আর্কাইভ

পার্বত্য চট্টগ্রাম: ট্যুরিজম যখন ট্র্যাজেডি

by | Nov 20, 2020 | আদিবাসী বিষয়ক, বাংলাদেশ, সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম

ট্যুরিস্ট তত্ত্বঃ

‘Tourist’ শব্দটি উৎপত্তি ঘটে ল্যাটিন শব্দ ‘tornus’ থেকে, যার অর্থ ‘A tool for describing a circle’. সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে “Tourist‟ শব্দটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে প্রথম ব্যবহৃত হয়। John Urry বলেছেন Postmodernist tourist তারা ভ্রমণকে এক ধরণের খেলা হিসেবে গ্রহণ করে। তাই তারা ভ্রমণ করে কোন একটা অভিজ্ঞটা অর্জনের পরিবর্তে যত ধরণের অভিজ্ঞটা পাওয়া যায় তার সবগুলো উপভোগ করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ Postmodernist tourist রা কেবল একটি উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ করে না, ভ্রমনের পিছনে থাকে বহু উদ্দেশ্য। 

Featherstone (1991) বলেছেন In the late periods of the twentieth century, the search of leisure has become an indispensible component of contemporary of leisure has become an indispensible component of contemporary consumer culture”. 

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে ‘Tourist’ এবং “Traveler”-এর মধ্যে পার্থক্য আছে।

ট্যুরিজমের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ 

 প্রাচীন কালে মানুষ ভ্রমণ করত জীবন ধারণের জন্য। মানুষ তখন হেঁটে মাঠ-ঘাট জঙ্গলে  ঘুরে বেড়াত, বিশেষ করে মানুষ যখন গাছের ফলমূল পাতা খেয়ে বা বন্য পশু শিকার করে জীবন যাপন করতো। এর পরবর্তীকালে মানুষ সাধারণত ব্যবসা বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা, প্রাচীন ঐতিহাসিক ঘটনা-স্থানে আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছে।  

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শিল্প বিপ্লবের ফলে পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর অ্যামেরিকাতে শিল্প সভ্যতার বিকাশের সাথে আধুনিক পর্যটনের ধারনাটি উঠে আসতে থাকে।  তাছাড়া শিল্পায়নের ফলে মালিক শ্রেণীর সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছিল। মালিক শ্রেণীর কারখানা গুলোতে কাজ করতে আসার জন্য বহু শ্রমিকের সমাবেশ ঘটে।

রাষ্ট্রীয় এই শিল্পায়ন নীতিকে জোর জবরদস্তীমূলক নীতি বললে ভুল হবে না। কারণ এই নীতি এককেন্দ্রিক নগর অর্থনীতি জন্ম দিয়েছিল। এই নগর অর্থনীতির কারণে কৃষি অর্থনীতি দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল। কারখানা গুলোতে বিকট আওয়াজ, কঠোর পরিশ্রম, নগর অঞ্চলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিণত হয়। প্রতিদিনের একঘেয়েমি কাজের জীবন মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকদের কাছে দুর্বিসহ হয়ে উঠে। 

Cohen (1988) এর মতে, In the mid-twentieth century (when industry in the West boomed), summer holidays became an important annual ritual for many families in Western countries who typically visited the same holiday resorts (invariably located on the coast, by lakes or in the mountains) provided an escape from the stresses and strains of working life”.

তারপর সম্পদশালী মালিকরা নগরের কঠোর শ্রম দেওয়া মানুষদের জন্য রোমাঞ্চকর, মনোরম পরিবেশ তৈরি করতে প্রকৃতি ধ্বংস করা শুরু করে। গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে নজর দেওয়া শুরু হয়। প্রকৃতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পর্যটন ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। 

ডার্ক ট্যুরিজমঃ

১৯৯৬ সালে ডার্ক ট্যুরিজম (Dark Tourism) এর সংজ্ঞা প্রবর্তন করেন গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির দুই ফ্যাকাল্টি সদস্য জন লেনন এবং ম্যালকম ফোলি। তাদের সংজ্ঞানুসারে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডির সাথে সম্পর্কিত স্থানে ভ্রমণ করাকে ডার্ক ট্যুরিজম বলে।

