে দেশের স্বাধীনতার পর পাহাড়ের এইসব প্রান্তিক মানুষকে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার/স্বাধিকার বুঝিয়ে দেওয়াটা বাঞ্চনীয় ছিলো। কারণ ইতিহাসের নানা পর্বে বহুযুগের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বঞ্চনাই এসব মানুষকে বিপ্রতীপ স্রোতে প্রবাহিত হতে প্ররোচিত করেছিলো। তাই শুরুতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোর অভ্যন্তরে তাঁদেরকে স্বকীয় সত্ত্বায় ও মর্যাদায় আগলে রাখাটা জরুরি কর্তব্য ছিলো। এতে তাঁদের বঞ্চনা ও বিপন্নতার বোধ প্রশমিত হতো। ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক পাহাড়ে সেনা মোতায়েন জনিত যে হাজার কোটি টাকার অর্থহীন অপচয়, তা অবশ্যই রোধ করা যেতো। আর সেই অর্থসম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের সর্বত্র উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা সম্ভবপর হতো। দেশের নীতিনির্ধারকদের মনোজগতে শুভবুদ্ধির উদয় হলে পার্বত্যাঞ্চলের সামরিক ব্যয় কমিয়ে এনে সেই অর্থ দিয়ে এখনও দেশের সর্বত্র ‘উন্নয়নের জোয়ার’ বইয়ে দেওয়া সম্ভব। সেই সুযোগ ও সুসময় এখনো বর্তমান। কারণ এটি সুনিশ্চিত যে, পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী পাহাড়ি জনগণ কোনোভাবেই দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি নন। অথচ আমাদের দেশের সকল কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী আদিবাসীদের বিরুদ্ধে এই নেতিবাচক ‘মিথ’টিকেই নিজেদের স্বার্থে এযাবৎ ব্যবহার ও প্রচার করে আসছে। আর পার্বত্য অঞ্চলে অবাধে পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবসা, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, মোটা বেতনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে চাকুরি, আভ্যন্তরীণ ভ্রাতৃসংঘাত এবং অস্ত্রবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণসহ আর্থিকভাবে লোভনীয় নানান ক্ষেত্রে এইসব কায়েমি গোষ্ঠীর যে সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে, তা দেশ-বিদেশের অনেক গবেষক অকাট্য যুক্তি সহকারে ইতোমধ্যে নিজেদের গবেষণায় তুলে ধরেছেন।

# কল্পনা বা তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে, একদিন প্রতিবেশি অহিংস ভারত বা মিয়ানমার কোনো কারণে সহিংস রূপ ধারণ করে আমাদের প্রতি সত্যিই হঠকারিতামূলক কিছু এডভেঞ্চার করে বসলো! প্রশ্ন হলো, তখন কি শুধু মুসলমান বাঙালিরাই সেই আক্রমণের শিকার হবেন? কোনো মিশাইল, পরমাণু বোমা কি তখন শুধু বেছে বেছে বাঙালি মুসলমানদেরকেই নিধন করবে? আসলে সেদিন আদিবাসী/পাহাড়ি-বাঙালি-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমান নির্বিশেষে দেশের আপামর জনগণই তো এর ভুক্তভোগী হবেন! তাই রাষ্ট্রের জাতীয় সংহতি জোরদারকরণই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতের কথা আমাদেরকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। দেশের অভ্যন্তরের অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণের মওকা প্রতিবেশি কাউকে দেওয়াটা ঠিক হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের অভ্যন্তরের সেই ঐক্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? একক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ছায়াতলে তো সেই ঐক্য কোনোদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না। কারণ এদেশে বাঙালি জাতি ছাড়াও আরও অনেক জাতির বসবাস। আপনারা তাঁদেরকে উপজাতি, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী, জাতিসত্তা, সংখ্যালঘু বা সম্প্রদায় যে নামেই অভিহিত করুন না কেন বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্বসমাজে প্রচলিত ধারণা তথা আধুনিক নৃবিজ্ঞান ও সমকালীন বিদ্যাজগতের ভাষ্য অনুসারে এরা প্রত্যেকেই এক একটি স্বয়ম্ভূ, স্বতন্ত্র জাতি। এই তত্ত¡টি এখন আইএলও এবং জাতিসংঘ দ্বারাও স্বীকৃত। সরকারের উচ্চশিক্ষিত মন্ত্রী-আমলাদের অনেকেই তা স্বীকার করেন। প্রায় ক্ষেত্রে সেটি তাঁরা করেন স্বতঃস্ফ‚র্ত মানবিক তাড়নায়, কখনওবা বেখেয়ালে, অবচেতন মনে। আমি বাংলাদেশের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ নাসিম, বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী জনাব আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জনাব রাশেদ খান মেনন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী জনাব হাসানুল হক ইনু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জনাব আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রয়াত সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শ্রী প্রমোদ মানকিন প্রমুখের মুখে বহুবার দেশের আদিবাসীদের ব্যাপারে উচ্ছ¡সিত প্রশংসাসহ এইসব জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী নামে ও পরিচয়ে সম্বোধন করতে শুনেছি। একসময় বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেশের আদিবাসীদেরকে সম্মান জানিয়ে শুভেচ্ছাবাণী দিয়েছিলেন এবং ‘আদিবাসী’ নামেই তাঁদেরকে সম্বোধন করেছিলেন। অর্থাৎ আমলাতন্ত্র প্রভাবিত সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিকূলে গিয়ে তাঁরা অবচেতনে মেনে নিয়েছেন যে, বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও অন্য বহুজাতির বসবাস। এক কথায় বাংলাদেশ বহুজাতির, বহুভাষার, বহুধর্মের, বহুসংস্কৃতির দেশ; যা একদা বাংলার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছিলেন বলে কেউ কেউ ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছেন।

# সুতরাং উন্মুক্ত এই বিশ্ব ব্যবস্থায় আধুনিক বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানজগতের প্রতিষ্ঠিত ও সর্বসমাদৃত সত্যকে আপনি কিছু কাঠমোল্লার গবেষণা দিয়ে ঠেকাবেন কি করে? শুধু গোঁয়ার্তুমি দিয়ে কি সমকালীন জ্ঞানপ্রবাহকে ঠেকানো সম্ভব? আপনার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রাগ্রসর ছাত্র-ছাত্রী তো ঠিকই আপনার জবরদস্তিমূলক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। রাষ্ট্র পরিচালকদের বিশেষ ক্ষমতাধর একটি অংশের অনিঃশেষ বোকামির প্রতি সদর্প চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন - আপনাদের জ্ঞান, জানাশোনার পরিধি ও সিদ্ধান্ত ভুল। একটি আধুনিক দেশে বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই দেশকে অধিক নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, ইনক্লুসিভ এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে অধিকতর সমাদৃত ও আদরণীয় করে তোলে। একজাতির রাষ্ট্র একটি একঘেয়ে, বর্ণহীন ও প্রায়শ স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাই বর্তমান বিশ্বের আধুনিক ও উন্নত প্রায় সকল রাষ্ট্রই দেহে ও মননে বহুজাতিক এবং বিশ্বের বাকী রাষ্ট্রগুলোর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। এমনকি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষ হওয়া কিংবা ধর্মীয় চরমপন্থার সমূহ আশঙ্কা থাকা সত্তে¡ও জার্মানী এখনও লক্ষ লক্ষ সিরীয় উদ্বাস্তুকে নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিয়ে বরণ করছে। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকা বহুযুগ ধরে সেই কাজটি করে এসেছে, এথনিক ও কালচারাল ডাইভারসিটিকে প্রাধান্য দিয়ে। এখন সিদ্ধান্ত আপনার উপর, কোন পথে আপনি হাঁটবেন। ডাইভারসিটিকে গ্রহণ করবেন, নাকি একঘেয়ে, মনোটোনাস আত্মরতিতে তৃপ্ত থাকবেন। আধুনিক মননের অধিকারী হলে (আইএস সমর্থক হলে ভিন্ন কথা) আপনি ডাইভারসিটিকেই আসলে বেছে নেবেন। আপনি হয়তো বলবেন যে, আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান প্রভৃতি হলো যুদ্ধবাজ ও পরসম্পদ লুন্ঠনকারী দেশ ও জাতি। আর তারা এখন দরিদ্র দেশের নাগরিকদের প্রতি দরদ দেখাচ্ছে নিজেদের অর্থনীতির স্বার্থে। কিন্তু আপনি যেসব দেশ যুদ্ধবাজ নয় অথচ এথনিক ও কালচারাল ডাইভারসিটিকে সর্বদা প্রমোট করে যাচ্ছে, তাদের কথা কিন্তু বলবেন না। কানাডা, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়ামসহ অন্যান্য স্ক্যান্ডিনেভিয় দেশগুলো যার প্রমাণ। শুধু সুইজারল্যান্ড ও সুইডেন কতোজন বাঙালিকে স্থান দিয়েছে তা কি আপনি জানেন?