কোন স্থান অতীতের ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে থাকলে সেই স্থানে দর্শন করা ডার্ক ট্যুরিজমের অন্তর্গত। এই ভয়াবহতা হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা মানবসৃষ্ট কোনো ঘটনা। রা মনে করেন, ডার্ক ট্যুরিজম অনেকটা মানব সভ্যতা বিষাদের ইতিহাসের স্বাক্ষী এসব স্থানকে উপর আকর্ষণের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত।

তার মানে, সাজেক, নীলগিরি, নীলাচল থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ট্যুরিস্ট স্পটই হচ্ছে ডার্ক ট্যুরিজমে অন্তর্ভুক্ত। ডার্ক ট্যুরিজম সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায়। এক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে অন্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার। অমানবিকতার ইতিহাসের স্বাক্ষী পাওয়া যায়, সেখানেই ডার্ক ট্যুরিজমের প্রবল।

নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের সাক্ষী পোল্যান্ডের অসউইৎজ ক্যাম্প, পারমাণবিক বোমায় হারিয়ে যাওয়া হিরোশিমা, নাগাসাকির ধ্বংসাবশেষ এবং কাপ্তাই বাঁধের কারণে চাকমা জাতির সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ যা পাহাড়ি মানুষের বেদনার স্বাক্ষী।

মানুষের বেদনা-কষ্টকে পুঁজি করে পর্যটন গড়ে তোলাই ডার্ক ট্যুরিজম। ডার্ক ট্যুরিজম স্থানগুলো চিহ্নিত করার জন্য বহু সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ডার্ক ট্যুরিজমে প্রসঙ্গে বলা যায়, প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের লাশের উপরে দিয়েই যেন বাংলাদেশের ডার্ক ট্যুরিজমের নির্মাণ করা হচ্ছে

 

উপনিবেশ শাসনে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিঃ

ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি মূলত উপনিবেশ শাসকদের বাণিজ্যিক উদ্ভাবন।  তৃতীয় বিশ্বে পুঁজিবাদের  প্রধান পুঁজিই হচ্ছে প্রকৃতি। প্রাকৃতিক সম্পদ, বন, খনিজ, নিসর্গ ইত্যাদিই এখানে বিনিইয়োগের মূল উপাদান। ভূমি সহ খনিজ সম্পদের জন্য দেশে দেশে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হচ্ছে।  ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও জোরপূর্বক অথবা অর্থের বিনিময়ে ভূমি দখল করা হয়।

নগর শিল্পায়নের পরে পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের শ্রম কেড়ে নিতে থাকে।  যার ফলে মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠে।  তারপর শুরু হয় প্রকৃতি ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। পশ্চিমা ওয়াইল্ডারনেস, কনজের্ভেশনের নামে প্রকৃতি হয়ে যায় বেচাকনার পণ্য। এমনভাবে প্রকৃতিকে প্রমোট করা হয় যে , প্রকৃতি মানে রোমাঞ্চকর, সুন্দর।

তার পাশাপাশি অবধারিতভাবে শুরু হয় মাদক ব্যবসা, পতিতা ব্যবসা এবং ধ্বংস করে দেওয়া হয় শত শত হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতি। অধুনা বাংলাদেশে মার্কেটিং প্রমোশনের মাধ্যমে সেই ট্রেন্ড চলছে। তাই তো হাইকিং, ট্রেকিং, এডভেঞ্চার, বন-অরণ্য-জানা-ক্যাম্পিং সোজা কথায় প্রকৃতিকে যেন নতুন করে পণ্যায়ন হচ্ছে। দেখে মনে হয় যেন,  যেন বাংলাদেশে প্রকৃতি প্রেমী নেই এমন কেউ নাই!

গণমাধ্যমের নানা প্রতিবেদন থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ইত্যাদি চলছে। প্রকৃতি প্রেমে টালমাটাল হয়ে ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সমতলের বাঙালিদের ট্যুরিজম ব্লগের অভাব নেই, সবগুলোই আবার প্রকৃতি ও পাহাড় কেন্দ্রিক।  পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রির এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

১৯৯৭ সালের আগে কিন্তু বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। তখন বাংলাদেশ সরকার সরাসরি সামরিকানের মাধ্যমে আদিবাসীদের নিধন করতে চেয়েছিল। পাহাড়ি আদিবাসীরা বিদ্রোহ করার ফলে সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। ১৯৯৭ চুক্তির পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নব্য উপনিবেশের আবির্ভাব ঘটানো শুরু করে, যার একটা অংশ হল ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি।

ম্রোদের ভূমি দখল করে সেনাবাহিনী যে ফাইভ স্টার হোটেল নির্মাণ করছে।  এখানে সেনাবাহিনীর এজেন্ডা শুধু হোটেল ব্যবসা নয়, বড় ধরণের সংস্কৃতিক আগ্রাসন। ফাইভ স্টার হোটেল নির্মাণ করার পরে পতিতা ইন্ডাস্ট্রি খুলবে। উপনিবেশ শাসন ব্যবস্থায় অস্ত্র হিসেবে নারী সমাজকে টার্গেট করা হয়, ঔপনিবেশিক ইতিহাস তাই বলে। 

পাহাড়ে মাদকের ছড়াছড়ি,  হেরোইন, ইয়াবার বিস্তার! এই মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি সেনাবাহিনী আর প্রশাসন জড়িত। যার ফলে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে মাদক প্রতিরোদ করেও আটকানো যাচ্ছে না। পাহাড়ের প্রজন্মকে নেশাগ্রস্থের মাধ্যমে বিদ্রোহ ভুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার একটা কৌশল। 

মাদক, নেশা আদিবাসীদের সংগ্রাম ও প্রতিবাদী চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার এক কার্য্যকরী এবং বিশ্বব্যাপী অতিপরিচিত কৌশল। শান্তি চুক্তির পর মাদকের কড়াল গ্রাসে পাহাড়িদের কয়েক প্রজন্ম ধুঁকে ধুঁকে মরেছে, তার পেছনে শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিলো। 

পার্বত্য চট্টগ্রামে ট্যুরিজম-উন্নয়নের অগ্রাসনঃ

উন্নয়নের সাথে সাথে পর্যটনের চরিত্রও বদলে দিয়েছে শাসকগোষ্ঠী। এখন পর্যটনকে বিশাল এক শিল্পে পরিণত করছে। রাষ্ট্রকে ডিজিটাল বানাচ্ছে কিন্তু যেখানে পর্যটন স্পট নির্মাণ করছে সেখানেকার এলাকা প্রযুক্তির বাইরে। আর অন্যদিকে পর্যটনের সৌন্দর্য নিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

উন্নয়নের সাথে সাথে ঘুষখোর, দালালি, দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী বাহিনী তৈরি করছে, তাদের হাতে জনগণের টাকা তুলে দিচ্ছে। এবার অবসরের দরকার। এই অবসর সময়টা তারা কিভাবে কাটাবে সেটাও ঠিক করে দিচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। শাসকগোষ্ঠী দেখবে অবসর কাটাতে গিয়ে ওই বাহিনী (ঘুষখোর, দালালি, দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী) যাতে উন্নয়নের ক্যাপিবিলিটি হারিয়ে না বসে।

ফলে শাসকগোষ্ঠী ঠিক করে দিচ্ছে ওই বাহিনী কোথায় কিভাবে বেড়াবে। এজন্য পাহাড়ে-সমতলে আদিবাসীদের ভূমি দখল করে নতুন নতুন পর্যটন স্পট তৈরি করে দিচ্ছে। ঘুষখোর, দালালি, দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী যেমন বাড়াচ্ছে বেড়ানোর স্পট ও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার ওই বাহিনী বেড়াতে গিয়ে যে খরচ করছে তা ঢুকছে সেনাবাহিনী- প্রশাসন কিংবা শাসক গোষ্ঠীর ঘরেই।