# অন্যদিকে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশ যুদ্ধবাজ না হয়েও এবং কথিত উন্নত-উদার সংস্কৃতির অধিকারী হয়েও কেনো ডাইভারসিটি-সন্ত্রস্ত, কৃপণ ও ‘দেবোনা’ আক্রান্ত মনের অধিকারী, তা আমরা কখনও আলোচনা করি না। আমাদের দেশে ও সমাজে পারতপক্ষে অন্যকে কিছুই না দিয়ে সবকিছুকে নিজের ভোগদখলে নেওয়ার অনন্য মানসিকতাকে আমরা কি অস্বীকার করতে পারি? না হলে সারা দেশে কোটি কোটি বঞ্চিত মানুষের মধ্যে সম্পদ দখলের তীব্র প্রতিযোগিতা লাগিয়ে রেখে দেশের মাত্র ২% মানুষ কীভাবে সিংহভাগ সম্পদের মালিক হতে পারেন? স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বৎসর পরেও কীভাবে আমাদের দেশে ধনী-দরিদ্রের মধ্যেকার বৈষম্য চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে? এক্ষেত্রে দেশের সংখ্যাস্বল্প জাতিগুলোর দুরবস্থাটি কেমন হতে পারে, তা কি আমরা কখনো বিবেচনায় নিয়েছি? তাঁদের অধিকার সংরক্ষণে এবং আত্মপরিচয় নির্মাণে বৃহৎ নৃগোষ্ঠী কি কোনো আন্তরিক ও উদার ভ‚মিকা কখনও রেখেছে? পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৪টি আদিবাসী জাতির কথা বাদই দিলাম। তার বদলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্যালেস্টিনীয় এবং কুর্দিদের কথাই ধরুন। তাঁদের একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এখনও নেই। কিন্তু তাই বলে কি তাঁরা প্রত্যেকে স্বতন্ত্র জাতি নন? দেশ নেই বলে আপনি যদি তাঁদেরকে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি না দেন, তাহলে মিথ্যাভাষণের দায়ে আপনার দোজখবাস অবধারিত। কারণ আলোচ্য দুই জাতির জনগণ প্রত্যেকেই ঈমানদার মুসলমান এবং দুর্ভাগা হলেও ঐতিহাসিকভাবে এক একটি গৌরবদীপ্ত ও স্বতন্ত্র জাতির সন্তান। তাদের প্রত্যেকেরই গৌরবোজ্জ্বল অতীত, নিজস্ব উন্নত সংস্কৃতি, প্রথাগত শাসনব্যবস্থা, ভাষা, রীতিনীতি ও জীবনাচার রয়েছে। বিশ্বের ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে আজ তাঁদের দুরবস্থার কোনো কমতি নেই।

# অনুরূপভাবে বাংলাদেশের আদিবাসীদেরও রয়েছে নিজস্ব প্রথাগত শাসনব্যবস্থা, উন্নত সংস্কৃতি, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য, ধর্ম, ভাষা ও সমৃদ্ধ জীবনাচার। তাই এদেশে বসবাসরত বহু জাতির অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়া উচিত এবং তা করার জন্য সংবিধানটিকে আরও একবার সংশোধন করা উচিত। কারণ দেশের স্বার্থে বা অপস্বার্থে এ পর্যন্ত অন্তত ষোলোবার তো সংবিধানকে কাঁটাছেড়া করা হলো। এবার দেশের প্রকৃত সংহতি ও সামষ্টিক উন্নয়নের স্বার্থে আরেকবার না হয় এর সংশোধন করলেন। না হলে আমাদের সামনে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন কাহিনীর উদাহরণ তো আছেই। মানে, দেশের অভ্যন্তরীণ অনৈকের সুযোগ অন্যরা নেবেই। সেটি আগে বা পরে যখনই হোক। তাই বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় সংহতির স্বার্থে পাহাড় ও সমতলের সকল আদিবাসী জাতিকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি সত্যিকার অর্থে বহুজাতির, বহুধর্মের, বহুলিঙ্গের, বহুসংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক ও গনতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

লেখক: Jummoblogger


0 0



You must log in to comment



মন্তব্যসমূহ(0):