পর্যটন আগে ছিল সমরুপ(Homogeneous) কিন্তু এখন বৈচিত্র্যপূর্ণ (Diversive)হোটেল, পর্যটন স্পট সবই তো সেনাবাহিনী কিংবা প্রশাসনের। স্পটগুলোর উন্নয়নই তারা করছে। যারফলে পাহাড়ি আদিবাসীদের উপর ভয়ানক অর্থনৈতিকভাবে শোষণ চালানো হচ্ছে। 

 

ট্যুরিজম এবং বাঙালির ভোগবাদঃ

উনিশ শতকের আগে বা উনিশ শতকের প্রথমদিকে বাঙালি সমাজে ভ্রমণ বিষয়টা বনিক, তীর্থযাত্রী, ইতিহাসবিদ এবং উচ্চশিক্ষার্থী মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ সুখ বা “Pleasure” বিষয়টা তখন ছিল না। আধুনিক পুঁজিবাদ মুসলিম বাঙালিদের “ভোগ বা Consumption” ভয়াবহ আকারে বেড়ে যাচ্ছে। আর এই ভোগের অঙ্গ হল “সুখ বা Pleasure

পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া থেকে শুরু করে ম্রো নাচ দেখা সবই বাঙালি সমাজে বিলাসমাত্র। উন্নয়নের জোয়ারে ক্রমশ বেড়ে উঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে আকৃষ্ট করার জন্য সেনাবাহিনী নামক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপেক্ষা করে সেইসব অঞ্চলকে পর্যটনের নামে আকর্ষণীয় করে তুলছে প্রতিনিয়ত।

প্রত্যেক এলাকায় ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে তোলা হয়েছে। এইসব এজেন্সিগুলো যেসব প্যাকেজ ট্যুর, কন্ডাক্ট ট্যুর প্রভৃতি ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যেন পর্যটন স্পটগুলো একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন গণপর্যটন বা Mass Tourismগণপর্যটনের জোয়ারে নিম্ন শ্রেণীর বাঙালিও সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে পাহাড়ে পর্যটনের প্রতি উন্মাদনা তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া মানেই ম্রো নাচ দেখে বাঙালি পর্যটকদের বিলাসমাত্র 

পাহাড়ি আদিবাসী বনাম ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদী বাজারঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণ মোঘল, পর্তুগীজ, ব্রিটিশ, পাকিস্তান উপনিবেশে ও এতোটা শোষিত হয়নি যতোটা বাংলাদেশ জন্ম হওয়ার পর থেকে অর্থনীতিক ও সামাজিকভাবে শোষিত হচ্ছে। এবং বাধাহীন ভাবেই চলছে এই শোষণ।  

ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় অর্থনীতিতে নিরঙ্কুশভাবে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র বা সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত পূঁজিতান্ত্রিক মালিকানা গড়ে উঠে। যা সেনাবাহিনী নামক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবেই ভূমি দখল করে পর্যটন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় স্বাধীনভাবেই কর্পোরেট সংস্থাগুলো তাদের দখলদারিত্ব পরিচালনা করে যাচ্ছে। যা পাহাড়ের বাজার অর্থনীতি থেকে শুরু মালিকানা সবই একচেটিয়া সমতলের বাঙালি আর সেনাবাহিনীর হাতে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় এখনো পর্যন্ত দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ৯০% সমতলের বাঙালি আর সেনাবাহিনীর হাতে।  ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় বৃহৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বলা স্ট্যাবিলাইজিং বা স্থিতিদানকারী সামাজিক স্তর। এরাই ঔপনিবেশিক শাসনের খুঁটি বা পিলার। কোটার সুবিধাসহ প্রভৃতি সুবিধাগুলো দিয়ে ক্ষমতার অংশীদার করে তোলে। যারা বাস্তবে বেতনভোগী ও নানাবিধ সুবিধাভোগী। এ নীতি উপনিবেশগুলোতে প্রয়োগ করা হয়। এই সুবিধাভোগীরা পাহাড়ে বড় ধরণের একটা শ্রেণী করতে সক্ষম হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এখানেই সার্থক। যা ভয়াবহ নিপীড়নের মধ্যেও আন্দোলনের দানা বাঁধে না। 

 সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদর্শকে সামনে রেখে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ এগিয়ে গিয়েছিল শতাব্দী ধরে। কিন্তু বিগত শতাব্দীর মধ্যভাগে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ শুরু হয়েছিল তা অনবরত বাধাহীনভাবেই চলছে।বাজার অর্থনীতি থেকে শুরু কর ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যাবাহনেও বাঙালিদের একচেটিয়া মালিকানা।

রাষ্ট্র ঔপনিবেশিকরণে চতুর্দিক থেকে নিপীড়ন জারি রেখেছে এই বর্বর রাষ্ট্র। পার্বত্য চট্টগ্রামে ট্যুরিজম অথবা ডার্ক ট্যুরিজম হল রাষ্ট্রের উপনিবেশিক শাসনের একটা অংশ মাত্র। শাসকগোষ্ঠী তাদের সেনাবাহিনী নামক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের উপর জুলুম – নিপীড়ন জারি রাখার জন্যই হাতিয়ার হিসেবে ট্যুরিজম ব্যবহার করছে পাহাড় থেকে তো উচ্ছেদ শুধু নয়, নির্মূল-নিঃচিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে ভুমির এ আদিম সন্তানদের

লেখকঃ ডেনিম চাকমা

Reference: 

Featherstone, M (1991); Consumer Culture and Post Modernism, Sage London. 

 Ioannides, Dimitri and Keith G. Debbage (eds) (1998); „Neo-Fordism and Flexible Specialization in the Travel Industry: Dissecting the Polyglot‟, pp. 99-122 in The Economic Geography of the Tourist Industry: A Supply-Side Analysis. London and New York.

 Rodrigulz, I.L. (2009); Social Media in Tourism Behaviour, Retrieved on 15th Feb, 2014. 

Dark tourism and affect: framing places of death and disaster, Dark Tourism and Emotions in Places of Turmoil by Professor Dorina-Maria Buda.

Urry, John (1990); The Tourist Gaze: Leisure and Travel in Contemporary Society. 

Biernat & Lubowiecki (2013); Correlations between individual factors and long-term nature of tourist trips amongst urban single people, BALTIC JOURNAL OF HEALTH AND PHYSICAL ACTIVITY © Gdansk University of Physical Education and sport in Gdansk. 

ঘোষ, অভ্র [সম্পাদিত] (২০০০): বিতর্কিকা; সংখ্যা ২ কলিকাতা লিটন ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্রঃ- কলিকাতা – ০৯।  

পার্বত্য চট্টগ্রামের কৌমসমাজ :  একটি অর্থ-সামাজিক ইতিহাস (Translated from German by Swapna Bhattachrya).

 

পপুলার পোস্ট

Related Post

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনঃ উপনিবেশবাদ নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা। দ্বিতীয় পর্ব

Ananya Azad March 4, 2014 তাদের গঠনতন্ত্র গুলোতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে বাঙলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা বলা নেই। বলা আছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরাপত্তা...

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

পর্যটনের আড়ালে সাজেকের কান্না : দুর্ভোগে জনতা

সংযুক্ত পেইন্টিংঃ শিল্পী তুফান রুচ সাজেক একটি ইউনিয়নের নাম যা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন; যেটি দেশের বৃহত্তম জেলা রাঙামাটি এবং বাঘাইছড়ি উপজেলার...

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

পাহাড়ে নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা

সংযুক্ত পেইন্টিইং এর শিল্পী- চানুমং মারমা লেখক- লেখকঃ ধীমান ওয়াংঝা    এদেশের নারীবাদী দর্শন বা নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতাকে থিওরাইজ বা তত্ত্বায়ন...

0 Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *